১৩ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

কেন ডুবে যায় তিলোত্তমা ? উত্তর লুকিয়ে ৩৩০ বছরের এক জল-ইতিহাসে

কেন ডুবে যায় তিলোত্তমা ? উত্তর লুকিয়ে ৩৩০ বছরের এক জল-ইতিহাসে

বরর্ষাকালে কলকাতার রাস্তার পরিচিত ফ্রেম। ছবি - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

কেন ডুবে যায় তিলোত্তমা ? উত্তর লুকিয়ে ৩৩০ বছরের এক জল-ইতিহাসে

শহরের হারিয়ে যাওয়া ‘সেফটি ভালভ’, জলাভূমি বুজিয়েই কি ডুবছে কলকাতা?

এক সময় প্রকৃতিই ছিল কলকাতার সবচেয়ে বড় পাম্পিং স্টেশন। সেই প্রকৃতিকে হারিয়েই কি আজ জলমগ্ন মহানগর! প্রশ্নটা উঠছে, কারণ, কলকাতায় বৃষ্টি মানেই এক পরিচিত দৃশ্য। অফিসফেরত মানুষের হাঁটু জল ভেঙে বাড়ি ফেরা, রাস্তার মাঝে বিকল গাড়ি, থমকে যাওয়া যান চলাচল, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে ওঠা একই প্রশ্ন, ‘‘এত বছর পরেও কলকাতার জল নামতে এত দেরি কেন?’’

প্রশ্নটা নতুন নয়। উত্তরটাও শুধু বর্তমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে শহরের জন্মলগ্নে, প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ইতিহাসে।

জলকে জয় করার ইতিহাস

কলকাতার ইতিহাস আসলে জলকে জয় করার ইতিহাস। আবার সেই জলকেই হারানোর ইতিহাসও। শহরের জন্মই জলাভূমির বুকে ! আজকের কংক্রিটে মোড়া মহানগরকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এক সময় এই শহরের অধিকাংশই ছিল জল, কাদা আর নোনা জমির বিস্তার।
১৬৯০ সালে জব চার্নক যখন সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলিকাতায় ইংরেজ বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করেন, তখন চারপাশে ছিল অসংখ্য খাল, বিল, ডোবা ও জলাভূমি। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যেত। নদী আর জলাভূমি ছিল এখানকার ভূগোলের স্বাভাবিক চরিত্র।
তবে সেই জলাভূমিই ছিল প্রকৃতির আশীর্বাদ। কারণ, বৃষ্টির জল জমত ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও না কোথাও গিয়ে মিশে যেত। জলকে আটকে রাখার মতো কংক্রিটের দেওয়াল তখনও তৈরি হয়নি।

ব্রিটিশদের প্রথম বড় চিন্তা— দুর্গ নয়, ড্রেন

আঠারো শতকের শেষদিকে কলকাতা যখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হয়ে উঠছে, তখন প্রশাসনের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ ছিল নোংরা নর্দমা ও জলাবদ্ধতা। বর্ষাকালে রাস্তা কাদায় ডুবে যেত। পচা জল থেকে ছড়াত রোগ। শহরকে সাম্রাজ্যের রাজধানী করতে হলে প্রথমেই দরকার ছিল কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা।
১৮০৩ সালে লর্ড ওয়েলেসলি কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থাকে ‘অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তার পর থেকেই শুরু হয় পরিকল্পিত নর্দমা নির্মাণ। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ভূগর্ভস্থ নিকাশি ব্যবস্থার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে শুরু করে। কিন্তু ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা দ্রুত বুঝে গিয়েছিলেন, কলকাতার আসল শক্তি নর্দমায় নয়— তার ভূপ্রকৃতিতে।

শহরের অদৃশ্য নায়ক: পূর্ব দিকের জলাভূমি

লন্ডন বা প্যারিসের মতো নয়, কলকাতার পূর্বদিকে ছিল হাজার হাজার একর জলাভূমি। শহরের অতিরিক্ত জল সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই গিয়ে জমত। বেলেঘাটা খাল, সার্কুলার ক্যানাল, কেষ্টপুর খাল-সহ একাধিক জলপথ তৈরি ও সংস্কার করা হয়েছিল এই কারণেই। শহরের নর্দমা ও বৃষ্টির জল ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে সরিয়ে দেওয়া হত।
আজ যাকে আমরা পূর্ব কলকাতা জলাভূমি বলে চিনি, সেই বিস্তীর্ণ অঞ্চলই হয়ে উঠেছিল কলকাতার প্রকৃত ‘সেফটি ভালভ’। অদ্ভুত ভাবে, শহরের বর্জ্যই সেখানে সম্পদে পরিণত হয়েছিল। নর্দমার জল ব্যবহার করে মাছচাষ, কৃষিকাজ এবং প্রাকৃতিক উপায়ে জল পরিশোধনের এমন ব্যবস্থা বিশ্বের আর খুব কম শহরেই দেখা যায়।

আরও পড়ুন

জলাজঙ্গল থেকে রাজধানী: তিলোত্তমার অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প
যে নদী গড়েছিল কলকাতাকে, সেই নদীরই ‘মৃত্যুঘণ্টা’ কি শুনছে মহানগর?

ধাপার আবর্জনা থেকে বিশ্বমানের পরিবেশ মডেল

উনিশ শতকের শেষভাগে ধাপায় শহরের আবর্জনা ফেলা শুরু হয়। প্রথমে যেটি ছিল বর্জ্যের স্তূপ, সময়ের সঙ্গে সেটিই রূপ নেয় এক অভিনব পরিবেশ-অর্থনীতিতে। নর্দমার জলে মাছ চাষ হচ্ছে, সেই জল শোধন করে কৃষিকাজ হচ্ছে— এই মডেল পরে আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদদের নজর কাড়ে।
২০০২ সালে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন রামসার সাইটের মর্যাদা পায়। বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক বর্জ্যজল পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। অর্থাৎ কলকাতার নর্দমার জল পরিষ্কার করার কাজ বহু দশক ধরে করে আসছে প্রকৃতি নিজেই।

তারপর শহর বড় হল, ছোট হল জল

সমস্যার সূত্রপাত স্বাধীনতার পর। জনসংখ্যা বাড়ল। শহর ছড়াল। নতুন আবাসন, রাস্তা, বাজার, অফিস তৈরি হল। ষাটের দশকে গড়ে উঠল সল্টলেক। পরে তৈরি হল ইএম বাইপাস। তার পর নিউ টাউন, রাজারহাট, অসংখ্য আবাসন প্রকল্প। ফলে শহর যত বড় হয়েছে, জলাভূমি তত ছোট হয়েছে। যে খাল এক সময় নৌকা চলাচলের পথ ছিল, তার অনেকগুলিই আজ সরু নর্দমা। কোথাও সম্পূর্ণ বুজে গিয়েছে। কোথাও দখল হয়ে গিয়েছে। ফলে প্রকৃতির তৈরি জলধারণ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

কেন ডুবে যায় কলকাতা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতার কারণ শুধু ভারী বৃষ্টি নয়। বরং সমস্যার মূল তিনটি— প্রথমত, খাল ও জলাভূমির সংকোচন।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত কংক্রিটায়ন। ফলে বৃষ্টির জল মাটির ভিতরে ঢুকতে পারে না। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা বৃদ্ধি। অর্থাৎ এক সময় যে জল খোলা জমি ও জলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ত, এখন সেই জল সরাসরি রাস্তা ও আবাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করছে।

কলকাতার সামনে ভবিষ্যতের প্রশ্ন

গত এক দশকে কলকাতা পুরসভা নতুন পাম্পিং স্টেশন, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিকাশি পরিকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে বহু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতিও হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, শুধুমাত্র যন্ত্র কি প্রকৃতির বিকল্প হতে পারে? পাম্প জল সরাতে পারে, কিন্তু জল ধারণ করতে পারে না। খাল ও জলাভূমি পারে।
সেই কারণেই পরিবেশবিদদের একাংশ মনে করেন, কলকাতার ভবিষ্যৎ ড্রেনেজ নীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত পূর্ব কলকাতা জলাভূমি এবং শহরের ঐতিহাসিক খালগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করা।

ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট

জব চার্নকের কলকাতা থেকে আজকের স্মার্ট সিটি— এই দীর্ঘ পথচলায় শহরকে বারবার বাঁচিয়েছে কোনও আধুনিক যন্ত্র নয়, পূর্ব আকাশের নীচে বিস্তৃত সেই জলাভূমি। যে জলাভূমি আজও নীরবে বয়ে নিয়ে যায় মহানগরের বৃষ্টির জল, নর্দমার জল এবং কোটি মানুষের শহরজীবনের বোঝা।
কলকাতার জলযন্ত্রণা বুঝতে হলে তাই নর্দমার ভিতরে নয়, তাকাতে হবে শহরের হারিয়ে যাওয়া জলাভূমির দিকে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য