mobile tower
২০শে এপ্রিল, ২০২৬
শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে 5G ইন্টারনেট পরিষেবা। ইতিমধ্যেই 6G প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাও জোরকদমে শুরু হয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের আড়ালে কি চুপিসারে বদলে যাচ্ছে আমাদের পরিবেশ? বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো কৃষিনির্ভর ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ রাজ্যে এই প্রশ্ন এখন বিজ্ঞানীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
অদৃশ্য তরঙ্গের প্রভাব! কতটা বাস্তব?
5G ও ভবিষ্যতের 6G প্রযুক্তি মূলত উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ (EMF) ব্যবহার করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই তরঙ্গের প্রভাব শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রকৃতির ওপরও এর সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে। একাধিক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বলছে, পোকামাকড় বিশেষ করে মৌমাছি এই উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ বেশি শোষণ করে, কারণ- তরঙ্গের দৈর্ঘ্যের সাথে তাদের শরীরের আকারের সাদৃশ্য।
মৌমাছি বিপদে?
মৌমাছি শুধু মধু দেয় না- পরাগায়নের মাধ্যমে কৃষির মেরুদণ্ডও। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণ মৌমাছির 'হোমিং ক্ষমতা' (Homing Ability/Capacity) কমিয়ে দিতে পারে।

মৌমাছির 'হোমিং ক্ষমতা' কী?
মৌমাছির নিজের মৌচাক বা বাসস্থান থেকে অনেক দূরে (কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত) অপরিচিত স্থানে বা খাদ্য সংগ্রহের জায়গায় গিয়ে পুনরায় সফলভাবে নিজ মৌচাকে ফিরে আসার অসাধারণ ক্ষমতা । এছাড়াও আরও কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, এই বিকিরণ তাদের খাবার খোঁজার দক্ষতাকেও ব্যাহত করতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গের ধান, সবজি, ফল উৎপাদনে।
পাখিদের দিশেহারা উড়ান
শুধু পোকামাকড় নয়, পাখিদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ বাড়ছে। গবেষণা বলছে, তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ পাখিদের “ম্যাগনেটিক কম্পাস” বা দিক নির্ণয়ের ক্ষমতা বিঘ্নিত করতে পারে। এর ফলে পরিযায়ী পাখির পথ ভুল হওয়া, বাসা বাঁধার অভ্যাসে পরিবর্তন, প্রজননে সমস্যা দেখা দিতে পারে৷ এমনকি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শক্তিশালী বিকিরণ এলাকায় চড়ুইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

গাছপালা ও ইকোসিস্টেমে প্রভাব
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, ক্রমবর্ধমান 'ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক দূষণ' গোটা ইকোসিস্টেমে প্রভাব ফেলতে পারে। উদ্ভিদ, পোকা, প্রাণী—সবাই কোনও না কোনওভাবে এই তরঙ্গের প্রতি সংবেদনশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি মৌমাছি কমে যায়, পাখির সংখ্যা হ্রাস পায়, তাহলে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে কি আতঙ্কের কারণ?
বিজ্ঞানী মহলের একাংশ বলছে, এই প্রভাব নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেক গবেষণাই প্রাথমিক স্তরে, এবং সব ক্ষেত্রেই একই ফল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির মতে, নির্ধারিত সীমার মধ্যে ৫জি বিকিরণ মানুষের জন্য নিরাপদ, তবে পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলার বাস্তবতা
পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল, ধানক্ষেত, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ—সব মিলিয়ে এই রাজ্য একটি সংবেদনশীল ইকোসিস্টেম। এখানে—
কৃষি নির্ভরতা বেশি, পোকামাকড় ও পাখির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ ৷ ফলে নতুন প্রযুক্তির প্রভাব এখানে তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে।
সামনে কী পথ?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: টাওয়ার স্থাপনে পরিবেশগত সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, কৃষি ও বনাঞ্চলে বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বাড়ানো জরুরি৷
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ভারতের পথে ৫জি ও ৬জি এক অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, দ্রুত ইন্টারনেটের দৌড়ে আমরা কি নিজেদের অজান্তেই হারাচ্ছি প্রকৃতির নীরব সহযোদ্ধাদের?
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।