

সিলিকন ভ্যালিতে প্রবাসীদের দাপট। ছবি - AI
বিশ্বের বড় বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের নেতৃত্বও এখন প্রবাসী ভারতীয়দের হাতে। এঁরা শুধু টাকা ঢালছেন তা নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিপটেক বা বায়োটেকনোলজির মতো আগামী দিনের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর দিকনির্দেশনাও দিচ্ছেন।
একসময় উন্নত জীবন ও আরো ভালো সুযোগের আশায় দেশ ছাড়ত মেধাবীরা। যাকে একটু আক্ষেপের সুরেই বলা হত 'ব্রেন ড্রেন' বা মেধা পাচার। যদিও সেই চিত্রটাই আজ অনেকটা বদলে গেছে। এই 'পাচার' হওয়া মেধা আজ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যা শুধু ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও প্রযুক্তির একটা বিশাল কৌশলগত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন মুলুকের সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে খোদ ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী মহল, সব জায়গায় প্রবাসী ভারতীয়দের দাপট। ব্যাপারটা এখন আর শুধু কোডিং করা বা নতুন প্রযুক্তি তৈরির মধ্যে আটকে নেই। বিশ্বের অর্থনীতি কীভাবে চলবে বা আগামী দিনের প্রযুক্তি কোন দিকে বাঁক নেবে, তার অনেকটাই এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রবাসী ভারতীয়রা।
সিলিকন ভ্যালিতে ভারতীয়দের প্রভাবের কথা উঠলেই সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুন্দর পিচাই, সত্য নাদেলার মতো সিইওদের মুখ। কিন্তু এই অবিস্মরণীয় যাত্রাটা শুধু মার্কিন টেক জায়ান্টগুলোর শীর্ষ পদগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন কোন জিনিসটা আসবে, কোন স্টার্টআপটা ডানা মেলবে আর কোনটা হারিয়ে যাবে, তার অনেকটাই কিন্তু নির্ভর করে বিনিয়োগের উপর। আর এই বিনিয়োগের চাবিকাঠি যাদের হাতে থাকে, সেই 'কিংমেকার' বা ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের একটা বিরাট অংশই এখন ভারতীয় বংশোদ্ভূত।
বিশ্বের বড় বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের নেতৃত্বও এখন প্রবাসী ভারতীয়দের হাতে। এঁরা শুধু টাকা ঢালছেন তা নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিপটেক বা বায়োটেকনোলজির মতো আগামী দিনের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর দিকনির্দেশনাও দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য হলেন-
বিনোদ খোসলা (Khosla Ventures): সান মাইক্রোসিস্টেমসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিনোদ খোসলার নাম ভেঞ্চার ক্যাপিটালের দুনিয়ায় একটা মিথ। আর্লি-স্টেজ ডিপটেক আর AI উদ্যোগে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি একেবারে সামনের সারিতে আছেন।
হেমন্ত তানেজা (General Catalyst): জেনারেল ক্যাটালিস্টের সিইও এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে তিনি স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি আর আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে বিপ্লব আনার চেষ্টা করছেন।

নবীন চড্ডা (Mayfield Fund): মেফিল্ড ফান্ডের ম্যানেজিং পার্টনার নবীন চড্ডা গত কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য স্টার্টআপকে সফল হতে সাহায্য করেছেন।
প্রমোদ হক (Norwest Venture Partners): প্রযুক্তি বিনিয়োগে প্রমোদ হকের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। তাঁর হাত ধরে বহু তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা আজ বিশ্বমঞ্চে শক্ত জায়গা করে নিয়েছে।
সিলিকন ভ্যালিতে ভারতীয় উদ্যোক্তা আর বিনিয়োগকারীদের এই সাফল্যের পেছনে ১৯৯২ সালে তৈরি হওয়া 'TiE' (The Indus Entrepreneurs)-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এটা শুধু একটা পেশাদার নেটওয়ার্ক নয়, বরং নতুন প্রজন্মের ভারতীয় উদ্যোক্তাদের কাছে একটা ভরসার জায়গা। TiE-এর হাত ধরে হাজার হাজার স্টার্টআপ তাদের শুরুর দিকের মূলধন আর সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়েছে।
প্রবাসী ভারতীয়দের এই সাফল্যের ঢেউ এসে লেগেছে ভারতের নিজস্ব অর্থনীতিতেও। বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য বলছে, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ভারত এখন বিশ্বে এক নম্বরে। বছরে ১৩৮ বিলিয়ন থেকে ১৪৪.৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসছে দেশে। শুধু তাই নয়, মহাদেশভিত্তিক গ্লোবাল ফান্ডগুলোর একটা বড় অংশই এখন ভারতের দিকে আসছে। মজার ব্যাপার হল, সিলিকন ভ্যালির প্রতি ১০টি সফল স্টার্টআপের অন্তত ৩ টিতেই কোনও না কোনও ভারতীয় সহ-প্রতিষ্ঠাতা আছেন।
গুগল, মাইক্রোসফট, আইবিএম, অ্যাডোবি- বিশ্বের এই সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষে এখন ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা। সুন্দর পিচাই, সত্য নাদেলা, অরবিন্দ কৃষ্ণা বা শান্তনু নারায়ণের মতো মানুষজন শুধু তাদের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে নয়, বরং দক্ষতা আর যোগ্যতার জোরে বিশ্ব অর্থনীতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এর পেছনে একটা বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণও আছে। সিলিকন ভ্যালি বরাবরই বড় স্বপ্ন আর অবাধ সম্পদের ব্যবহারের ওপর জোর দেয়। কিন্তু ভারতীয়দের বেড়ে ওঠা তো সীমিত সম্পদের মধ্যে দিয়ে। এই 'জুগাড়' বা কম সম্পদে সর্বোচ্চ ফল পাওয়ার চেষ্টা আর কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা তাঁদের অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। সঙ্কট সামলানোর ক্ষেত্রে এই দুইয়ের মিশ্রণ তাঁদের একটা অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়।
অর্থনীতি আর প্রযুক্তিতে দাপট দেখানোর পর প্রবাসী ভারতীয়রা এখন বিশ্ব রাজনীতিতেও নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। আমেরিকার রাজনীতিতে 'সামোসা ককাস' (Samosa Caucus) নামে পরিচিত ভারতীয়-মার্কিন আইনপ্রণেতাদের দল এখন রীতিমতো প্রভাব ফেলে। বিশ্ব রাজনীতিতে কমলা হ্যারিস বা ঋষি সুনাকের মতো ব্যক্তিত্বদের উত্থান প্রবাসী ভারতীয়দের প্রভাবের দিকেই নির্দেশ করে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি চুক্তি (যেমন iCET) ত্বরান্বিত করতে এবং সেমিকন্ডাক্টর বা AI শিল্পে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন।
এই পুরো বিষয়টা ভারতের জন্য একটা দারুণ ব্যাপার। আগে যেটাকে আমরা মেধা পাচার বলে দুঃখ করতাম, সেটাই এখন মেধা সঞ্চয় (Brain Gain) হয়ে ফিরে আসছে। প্রবাসে সফল হওয়া ভারতীয় বিনিয়োগকারী আর উদ্যোক্তারা এখন ভারতের স্টার্টআপগুলোতেও বিনিয়োগ করছে। বিশেষ করে ডিপটেক, সাস (SaaS) বা ফিনটেক খাতগুলোতে প্রচুর টাকা ঢালছেন।
এর ফলে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো এখন শুধু সস্তা শ্রমের খোঁজে নয়, বরং উদ্ভাবনের জন্য ভারতে 'গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার' (GCC) তৈরি করছে। এর পেছনেও কাজ করছেন প্রবাসী ভারতীয় নির্বাহীরাই। এর পাশাপাশি, ভারত সরকারের নানা উদ্যোগ আর এখানকার বাজারের বিপুল সম্ভাবনার কারণে অনেক প্রবাসী প্রযুক্তিবিদ আর উদ্যোক্তা দেশে ফিরে এসে নিজেদের স্টার্টআপ তৈরি করছেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
