

গাট মাইক্রোবায়োম। ছবি - AI
পেট আর মস্তিষ্কের মধ্যে সত্যিই যোগাযোগ রয়েছে, কিন্তু সেই সম্পর্ক সরল নয়। তাই ‘মন ভাল রাখতে পেট ভাল রাখুন’ কথাটি হয়তো নিছক প্রবাদ নয়।
‘মনের সঙ্গে পেটের আবার সম্পর্ক কী?’ প্রশ্নটা শুনতে অদ্ভুত লাগলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সম্পর্কটা বেশ গভীর। হজমের গোলমাল, অন্ত্রের অস্বস্তি কিংবা খাবারের ধরন শুধু পেটেই প্রভাব ফেলে না, শরীরের নানা রাসায়নিক ও স্নায়বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্কের সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি করতে পারে। আবার উল্টো দিকেও মস্তিষ্কের চাপ, উদ্বেগ বা মানসিক উত্তেজনার প্রভাব পড়ে অন্ত্রের কাজকর্মে। এই জটিল দ্বিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থার নাম ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’।
মানুষের অন্ত্রে বাস করে অসংখ্য অণুজীব: ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক-সহ নানা ধরনের জীবাণু। তাদের সম্মিলিত পরিবেশকে বলা হয় ‘গাট মাইক্রোবায়োম’। এরা শুধু খাবার হজমের প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে না, শরীরের বিপাক, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেত তৈরিতেও ভূমিকা নেয়। বিশেষ করে খাবারের কিছু উপাদান ভেঙে এই অণুজীবগুলি যে বিপাকজাত পদার্থ তৈরি করে, তার কিছু অংশ অন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের যোগাযোগে ভূমিকা রাখতে পারে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা হল ভেগাস নার্ভ বা ভ্যাগাস স্নায়ু। অন্ত্র থেকে আসা নানা সংকেত এই স্নায়ুপথে মস্তিষ্কে পৌঁছতে পারে। একই সঙ্গে হরমোন, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সংকেত এবং অন্ত্রে তৈরি বিভিন্ন বিপাকজাত পদার্থও এই যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ। অর্থাৎ, অন্ত্র ও মস্তিষ্ক যেন আলাদা দু’টি ঘর নয়—মাঝখানে রয়েছে একাধিক যোগাযোগের রাস্তা।
এই কারণেই মানসিক চাপের সময় অনেকের পেটে অস্বস্তি, গ্যাস, পেট ব্যথা বা পায়খানার অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা যায়। আবার দীর্ঘদিনের অন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে উদ্বেগ বা মনমেজাজের সমস্যার সম্পর্কও গবেষণায় দেখা হয়েছে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে, একটি সমস্যা অন্যটির সরাসরি কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ এখনও নেই। বরং মস্তিষ্ক, অন্ত্র, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস এবং মাইক্রোবায়োম পরস্পরকে প্রভাবিত করে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
মস্তিষ্কের সঙ্গে অন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় সেরোটোনিনের কথা প্রায়ই উঠে আসে। মেজাজ, ঘুম, ক্ষুধা-সহ শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় এই রাসায়নিক বার্তাবাহকের ভূমিকা রয়েছে। তবে ‘অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া সরাসরি মস্তিষ্কের সেরোটোনিন বাড়িয়ে দেয়’, এমন সরল ব্যাখ্যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। অন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র এবং বিভিন্ন বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্কটি অনেক বেশি জটিল।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অন্ত্রের অণুজীবের ভারসাম্যে পরিবর্তনের সঙ্গে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং কিছু অন্যান্য মানসিক সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনটি কারণ আর কোনটি ফল, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। ২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনাতেও বিজ্ঞানীরা জোর দিয়েছেন, মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তন ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ককে শুধু ‘কারণ-ফল’ হিসেবে দেখার আগে আরও শক্তিশালী মানব-গবেষণা প্রয়োজন।
অন্ত্রের অণুজীবের গঠন ও কার্যকলাপের উপর খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল, ডাল এবং সম্পূর্ণ শস্য অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্য বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। অন্য দিকে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, কম আঁশ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। তবে শুধু কোনও একটি খাবার বা প্রোবায়োটিক খেলেই মানসিক সমস্যা সেরে যাবে, এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই।
এ কারণেই বিজ্ঞানীদের নজরে এখন ‘মাইক্রোবায়োম-গাট-ব্রেন’ সম্পর্কটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র। ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট অণুজীব, তাদের তৈরি বিপাকজাত পদার্থ এবং মস্তিষ্কের সঙ্গে তাদের যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে নতুন চিকিৎসার পথ খোঁজা যেতে পারে। ‘সাইকোবায়োটিক’ বা মাইক্রোবায়োম-ভিত্তিক চিকিৎসা নিয়েও গবেষণা চলছে, যদিও এখনও তা গবেষণার পর্যায়েই রয়েছে এবং নিয়মিত চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ধরা যায় না।
অর্থাৎ, পেট আর মস্তিষ্কের মধ্যে সত্যিই যোগাযোগ রয়েছে, কিন্তু সেই সম্পর্ক সরল নয়। হজম, অন্ত্রের অণুজীব, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, স্নায়ু, হরমোন এবং মানসিক চাপ- সব মিলিয়ে তৈরি হয় শরীরের এক জটিল যোগাযোগ-জাল। তাই ‘মন ভাল রাখতে পেট ভাল রাখুন’ কথাটি হয়তো নিছক প্রবাদ নয়। তবে তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বুঝতে এখনও গবেষণার অনেক পথ বাকি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
