

ডেঙ্গু নিরাময়ে পেঁপে পাতার রস কতটা কাজের? ছবি - Google
৫ই আগস্ট, ২০২৬
বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর দাপট বাড়ে। হাসপাতালের বেড ভরতে শুরু করে জ্বরে কাবু রোগীতে। সেই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং লোকমুখে ফের ঘুরে বেড়ায় এক পরিচিত পরামর্শ - ‘পেঁপে পাতার রস খাও, প্লেটলেট বেড়ে যাবে।’ অনেক পরিবারে চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি, আবার কোথাও কোথাও চিকিৎসার বিকল্প হিসেবেই পেঁপে পাতার রস খাওয়ানো হয়। কিন্তু এই বহুল প্রচলিত বিশ্বাসের পিছনে আদৌ কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে?
সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও চিকিৎসা-বিশ্লেষণ সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছে। ফলাফল বলছে, পেঁপে পাতার নির্যাস (Carica papaya leaf extract) নিয়ে আশাব্যঞ্জক কিছু তথ্য মিললেও, এখনও পর্যন্ত এটিকে ডেঙ্গুর কার্যকর বা স্বীকৃত চিকিৎসা হিসেবে ঘোষণা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ মেলেনি।
গত এক দশকে ভারত, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা সহ ডেঙ্গুপ্রবণ একাধিক দেশে পেঁপে পাতার নির্যাস নিয়ে ছোট ও মাঝারি আকারের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রস্তুত করা পেঁপে পাতার নির্যাস গ্রহণের পরে কিছু রোগীর প্লেটলেটের সংখ্যা তুলনামূলক দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি শ্বেত রক্তকণিকা বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে গবেষকদের মতে, এখানেই ছবির শেষ নয়। অধিকাংশ গবেষণার নমুনা ছিল সীমিত। কোথাও ৫০ জন, কোথাও ১০০-২০০ জন রোগীর উপর পরীক্ষা হয়েছে। আবার কোন গবেষণায় কী ধরনের নির্যাস, কত মাত্রায় এবং কত দিন ব্যবহার করা হয়েছে, তারও একরকম মানদণ্ড নেই। ফলে এক গবেষণার ফল অন্য গবেষণার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা কঠিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্লেটলেটের সংখ্যা বাড়লেও রোগীর মৃত্যুহার কমেছে কি না, ডেঙ্গু শকের ঝুঁকি কমেছে কি না, আইসিইউ-তে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন কমেছে কি না - এসব বিষয়ে এখনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই শুধুমাত্র প্লেটলেট বাড়ানোর তথ্যের ভিত্তিতে একে ডেঙ্গুর ওষুধ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাই হল - প্লেটলেট কমলেই বিপদ, আর প্লেটলেট বাড়লেই রোগ সেরে যাচ্ছে।
বাস্তবে ডেঙ্গু অনেক বেশি জটিল। রোগের মারাত্মক পর্যায়ে শরীরের রক্তনালি থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যেতে পারে, রক্তচাপ কমে যেতে পারে, লিভার, কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনেক রোগীর প্লেটলেট ২০-৩০ হাজারেও নেমে গেলেও তিনি স্থিতিশীল থাকেন। আবার কারও প্লেটলেট তুলনামূলক বেশি থাকলেও গুরুতর রক্তক্ষরণ বা শক দেখা দিতে পারে।
তাই চিকিৎসকেরা প্লেটলেটের পাশাপাশি হেমাটোক্রিট, রক্তচাপ, অক্সিজেনের মাত্রা, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র ডেঙ্গু চিকিৎসা নির্দেশিকায় পেঁপে পাতার নির্যাসকে ডেঙ্গুর নিয়মিত চিকিৎসার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সংস্থার মতে, ডেঙ্গুর চিকিৎসার মূল ভিত্তি এখনও সময়মতো রোগ নির্ণয়, পর্যাপ্ত তরল সরবরাহ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা।
একই অবস্থান নিয়েছে বহু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞের সংগঠনও। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে বড় আকারের গবেষণায় যদি সুস্পষ্ট উপকার প্রমাণিত হয়, তবেই চিকিৎসা-নীতিতে পরিবর্তনের প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বাড়িতে তৈরি পেঁপে পাতার রসে ঠিক কতটা সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, তা কেউ জানেন না। পাতার বয়স, প্রজাতি, প্রস্তুতির পদ্ধতি - সবকিছুর উপর নির্ভর করে এর গুণগত মান বদলে যেতে পারে।
অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে বমি, পেটব্যথা, ডায়রিয়া, অ্যালার্জি বা লিভারের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া অন্য ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু ধরা পড়লে নিজের ইচ্ছায় কোনও ভেষজ বা বিকল্প চিকিৎসার উপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ। পর্যাপ্ত জল ও ওআরএস পান করা, বিশ্রাম নেওয়া, প্রয়োজনে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানোই ডেঙ্গু মোকাবিলার মূল অস্ত্র। ব্যথার জন্য আইবুপ্রোফেন বা ডাইক্লোফেনাকের মতো ওষুধ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পেঁপে পাতার নির্যাস নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে। কিছু ক্ষেত্রে এটি প্লেটলেট বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে বলে প্রাথমিক ইঙ্গিত মিলেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এমন কোনও শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, যা এটিকে ডেঙ্গুর স্বীকৃত বা নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
বরং বিশেষজ্ঞদের একটাই বার্তা - ডেঙ্গুতে আতঙ্ক নয়, গুজবও নয়; চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
