

প্রতীকী ছবি - AI
১৩ই আগস্ট, ২০২৬
পাল ও সেন রাজাদের আমলে যে হুগলি নদীর তীরে কেবল জেলে আর তাঁতিদের ছোট ছোট কুটির ছিল, সেই কাদামাটির জনপদই একদিন হয়ে ওঠে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী- 'লন্ডন অফ দ্য ইস্ট'। আমাদের কলকাতা। কিন্তু একটি ছোট ট্রানজিট পয়েন্ট থেকে গোটা একটা সাম্রাজ্যের স্নায়ুকেন্দ্র হয়ে ওঠার এই পথটা মোটেও সহজ ছিল না। শহর কলকাতার এই বিবর্তনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এখানকার যাতায়াত ব্যবস্থার ইতিহাস।
জলপথে ছিপ নৌকা থেকে শুরু করে মানুষের কাঁধে চাপা পালকি, ঘোড়ার খুরের দপদপানি আর শেষমেশ লোহার পাতের উপর দিয়ে কুউউউ ঝিকঝিক রেলগাড়ি- কলকাতার পরিবহনের গল্প যেন খোদ শহরটারই বড় হয়ে ওঠার গল্প বলে।
সুপ্রাচীন কাল থেকে সুলতানি আমল পর্যন্ত কলকাতা (যদিও কলকাতা নামটি অনেক পরে এসেছে) ও তার আশেপাশের জনপদগুলোর যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রাণভোমরা ছিল নদী। স্থলপথে কোনও সুনির্দিষ্ট রাস্তা ছিল না। সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতেন হাঁটাপথে, আর মালপত্র বওয়ার জন্য ভরসা ছিল গোরুর গাড়ি। তবে আভিজাত্য ও বাণিজ্যের মাপকাঠি ছিল জলপথ। ধনী বণিক আর জমিদারদের যাতায়াতের জন্য ছিল সুসজ্জিত 'বজরা' বা 'ময়ূরপঙ্খী' নৌকা। পাল ও সেন যুগেও হুগলি নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলটি ছিল বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ জলপথ।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের হাত ধরে এবং পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে শহরের রূপরেখা বদলাতে শুরু করে। তৈরি হয় কাঁচা-পাকা রাস্তা। আর এই রাস্তায় যাতায়াতের রাজকীয় মাধ্যম হয়ে ওঠে পালকি।
সে যুগে পালকি ছাড়া বাবুদের বা সাহেবদের বাড়ির বাইরে পা রাখার কথা ভাবাই যেত না। ব্রিটিশ আধিকারিক, মেমসাহেব থেকে শুরু করে দেশীয় জমিদার সবারই আভিজাত্যের প্রতীক ছিল এই যান। পালকি বাহক বা বেহারাদের অধিকাংশই আসতেন ওড়িশা থেকে, যাদের চলতি কথায় বলা হতো 'উড়ে বেহারা'। কিন্তু এই পালকি ঘিরেই যে কলকাতার বুকে এমন এক গণ-আন্দোলন দানা বাঁধবে, তা বোধহয় খোদ ব্রিটিশ প্রশাসনও টের পায়নি।
কলকাতার যাতায়াতের ইতিহাসে অত্যন্ত নাটকীয়, অথচ কালের ভারে প্রায় বিস্মৃত একটি অধ্যায় হল ১৮২৭ সালের পালকি ধর্মঘট। এটিকে সমগ্র ভারতের বুকে অন্যতম প্রাচীন ও সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত: সেই সময় বেহারারা যাত্রীদের থেকে নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া হাঁকতেন। এর প্রতিকার চেয়ে সাহেবরা পুলিশের দ্বারস্থ হন। ১৮২৭ সালের মে মাসে কলকাতা পুলিশ একটি কড়া নির্দেশিকা জারি করে। ঠিক হয়, দূরত্বের ভিত্তিতে পালকির ভাড়া নির্দিষ্ট করা হবে এবং প্রত্যেক বেহারাকে পরিচয়পত্র হিসেবে একটি তামা বা পিতলের ব্যাজ বা 'বিল্যা' পরতে হবে।
ধর্মঘটের গতিপ্রকৃতি: এই ফতোয়া জারির পরই ফুঁসে ওঠেন বেহারারা। একে নিজেদের পেশাগত স্বাধীনতা ও আত্মসম্মানের উপর হস্তক্ষেপ বলে মনে করেন। ফলস্বরূপ, কলকাতার হাজার হাজার পালকি বেহারা একযোগে কাজ বন্ধ করে দেন। শুরু হয় ঐতিহাসিক পালকি ধর্মঘট।
শহরের বেহাল দশা: বেহারাদের এই ধর্মঘটে কলকাতার জনজীবন কার্যত পঙ্গু হয়ে যায়। সাহেবদের মাথায় হাত পড়ে। মেমসাহেবদের সান্ধ্যকালীন আড্ডায় যাওয়া বন্ধ হয়। অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য সব লাটে ওঠার জোগাড় হয়।
ঐতিহাসিক পরিণতি: কয়েকদিন শহর অচল থাকার পর ব্রিটিশ প্রশাসন উপলব্ধি করে, পরিবহন ব্যবস্থার জন্য শুধুমাত্র মানুষের কাঁধের উপর নির্ভর করাটা চরম বোকামি হচ্ছে। এই ধর্মঘটই কলকাতার যাতায়াত ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ধর্মঘট উঠলেও, সাহেবরা বিকল্প যানের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।
পালকি ধর্মঘটের পর থেকেই কলকাতার রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শহরের রাস্তায় নামল ব্রাউনবেরি, ফিটন, ল্যান্ডোলেট এবং সাধারণের জন্য ছ্যাকরা গাড়ি। পালকির জায়গা নিল জুড়িগাড়ি। সেই সময় সন্ধেবেলা গড়ের মাঠে ঘোড়ার গাড়িতে হাওয়া খেতে যাওয়াটাই ছিল বাবু-কালচারের নতুন ট্রেন্ড।
যাতায়াতের বিবর্তনের এই গল্পে নতুন পালক যোগ হয় ১৮৫৪ সালে। হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত সেই প্রথম কলকাতায় রেলগাড়ি ছুটল। তবে শহরের ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় বিপ্লব এল ট্রামের হাত ধরে। ১৮৭৩ সালে শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত ঘোড়ায় টানা ট্রাম দিয়ে শুরু, আর ১৯০২ সালে ধর্মতলা থেকে খিদিরপুর পর্যন্ত ছুটল এশিয়ার প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম।
এই সময়ই চিনা অভিবাসীদের হাত ধরে কলকাতার রাস্তায় জায়গা করে নিল হাতে-টানা রিকশা।
১৯১১ সালে যখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরে যাচ্ছে, তখন কলকাতা আর কোনও কাদামাটির গ্রাম নয়। পালকি বেহারাদের ঘামের গন্ধ আর পালকি ধর্মঘটের সেই জেদ কলকাতাকে শিখিয়েছিল আধুনিক হতে। পালের ডিঙি থেকে শুরু হওয়া যাত্রা ততদিনে বৈদ্যুতিক ট্রাম আর সদ্য আসা মোটরগাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে এক পূর্ণাঙ্গ আধুনিক মহানগরের রূপ পেয়ে গেছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
