২৭শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
কলকাতার স্ট্রিট আর্ট ও বদলে যাওয়া চেনা অলিগলি

কলকাতার স্ট্রিট আর্ট। ছবি - Google

কলকাতার স্ট্রিট আর্ট ও বদলে যাওয়া চেনা অলিগলি

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

কলকাতার স্ট্রিট আর্ট

কলকাতার পথচিত্র চিরাচরিত রাজনৈতিক দেওয়াল লিখন পেরিয়ে এখন আধুনিক সৌন্দর্যায়ন ও নাগরিক সংযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। মার্ক্সীয় নন্দনতত্ত্বের নিরিখে এটি একদিকে যেমন ‘বুর্জোয়া’ গ্যালারির প্রাতিষ্ঠানিক ঘেরাটোপ ভেঙে শিল্পকে গণমানুষের কাছে এনে দেয়, তেমনই অন্যদিকে কর্পোরেট স্পনসরশিপ ও জেন্ট্রিফিকেশনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হওয়ার দ্বন্দ্বেও আটকে পড়ে।

মূল বিষয়

কলকাতা বরাবরই শিল্পের শহর। দেওয়াল লিখন, রাজনৈতিক স্লোগান, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি কিংবা মেট্রো স্টেশনের রঙিন মোজাইক—এসব দৃশ্য শহরের বুকে নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কলকাতার রূপ যেন অনেকটাই বদলে গেছে। শহরের প্রাণ এখন কেবল চিরাচরিত চুনকামের রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই; তা স্পন্দিত হচ্ছে প্রতিটি দেওয়ালে, ক্যাফের সামনের গলিতে কিংবা পুরো পাড়া জুড়ে আঁকা প্রাণবন্ত স্ট্রিট আর্টে বা পথচিত্রে।

প্রতিবাদের ভাষা থেকে কল্পনার ক্যানভাস

কলকাতার স্ট্রিট আর্ট মানেই কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এতে মিশে রয়েছে খেয়ালি কল্পনা, বিমূর্ত শৈলী, আধুনিক নকশা এবং ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ। অনেকের কাছে এখনও এই ধরনের কাজ নিছক ‘দেওয়াল নোংরা করা’ মনে হতে পারে, কিন্তু খোলামেলা পাবলিক স্পেসের এই শিল্প শহরের একঘেয়েমি দূর করে এক রঙবেরঙের ওয়াল্টার চরিত্র তৈরি করে। বিভিন্ন স্বাধীন শিল্পী ও উদ্যোগের হাত ধরে শহরের সাদামাটা ধূসর জায়গাগুলো এখন পরিণত হচ্ছে এক একটি জীবন্ত স্বপ্নপুরীতে।

নান্দনিকতার দ্বন্দ্ব: গণমানুষের শিল্প বনাম 'সৌন্দর্যায়ন'

মার্ক্সীয় নন্দনতত্ত্বের (Marxist Aesthetics) আলোয় দেখলে কলকাতার এই বদলে যাওয়া পথচিত্র এক চমকপ্রদ বিতর্কের জন্ম দেয়। ভাল্টার বেঞ্জামিনের (Walter Benjamin) সেই বিখ্যাত প্রশ্ন মনে পড়ে যায়—যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পের যে 'অরা' (aura) ক্ষুণ্ণ হয়, তা কি শিল্পকে 'বুর্জোয়া' জাদুঘর থেকে মুক্ত করে সরাসরি গণমানুষের হাতে পৌঁছে দিতে পারে? পথচিত্র প্রাথমিকভাবে ঠিক সেটাই করে। গ্যালারির প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচীর ভেঙে শিল্প নেমে আসে একদম ফুটপাথে।

তবে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক থিওডোর অ্যাডর্নো (Theodor Adorno) যে ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’ (Culture Industry) বা সংস্কৃতি শিল্পের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, তাও এখানে স্পষ্ট। যখন কোনো কর্পোরেট ব্র্যান্ড বা বিলাসবহুল ক্যাফে স্ট্রিট আর্টকে স্পনসর করে, তখন সেই আঁকা কি আর জনস্বার্থের খাঁটি প্রতিবাদী দলিল থাকে? নাকি তা শহুরে 'জেন্ট্রিফিকেশন' (gentrification)—অর্থাৎ চড়া দামের ক্যাফে সংস্কৃতির স্বার্থে পথঘাটকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় শামিল হয়? পথচিত্র এখানে এক দ্বিমুখী টানাপোড়েনের শিকার: একদিকে তা মেহনতি মানুষের খোলা আকাশের ক্যানভাস, অন্যদিকে তা শহুরে মধ্যবিত্তের ইনস্টাগ্রাম-বান্ধব নান্দনিক পণ্য।

আরও পড়ুন
স্মার্টফোনের স্ক্রিন আর ই-কমার্সের দাপটে কেমন আছে কলেজ স্ট্রিট?
যানজটের চক্রব্যূহে কলকাতার নস্টালজিয়া: ট্রাম কি শুধুই অতীত?
ক্যাফে মাছি মারছে! ফের জমছে কফি হাউসের আড্ডাটাই?

পরিচ্ছন্নতা ও আপন করে নেওয়ার টান

দেওয়াল চিত্র শুধু সৌন্দর্যায়ন ঘটায় না, পরিবেশের রূপান্তরও ঘটায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো মহল্লায় যখন সুন্দর শিল্পকলা থাকে, তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সেই অঞ্চলের এক অদ্ভুত মানসিক বন্ধন গড়ে ওঠে। এই আপনবোধ মানুষকে নিজের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে বাধ্য করে। পাবলিক আর্ট আসলে একটি অঞ্চলের নিজস্ব পরিচয় বা "কমিউনিটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট" তৈরি করে। মার্ক্সের ভাষায় যাকে বলা যায় নিজের কাজের ফল থেকে বিছিন্ন (alienated) না হয়ে নিজের চারপাশের ওপর সামাজিক মালিকানা কায়েম করা—মানুষ যখন পথঘাটকে নিজের বলে অনুভব করে, তখন শহরকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটাই আমূল বদলে যায়।

নেই কোনও ভেদাভেদ

কলকাতার পথশিল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হল—এখানে দৃশ্যমান কোনো ভেদাভেদ নেই। ঝাঁ-চকচকে ক্যাফে, অফিস কিংবা বহুতল ভবনে যেমন এই শিল্পের দেখা মেলে, তেমনই সরু গলির জীর্ণ দেওয়াল, পুরনো গ্যারেজ বা ভাঙা দরজার গায়েও শিল্পীরা রং-তুলির আঁচড় বসিয়ে দেন। এর পাশাপাশি ‘আর্ট রিকশা’-র আয়োজিত 'কলকাতা আর্টস লেন ফেস্টিভ্যাল'-এর মতো উদ্যোগ শহরের এই শিল্পসংস্কৃতিকে এক নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে।

তারুণ্যের সৃজনশীলতা ও অন্তহীন অন্বেষণ

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রেসিডেন্সি কলেজ চত্বরে ঢুকলেই বোঝা যায়, তরুণ প্রজন্ম কীভাবে শিল্পের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ক্ষোভ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ফুটিয়ে তুলেছে। বার্টল্ট ব্রেশ্‌ট (Bertolt Brecht) যেমন বলেছিলেন, শিল্প কেবল বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করার আয়না নয়, এটি এমন একটি হাতুড়ি যা দিয়ে বাস্তবতাকে নতুন আকার দেওয়া যায়। ক্যাম্পাসের দেওয়ালগুলোতে আঁকা কার্টুন ও রাজনৈতিক ম্যুরালগুলো ঠিক এই হাতুড়ির মতোই বিদ্যমান সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে কথা বলে।

উত্তর থেকে দক্ষিণের অজস্র অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা এই শিল্পকর্মগুলো দেখতে দেখতে অনায়াসেই ক’টা দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। কলেজ স্ট্রিটের সংলগ্ন পুরনো চুন-সুরকির ভাঙা প্লাস্টারের ওপর কোনো গভীর রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র হোক, কিংবা হিন্দুস্তান পার্কের ক্যাফে গলির রঙিন ও পরাবাস্তব দেওয়াল—শহরের এই দৃশ্যপট একদিকে লড়াইয়ের দলিল, অন্যদিকে সময়েরও দলিল।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য