

কুমোরটুলির শিল্পীদের জীবনসংগ্রাম। ছবি - Google
উৎসবের আলোয় যাঁদের হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ পায় দেবীমূর্তি, বিসর্জনের পর তাঁদেরই অনেকের ঘরে নামে অনিশ্চয়তার অন্ধকার। বিশ্বজোড়া পরিচিতি কুমোরটুলির গর্ব। কিন্তু সেই গর্বকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে শিল্পের পাশাপাশি শিল্পীদের জীবনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
কলকাতার কুমোরটুলি। সরু গলি, পাশাপাশি ঠাসাঠাসি কর্মশালা, খড়ের কাঠামো, এঁটেল মাটির গন্ধ আর শিল্পীদের ব্যস্ত হাত- এই পরিচিত ছবির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এক আশ্চর্য শিল্পজগতের গল্প। এখানে মাটি শুধু মূর্তি গড়ার উপাদান নয়, বহু পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। শিল্পীদের আঙুলের ছোঁয়ায় খড়-মাটি-রংয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয় দেবদেবীর প্রতিমা। সেই প্রতিমাই পাড়ি দেয় দেশের নানা প্রান্তে, এমনকি বিদেশেও। বাঙালির দুর্গোৎসবের আবেগ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে। অথচ যাঁদের নিপুণ হাতে এই শিল্পের এমন বিশ্বজয়, তাঁদের নিজেদের জীবনেই অনেক সময় জোটে না আর্থিক নিশ্চয়তা।
কুমোরটুলির প্রতিটি কর্মশালার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোনও না কোনও পরিবারের ইতিহাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মূর্তি গড়াই তাঁদের পেশা, তাঁদের পরিচয়, তাঁদের গর্ব। কেউ শিখেছেন বাবার হাত ধরে, কেউ আবার ছোটবেলা থেকেই পরিবারের কাজে হাত লাগিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রতিমার চাহিদা, বদলেছে শিল্পরীতি, বেড়েছে বিদেশের বাজারেও কাজ পাঠানোর সুযোগ। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সুফল সব শিল্পীর জীবনে সমান ভাবে পৌঁছয়নি।
প্রতিমা তৈরির কাজ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। প্রথমে বাঁশ ও কাঠের কাঠামো তৈরি, তার পর খড় বাঁধা, মাটি লাগানো, শুকনো মাটির উপর সূক্ষ্ম কারুকাজ, রং করা এবং সাজসজ্জা-প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন দক্ষতা, ধৈর্য ও সময়। বড় প্রতিমার ক্ষেত্রে একাধিক শিল্পী একসঙ্গে কাজ করেন। কোথাও মাসের পর মাস ধরে চলে প্রস্তুতি। আবার পুজোর আগে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার তাগিদে বাড়ে চাপ। সামান্য ভুলও নষ্ট করে দিতে পারে বহু দিনের পরিশ্রম।
অথচ এই বিপুল শ্রমের বিনিময়ে শিল্পীরা কতটা লাভ করেন, তা নির্ভর করে বরাত, প্রতিমার আকার, কাজের জটিলতা, কাঁচামালের দাম এবং দর কষাকষির উপর। মাটি, খড়, বাঁশ, কাঠ, রং ও সাজসজ্জার উপকরণের খরচ মেটানোর পর হাতে কতটা অর্থ থাকে, তা সব সময় নিশ্চিত নয়। বিশেষত ছোট কর্মশালার শিল্পীদের কাছে অগ্রিম টাকা না পাওয়া বা বরাত বাতিল হয়ে যাওয়া বড় আর্থিক ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে।
দুর্গাপুজোর আগে কুমোরটুলির চেহারা বদলে যায়। দিন-রাত এক করে চলে প্রতিমা তৈরির কাজ। কোনও কর্মশালায় চলছে চোখ আঁকার প্রস্তুতি, কোথাও আবার শেষ মুহূর্তের রং ও সাজসজ্জা। ক্রেতার পছন্দ, পুজো কমিটির বাজেট এবং প্রতিমা পৌঁছে দেওয়ার সময়সীমা- সব দিক সামলে এগোতে হয় শিল্পীদের। বরাত বেশি হলে কাজের চাপ সামলাতে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়। তাতে খরচও বাড়ে।
কিন্তু দুর্গাপুজোর এই কয়েক মাসের ব্যস্ততা দিয়েই সব পরিবারের সারা বছরের সংসার চলে না। অন্য পুজোর প্রতিমা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কালী বা অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি তৈরির কাজ থাকলেও তার পরিমাণ ও আয় এক রকম নয়। অনেক শিল্পীকে তাই মরসুমি কাজের উপর নির্ভর করেই সংসারের হিসাব মেলাতে হয়। কাজের অভাব দেখা দিলে কিংবা বরাতের টাকা সময়মতো না এলে ধারদেনা করে সংসার চালানোর পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
শিল্পের জগতে সাফল্যের গল্প যতটা উজ্জ্বল, তার আড়ালে শ্রমের মূল্য, আর্থিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও ততটাই বাস্তব। তবে কুমোরটুলির সব শিল্পীর পরিস্থিতি এক নয়। প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ও বড় কর্মশালার হাতে তুলনামূলক বেশি বরাত আসতে পারে, অন্য দিকে ছোট কারিগরদের কাজ পেতে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়। ফলে একই পাড়ার মধ্যেও আয় ও সুযোগের ফারাক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কুমোরটুলির প্রতিমা আজ শুধু কলকাতা বা বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রবাসী বাঙালিদের পুজো এবং দেশের বিভিন্ন শহরের উৎসবেও এখানকার শিল্পীদের তৈরি প্রতিমার চাহিদা রয়েছে। বিদেশে প্রতিমা পাঠানোর ক্ষেত্রে নকশা, মাপ, পরিবহণ, প্যাকেজিং এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরবরাহের মতো বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ধরনের পরিকল্পনা ও দক্ষতার প্রয়োজন।
এই আন্তর্জাতিক চাহিদা কুমোরটুলির শিল্পের পরিচিতি বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার সুফল কতটা পৌঁছচ্ছে প্রত্যেক কারিগরের কাছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রতিমা তৈরির মূল কাজটি যাঁরা করেন, তাঁদের অনেকেই থাকেন প্রচারের আড়ালে। শিল্পীর নামের বদলে পরিচিতি পায় কর্মশালা বা প্রতিমার নকশা। অথচ একটি প্রতিমার মুখের অভিব্যক্তি, চোখের টান কিংবা আঙুলের সূক্ষ্ম কাজের পিছনে থাকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অসামান্য নিষ্ঠা।
এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তাই শুধু বড় প্রতিমার প্রদর্শন বা বিদেশে রফতানির সাফল্যের কথা বললেই হবে না। প্রয়োজন শিল্পীদের দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন, কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া। কাঁচামালের দাম বাড়লে তার প্রভাব কী ভাবে ছোট কর্মশালাগুলির উপর পড়ে, শ্রমিকদের পারিশ্রমিক কী ভাবে নির্ধারিত হয় এবং বরাতের টাকা আটকে গেলে শিল্পীরা কী ভাবে পরিস্থিতি সামলান-এই প্রশ্নগুলিও আলোচনায় থাকা দরকার।
কুমোরটুলির শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণের উপরেও। প্রতিমা গড়ার কাজে যেমন শারীরিক পরিশ্রম রয়েছে, তেমনই রয়েছে বছরের পর বছর ধরে অর্জন করা দক্ষতার প্রয়োজন। কিন্তু এই পেশায় নিয়মিত আয় ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কতটা, সেই হিসাব কষেই অনেক তরুণকে পেশা বেছে নিতে হয়। পরিবারের পুরনো কাজ ধরে রাখার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক অনিশ্চয়তা তাঁদের অন্য পেশার দিকে টেনে নিতে পারে।
আবার সময়ের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি, নকশা এবং সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার শিল্পীদের সামনে নতুন সম্ভাবনাও খুলে দিয়েছে। নিজেদের কাজের পরিচিতি বাড়ানো, সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা এবং নতুন বাজারে পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হতে পারে এর মাধ্যমে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ এবং উপযুক্ত সহায়তা।
কুমোরটুলির মাটির জাদু আসলে শুধু প্রতিমা তৈরির কৌশলে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে মিশে আছে উত্তরাধিকার, পারিবারিক স্মৃতি, শিল্পবোধ, কঠোর পরিশ্রম এবং বেঁচে থাকার লড়াই। পুজোর দিনগুলিতে যখন আলোয় ঝলমল করে মণ্ডপ, ঢাকের তালে মেতে ওঠে শহর, তখন দেবীমূর্তির দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হন দর্শনার্থীরা। কিন্তু সেই মূর্তির পিছনে থাকা শিল্পীদের জীবন কতটা স্বচ্ছল, তাঁদের পরিশ্রমের মূল্য কতটা যথাযথ, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ কমই থাকে।
বিশ্বজোড়া পরিচিতি কুমোরটুলির গর্ব। কিন্তু সেই গর্বকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে শিল্পের পাশাপাশি শিল্পীদের জীবনকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, মাটির প্রতিমায় দেবীর মুখ ফুটিয়ে তোলেন যাঁরা, তাঁদের জীবনেও স্বস্তি, সম্মান ও নিরাপত্তার আলো পৌঁছনো জরুরি। কুমোরটুলির প্রকৃত সাফল্য শুধু বিদেশে প্রতিমা পাঠানোয় নয়, এই শিল্পের কারিগরদের আগামী প্রজন্মের কাছেও পেশাটিকে সম্মানজনক ও টেকসই করে তোলার মধ্যেই।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
