২৯শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
অ্যান্টিগায় অমর বীরগাথা কুম্বলের, চোয়াল ভাঙা সেই লড়াই ইতিহাসে

আন্টিগায় ভাঙা চোয়ালে কুম্বলের মহাকাব্যিক লড়াই। ছবি - Google

অ্যান্টিগায় অমর বীরগাথা কুম্বলের, চোয়াল ভাঙা সেই লড়াই ইতিহাসে

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

সৌরভের সেই সিদ্ধান্তেই রূপকথা কুম্বলের

আমার চোয়ালকে চেপে বেঁধে দাও। যেন ম্যাচে বল করতে পারি - ড্রেসিংরুমে জানালেন যন্ত্রণাকাতর কুম্বলে। লিপাস তাই করলেন। মাথার ওপর থেকে ব্যান্ডেজ ঘুরিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলেন ভেঙে যাওয়া চোয়াল। দেওয়া হল ব্যথা কমানোর ওষুধও।

মূল বিষয়

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় মাঝেমধ্যেই যে কোনও আড্ডায় এই গল্পটি করে থাকেন। সেইসময় ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রবল চাপে সৌরভ। পরপর দুটি সিরিজ হেরেছেন, তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে দারুণ সমালোচনা চলছে দেশে। বিশেষজ্ঞরা সৌরভকে দুষছেন দলের এমন অবস্থার জন্য। 

সেইসময় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজ চলছে। বেঙ্গালুরুতে ম্যাচ, খেলার শেষদিন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দল নির্বাচন চলছে। সৌরভের সঙ্গে কাচের ঘরে বসে রয়েছেন নির্বাচকদের মধ্যে দিলীপ বেঙ্গসরকার, সঞ্জয় জাগদালে, অশোক মালহোত্রারা। দূর থেকে সাংবাদিকরা দেখলেন একটি বিষয় নিয়ে সৌরভের সঙ্গে নির্বাচকদের খুবই তর্কাতর্কি হচ্ছে। মহারাজ হাত উঁচিয়ে কী নিয়ে যেন বোঝাচ্ছেন নির্বাচকদের।

কুম্বলের জন্য সওয়াল

পরে জানা গিয়েছিল, এক ক্রিকেটারকে দলে নেওয়ার জন্য জোর করছিলেন সৌরভ। এও বলেছিলেন, আপনারা অনিলকে (কুম্বলে) দলে নিন, কিছু যদি করতে না পারে তার দায় আমার। কিন্তু নির্বাচকরা তা শুনে  রীতিমতো মাথা ঝাকাচ্ছেন। তার মানে সৌরভের সঙ্গে তাঁরা ওই বিষয়ে একমত নয়।এক পর্যায়ে গিয়ে ক্ষুব্ধ সৌরভ বলে বসেন, তাহলে আমিই অধিনায়কত্ব থেকে সরে যাব। সেই শর্ত শুনেই নির্বাচকরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হয়েছিল।

সুযোগের সদ্ব্যবহার

শেষমেশ ওই ক্যারিবিয়ান সফরে কুম্বলে গিয়েছিলেন, তাঁর জন্যই ভারতীয় দল সিরিজ জিতে ফিরেছিল। সবাই ধন্য-ধন্য করেছিল সৌরভের অধিনায়কত্ব নিয়ে। আর কুম্বলেও বরাবরের জন্য সৌরভের প্রতি কৃতজ্ঞ থেকে যান।  

আরও পড়ুন
ব্রাজিল ম্যাচে ভরল না যুবভারতী!
মাত্র ১৭-তেই চিন-দক্ষিণ কোরিয়াকে ঘোল খাইয়ে ইতিহাসে কুমকুম!
ইতিহাসে ব্রিটিশদের দর্পচূর্ণ! টনি গ্রেগের মন্তব্যে জ্বলে ওঠে লয়েডের টিম

ওই সফরেই দেখা যায়, বাইশ গজে অমর বীরগাঁথা। দেশের জন্য বুক চিতিয়ে ভাঙা চোয়াল অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে ১৪ ওভার বল করলেন, মাঠে নিজেকে শুধু নিংড়ে দিলেন না, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা ব্যাটার কিংবদন্তি ব্রায়ান লারার উইকেট ছিটকে দিলেন জাম্বো (কুম্বলেকে এই নামে ডাকতেন সতীর্থরা)। অনিল কুম্বলের ওই দায়বদ্ধতা দেখে মুগ্ধ ভিভ রিচার্ডস বলেছিলেন, “আমি এইরকম সাহসী ও দৃঢ়চেতা ক্রিকেটার কোনওদিন দেখিনি।”

সেদিন ক্রিকেটের ইতিহাসে এক বিরল ক্যানভাস এঁকেছিলেন কুম্বলে। ভারতের সর্বকালের সেরা স্পিনার এক অসাধারণ মানুষ। বিশ্বের মাত্র দ্বিতীয় বোলার হিসাবে টেস্টের এক ইনিংসে ১০ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে কুম্বলের। ১৯৯৯ সালে দিল্লিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে ১০ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। স্পর্শ করেছিলেন জিম লেকারের নজির।

ভাঙা চোয়ালে লড়াই

২০০২ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টেস্ট সিরিজে ভারত- ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে। সিরিজ তখনও পর্যন্ত ১-১। অ্যান্টিগায় হচ্ছে শেষ টেস্ট ম্যাচ। যে ম্যাচের ফলের ওপর নির্ভর করে রয়েছে সিরিজের ভাগ্য। অজয় রাতরার আগে অনিল কুম্বলে ব্যাট করতে এসেছিলেন। হঠাৎ ক্যারিবিয়ান পেসার মার্ভ ডিলনের বাউন্সার চোয়ালে আছড়ে পড়লে মুখ থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করে। ফিজিও অ্যান্ড্রু লিপাস মাঠে ছুটে এলেন। চোয়ালে এক্স-রে করা হয়। যদিও রিপোর্টে কিছুই ধরা পড়েনি, কিন্তু অসহ্য যন্ত্রণা তখনও রয়েছে। কুম্বলে চেয়ে নিলেন পেইন কিলার ট্যাবলেট, সেটি খেয়ে আবারও ব্যাটিং করতে গেলেন। সেদিনটা কোনওক্রমে কাটলেও পরেরদিন ঘুম থেকে উঠে কুম্বলেকে আবারও ছুটতে হয় অ্যান্ড্রু লিপাসের কাছে। চোয়ালে যন্ত্রণা বেড়েছে তাঁর, ফের এক্সরে হল। দেখা গেল চোয়ালের হাড়ে চিড় ধরেছে শুধু নয়, এমনভাবেই ভেঙেছে যে, চোয়াল কার্যত ঝুলছে!

টিম ইন্ডিয়া বাধ্য হয়ে রক্ষণাত্মক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক হয় যতক্ষণ সম্ভব ব্যাট করা হবে। কুম্বলেকে দেশে ফেরানো হবে। যাতে দ্রুত তাঁর চোয়ালে অস্ত্রোপচার করা যায়। কিন্তু তিনি অনিল কুম্বলে। তিনি কী করে মাঠের বাইরে বসে থাকেন! দল সিরিজ জয়ের গন্ধ পাচ্ছেন আর তিনি লড়াকু যোদ্ধা হয়ে মাঠের বাইরে বসে থাকবেন? হয় নাকি? এরপরে যে আবদার করলেন সেটি শুনে লিপাসসহ বাকি ক্রিকেটাররা চমকে উঠলেন। ‘‘আমার চোয়ালকে চেপে বেঁধে দাও। যেন ম্যাচে বল করতে পারি।’’ ড্রেসিংরুমে জানালেন যন্ত্রণাকাতর কুম্বলে।

লিপাস তাই করলেন। মাথার ওপর থেকে ব্যান্ডেজ ঘুরিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলেন ভেঙে যাওয়া চোয়াল। দেওয়া হল ব্যথা কমানোর ওষুধও। সেই সঙ্গে সতর্কতা, কোনওমতেই উইকেটের আপিল করা যাবে না। চিৎকার করলেই বিপত্তি হতে পারে। অসহ্য হয়ে যেতে পারে যন্ত্রণা। কিন্তু কুম্বলে বারবার আবেদন করলেন, বোলিং করলেন ১৪ ওভার। তুলে নিয়েছিলেন লারার উইকেট। কুম্বলের সেদিনের সিদ্ধান্তে শুধু স্তম্ভিত হয়ে যায়নি সহযোদ্ধারা, কিংবদন্তি ভিভ রিচার্ডস বলেছিলেন তিনি কখনও এমন সাহসী দৃশ্য দেখেননি। ম্যাচ জিতল ভারত, আর কুম্বলের নাম ইতিহাসে স্থান পেয়ে গেল।

সেদিন সৌরভ নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলেন বলে কলার তুলে দেশে ফিরেছিলেন!

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
শুভ্র মুখোপাধ্যায়
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য