৮ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

কলকাতার বুকেই ছিল এক টুকরো চিন! ডাম্পলিংয়ের ধোঁয়া, লাল লণ্ঠনের আলো আর হারিয়ে যাওয়া এক পাড়ার গল্প

কলকাতার বুকেই ছিল এক টুকরো চিন! ডাম্পলিংয়ের ধোঁয়া, লাল লণ্ঠনের আলো আর হারিয়ে যাওয়া এক পাড়ার গল্প

কলকাতার ভেতরেই যে আক আস্ত দেশ। কলকাতার চিনা পাড়া। ছবি - Google

কলকাতার বুকেই ছিল এক টুকরো চিন! ডাম্পলিংয়ের ধোঁয়া, লাল লণ্ঠনের আলো আর হারিয়ে যাওয়া এক পাড়ার গল্প

ভোরের কলকাতা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। টেরিটি বাজারের সরু গলিতে ধীরে ধীরে জমতে শুরু করেছে ভিড়। বাঁশের স্টিমারের ঢাকনা খুলতেই বেরিয়ে আসছে গরম ধোঁয়া, তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ডাম্পলিং, বান আর স্যুপের মাদক গন্ধ। মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারে, এ যেন কলকাতা নয়—দক্ষিণ চিনের কোনও পুরনো শহরের সকাল।
আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানেন না, একসময় কলকাতার বুকেই ছিল একটি ছোট্ট চিন। শুধু একটি নয়, দুটি চায়নাটাউন নিয়ে গর্ব করত এই শহর। টেরিটি বাজার আর ট্যাংরা—দুটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অভিবাসন, সংগ্রাম, সাফল্য এবং হারিয়ে যাওয়ার এক আবেগঘন ইতিহাস।

আরও পড়ুন

ফোর্ট উইলিয়াম থেকে রাজভবন! কলকাতার মাটির নীচে কি সত্যিই লুকিয়ে আছে সাহেবদের গোপন সুড়ঙ্গ?
জলাজঙ্গল থেকে রাজধানী: তিলোত্তমার অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প
যে নদী গড়েছিল কলকাতাকে, সেই নদীরই ‘মৃত্যুঘণ্টা’ কি শুনছে মহানগর?


প্রায় আড়াইশো বছর আগে, অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে, কয়েকজন চীনা ব্যবসায়ী ও কারিগর এই শহরে এসে পা রাখেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম টং আ-চিউ। হুগলির কাছে আচিপুরে তিনি গড়ে তুলেছিলেন চিনিকল। সেই শুরু। তারপর ধীরে ধীরে হাক্কা, ক্যান্টনিজ-সহ বিভিন্ন চীনা সম্প্রদায়ের মানুষ কলকাতাকে নিজেদের দ্বিতীয় ঘর বানিয়ে ফেলেন।
টেরিটি বাজার তখন শুধু একটি পাড়া ছিল না, ছিল এক টুকরো সংস্কৃতি। সেখানে ছিল চীনা স্কুল, ক্লাব, মন্দির, দাঁতের ডাক্তার, কাঠের কারখানা, জুতোর ব্যবসা—একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। কলকাতার বহু মানুষ তখন প্রথম চিনকে চিনেছিলেন এই চীনাপাড়ার মানুষের হাত ধরেই।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক হাক্কা পরিবার চলে যান ট্যাংরায়। তখনকার জলাভূমি অঞ্চলকে নিজেদের পরিশ্রমে বদলে দেন তাঁরা। গড়ে ওঠে ট্যানারি শিল্প। আর সেই ট্যাংরার রান্নাঘরেই জন্ম নেয় এক নতুন খাদ্যসংস্কৃতি—যাকে আজ আমরা বলি ‘ইন্ডিয়ান চাইনিজ’। চিলি চিকেন, হাক্কা নুডলস, মাঞ্চুরিয়ান—আজ দেশের প্রতিটি শহরের পরিচিত খাবার। অথচ তাদের জন্মভূমি এই কলকাতাই।
কিন্তু ইতিহাস সব সময় সমান মধুর থাকে না। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ অনেক কিছু বদলে দেয়। সন্দেহ, অনিশ্চয়তা আর প্রশাসনিক নজরদারির আবহে বহু চীনা পরিবার কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়। কেউ চলে যান কানাডায়, কেউ অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ বা আমেরিকায়। যে পাড়াগুলি একসময় হাসি, উৎসব আর মানুষের ভিড়ে মুখর থাকত, সেগুলি ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করে।
পুরনো বাড়িগুলোর জানালা বন্ধ হয়ে যায়। চীনা স্কুলগুলোর ঘণ্টা থেমে যায়। বহু রেস্তোরাঁর আলো নিভে যায় চিরতরে। তবুও চায়নাটাউনের গল্প শেষ হয়ে যায়নি।


আজও চীনা নববর্ষ এলে টেরিটি বাজার আর ট্যাংরার রাস্তায় লাল লণ্ঠন দুলে ওঠে। ড্রাগন নাচের তালে তালে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়ে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু পরিবার এখনও ধরে রেখেছেন তাঁদের শিকড়, তাঁদের ঐতিহ্য।
তাই চায়নাটাউন শুধু একটি পাড়া নয়, কলকাতার স্মৃতির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এক আবেগ। এমন এক ইতিহাস, যা মনে করিয়ে দেয়, এই শহর শুধু বাঙালির নয়, বহু সংস্কৃতি, বহু ভাষা, বহু স্বপ্নের মিলনভূমি।
আজ টেরিটি বাজারের গলিতে দাঁড়ালে হয়তো আর আগের সেই কোলাহল শোনা যায় না। কিন্তু ভোরের বাতাসে ভেসে আসা ডাম্পলিংয়ের গন্ধ যেন এখনও ফিসফিস করে বলে—কলকাতার বুকেই একদিন ছিল এক টুকরো চিন, যে আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি!

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য