৮ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

শান্তনুর পর সুজিত, ফের চর্চায় ‘গ্রেড ওয়ান’ বন্দি! জেলের গরাদের আড়ালেও কেন আলাদা মর্যাদা?

শান্তনুর পর সুজিত, ফের চর্চায় ‘গ্রেড ওয়ান’ বন্দি! জেলের গরাদের আড়ালেও কেন আলাদা মর্যাদা?

কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস ও প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু। ছবি - Google

শান্তনুর পর সুজিত, ফের চর্চায় ‘গ্রেড ওয়ান’ বন্দি! জেলের গরাদের আড়ালেও কেন আলাদা মর্যাদা?

জেলের ভিতরে কি সকল বন্দিই সমান? আইনের চোখে হয়তো উত্তর ‘হ্যাঁ’। কিন্তু সংশোধনাগারের বাস্তব ছবি বলছে, সব বন্দির থাকার পরিবেশ বা সুযোগ-সুবিধা এক নয়। সম্প্রতি পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুকে ‘গ্রেড ওয়ান’ বা প্রথম শ্রেণির বন্দির মর্যাদা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিচারভবনের বিশেষ আদালত। তার আগে দুর্নীতি ও জমি দখলের মামলায় গ্রেফতার কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসও একই মর্যাদা পেয়েছিলেন। পরপর দুই হাই-প্রোফাইল বন্দিকে এই বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘটনায় ফের আলোচনায় উঠে এসেছে কারা ব্যবস্থার বহুচর্চিত ‘গ্রেড ওয়ান’ শ্রেণিবিভাগ।

প্রশ্ন উঠছে, কী এই গ্রেড ওয়ান বন্দি? কেনই বা কেউ এই মর্যাদা পান? আর সাধারণ বন্দিদের তুলনায় কতটা আলাদা তাঁদের জীবনযাপন?

কারা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি নতুন নয়। এর শিকড় ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বহু শিক্ষিত, পেশাজীবী এবং সমাজের উচ্চস্তরের ব্যক্তিকে কারাবন্দি করা হয়েছিল। তাঁদের জন্য আলাদা বন্দোবস্তের ধারণা তখন থেকেই চালু হয়। স্বাধীনতার পর সেই ব্যবস্থার অনেক পরিবর্তন হলেও বিভিন্ন রাজ্যের কারা বিধিতে এখনও বিশেষ শ্রেণির বন্দির ধারণা বহাল রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের কারা বিধি অনুযায়ী, কোনও বন্দির সামাজিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত পরিচিতি, জনজীবনে অবদান এবং নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি বিচার করেই তাঁকে প্রথম শ্রেণির বন্দি বা ‘গ্রেড ওয়ান’ মর্যাদা দেওয়া হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত সাধারণত আদালতের অনুমোদন এবং কারা কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে কার্যকর হয়।

তবে একটা বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া জরুরি। গ্রেড ওয়ান মর্যাদা মানেই ‘ভিআইপি বন্দি’ নয়। এই মর্যাদা কোনও পুরস্কারও নয়। বরং সংশ্লিষ্ট বন্দির সামাজিক ও পেশাগত অবস্থান, নিরাপত্তা এবং কিছু বিশেষ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই এই শ্রেণিবিভাগ করা হয়।

তাহলে কী কী সুবিধা মেলে?

কারা সূত্রে জানা যায়, প্রথম শ্রেণির বন্দিদের সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা বাধ্যতামূলক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের জন্য পৃথক বা অপেক্ষাকৃত কম ভিড়ের সেলের ব্যবস্থা করা হয়। জেলের সাধারণ কম্বল বা পোশাকের পরিবর্তে নিজের পোশাক ব্যবহারের অনুমতি মিলতে পারে। বই, সংবাদপত্র, খাতা, কলম বা লেখাপড়ার অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে উন্নত মানের বিছানা, টেবিল-চেয়ার এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের কিছু অতিরিক্ত সামগ্রী রাখার সুযোগও দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নিজের খরচে কিছু খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহের অনুমতিও পেতে পারেন তাঁরা। যদিও এই সমস্ত সুবিধাই সংশোধনাগারের নিয়ম এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতির উপর নির্ভরশীল।

প্রাক্তন আইপিএস অফিসার শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আদালত বিশেষভাবে তাঁর নিরাপত্তার প্রশ্নটি বিবেচনা করেছিল। একজন প্রাক্তন পুলিশকর্তা হিসেবে সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে রাখলে তাঁর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁকে গ্রেড ওয়ান মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল বলে আদালত সূত্রে জানা যায়।

অন্যদিকে, সুজিত বসুর ক্ষেত্রে আদালত তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সামাজিক অবস্থান এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে। যদিও তদন্তকারী সংস্থা ইডি আদালতে তাঁর এই আবেদনের বিরোধিতা করেছিল। তবুও আদালত শেষ পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির বন্দির মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে সায় দেয়।

তবে এই মর্যাদা নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সমালোচকদের প্রশ্ন, জেলের ভিতরে যদি সামাজিক অবস্থান বা পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে সমতার নীতি কোথায় দাঁড়ায়? একজন শিক্ষক, অধ্যাপক, আইএএস, আইপিএস বা প্রাক্তন মন্ত্রীর জন্য যদি আলাদা বন্দোবস্ত থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য তা থাকবে না কেন?

অন্যদিকে কারা প্রশাসনের একাংশের যুক্তি, বিষয়টি সুবিধা দেওয়ার চেয়ে নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের সঙ্গে বেশি জড়িত। প্রাক্তন বিচারপতি, আমলা, পুলিশকর্তা কিংবা জনজীবনের পরিচিত ব্যক্তিদের অনেক সময় সাধারণ ওয়ার্ডে রাখলে আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই এই বিশেষ শ্রেণিবিভাগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, গ্রেড ওয়ান মর্যাদা কোনওভাবেই আইনি সুবিধা নয়। এই মর্যাদা পেলে জামিন পাওয়া সহজ হয় না, সাজা কমে না, বিচারপ্রক্রিয়াতেও কোনও বাড়তি সুবিধা মেলে না। আদালতের কাছে তিনি অন্য বন্দিদের মতোই একজন অভিযুক্ত বা বিচারাধীন ব্যক্তি। পার্থক্য শুধু সংশোধনাগারের ভিতরে তাঁর বসবাসের পরিবেশে।

সুজিত বসু ও শান্তনু সিনহা বিশ্বাসকে গ্রেড ওয়ান মর্যাদা দেওয়ার পর সেই পুরনো প্রশ্নটাই আবার সামনে এসেছে— জেলের গরাদের আড়ালে কি সকল বন্দি সত্যিই সমান? নাকি আইনের সমতার পাশাপাশি বাস্তবের সংশোধনাগারে এখনও টিকে রয়েছে এক অদৃশ্য শ্রেণিবিভাগ? সেই বিতর্কই এখন নতুন করে উসকে দিয়েছে দুই আলোচিত বন্দির ‘গ্রেড ওয়ান’ মর্যাদা।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য