কলকাতয় কি ভূমিকম্প প্রবণতা বাড়ছে? সিসমোগ্রাফের প্রতীকী ছবি- দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
৮ই জুন, ২০২৬
কলকাতা: রবিবার (৮ জুন) গভীর রাতে আচমকাই দুলে উঠল শহর কলকাতা। রাত ১১টা ৬ মিনিট নাগাদ কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে ওঠে মাটি। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৭। ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল ভুটান। শুধু কলকাতা নয়, শিলিগুড়ি, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার-সহ উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও কম্পন অনুভূত হয়। অনেকের মোবাইলে আগাম গুগল এলার্ট পৌঁছনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই দুলে ওঠে ঘরবাড়ি। প্রবল বৃষ্টির রাতে আচমকা এই কম্পনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। যদিও এখনও পর্যন্ত বড় কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি।
এক ঝটকায় দুলে ওঠে ফ্যান, কেঁপে ওঠে জানলার কাঁচ। কেউ চিৎকার করে ওঠেন—'ভূমিকম্প!' তারপর আবার সব শান্ত। গত কয়েক মাসে একাধিকবার কেঁপে উঠেছে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের কম্পনই মনে প্রশ্ন তোলে—এই শহর কি সত্যিই নিরাপদ, নাকি নিশ্চিন্ততার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বিপদের ইঙ্গিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা সরাসরি ভয়ঙ্কর ফল্ট লাইনের উপর না থাকলেও পূর্বভারতের ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলগুলির কাছাকাছি অবস্থানের জেরেই এই ঘনঘন কম্পন। তাছাড়া ভূ-প্রাকৃতিক গঠন, আশপাশের সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল এবং ভূগর্ভস্থ কাঠামোর কারণে শহরটি 'মাঝারি ঝুঁকির' এলাকাতেই পড়ে। অর্থাৎ বিপদ খুব কাছে না থাকলেও, একেবারে দূরেও নয়।
অবসরপ্রাপ্ত ভূবিজ্ঞানী অমিতাভ মল্লিকের মতে, উত্তরবঙ্গের হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চল অত্যন্ত সক্রিয়। সেখানে বড়সড় ভূমিকম্প হলে তার অভিঘাত দক্ষিণবঙ্গেও এসে পৌঁছায়। তাঁর কথায়, "কলকাতায় হয়তো ভয়াবহ মাত্রার ভূমিকম্প না-ও হতে পারে, কিন্তু উত্তরে বড় কম্পন হলে শহর নড়বেই।"
আইআইটি খড়গপুরের সমীক্ষা অনুযায়ী, কলকাতা সিসমিক জোন ৩ ও ৪-এর মাঝামাঝি অবস্থানে। এই শ্রেণিবিন্যাসই বলে দেয়—ঝুঁকি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শহরের এক পরিকল্পনাবিদের কথায়, "কলকাতা গ্রেড ৩-এর ভূমিকম্পপ্রবণ শহর—এখানে সতর্কতা অপরিহার্য।"
কলকাতা রয়েছে ইন্ডিয়ান প্লেটের উপর, যা প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার করে টিবেটান প্লেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ধাক্কাই ভূমিকম্পের মূল কারণ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহরের নরম পলিমাটি—হুগলি নদীবাহিত কাদা ও বালির স্তর। ছোট কম্পনে এই মাটি ধাক্কা শোষণ করলেও, বড় কম্পনে সেটাই বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, কলকাতার ভূগর্ভে একটি দীর্ঘ ফাটল রয়েছে, যা পূর্বদিকে মায়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ফাটল বরাবর কম্পনের তরঙ্গ ছড়ালে তার প্রভাব অনেক বেশি তীব্র হতে পারে। ফলে দূরের ভূমিকম্পও এখানে বাড়তি ধাক্কা নিয়ে পৌঁছতে পারে।
গত কয়েক বছরে একাধিকবার কলকাতা কেঁপে উঠেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৫.৫ মাত্রার কম্পন শহরবাসীকে চমকে দেয়। তার আগেও ২০২৫ জুড়ে অসম, বঙ্গোপসাগর বা বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় উৎপন্ন ভূমিকম্পের রেশ এসে পৌঁছেছে কলকাতায়। বড় ক্ষতি না হলেও, আতঙ্কের রেশ বারবার ফিরে এসেছে।
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: দুপুর ১টা ২২ মিনিট নাগাদ আচমকাই জোরাল কম্পনে কেঁপে ওঠে কলকাতা। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৫। শুধু শহর নয়, আশপাশের জেলাগুলিতেও এই কম্পন অনুভূত হয়। অনেকেই আতঙ্কে বাড়ি-অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: ভোরের দিকে মৃদু কম্পন টের পান শহরবাসী। ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল খুলনা সংলগ্ন এলাকা বা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। এই কম্পন অনুভূত হয় সিকিম-সহ উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায়। তবে কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি।
২১ নভেম্বর, ২০২৫: সকাল ১০টা ৮ মিনিট নাগাদ তীব্র কম্পনে কেঁপে ওঠে শহর। উত্তর থেকে দক্ষিণ—সর্বত্রই অনুভূত হয় এই কম্পন। সল্টলেক-এর অফিসপাড়ায় কর্মীরা আতঙ্কে দ্রুত নীচে নেমে আসেন। বহু বহুতল থেকে বাসিন্দারাও রাস্তায় নামেন।
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫: বিকেল ৪টে ৪১ মিনিটে ভূমিকম্প হয় অসম-এ। উৎসস্থল ছিল গুয়াহাটি ও তেজপুর-এর মাঝামাঝি ওদালগুরি এলাকা। এর প্রভাব পড়ে কলকাতাতেও, যদিও কম্পন ছিল মৃদু।
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫: সকাল ৬টা ১০ মিনিট নাগাদ ভূমিকম্পের উৎস ছিল বঙ্গোপসাগর, প্রায় ৯১ কিলোমিটার গভীরে। কলকাতা-সহ উপকূলীয় দক্ষিণবঙ্গের একাংশ কেঁপে ওঠে।
৭ জানুয়ারি, ২০২৫: সকাল ৬টা ৪০ মিনিট নাগাদ প্রায় এক মিনিট ধরে কম্পন অনুভূত হয়। দিনের শুরুতেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। বহু মানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
ইতিহাসও সতর্ক করছে। ১৯৩৪ সালের বিহার-নেপাল ভূমিকম্পে কলকাতার বহু পুরনো ভবনে ফাটল ধরেছিল। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের সময়ও শহর কেঁপে ওঠে। অর্থাৎ বড় বিপর্যয় না হলেও, কলকাতা বারবার ভূমিকম্পের অভিঘাত অনুভব করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতার সবচেয়ে বড় বিপদ ভূমিকম্প নয়, বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বহু পুরনো বাড়ি, নিয়ম না মেনে তৈরি বহুতল এবং দুর্বল কাঠামো—এই সবই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। ভূমিকম্পের সময় এই সব ভবনই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যদিও নতুন নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তার উপর সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব—ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, সেই প্রাথমিক জ্ঞানও অনেকের নেই।
বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বার্তা—ভূমিকম্প ঠেকানো যায় না, কিন্তু ক্ষতি কমানো সম্ভব। তার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর বিল্ডিং নিয়ম এবং জনসচেতনতা। কলকাতা আপাত শান্ত হলেও, সেই শান্তির নীচে লুকিয়ে রয়েছে সম্ভাব্য কম্পনের ছায়া। তাই ভয় নয়—প্রস্তুত থাকাই এখন সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।