বারবার অমোঘ টানে ছুটেছেন এভারেস্টের দিকে। জর্জ ম্যালোরি। ছবি - Wikipedia, গ্রাফিক্স - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
১০ই জুন, ২০২৬
পর্বতারোহণের ইতিহাসে এর চেয়ে বিখ্যাত উত্তর খুব প্রায় নেই। কেন তিনি এভারেস্টে উঠতে চান? - এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে জর্জ ম্যালোরির এই সংক্ষিপ্ত বাক্য আজ প্রায় কিংবদন্তি। এক শতাব্দী ধরে মানুষ এই বাক্যের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে দুঃসাহস, অদম্য কৌতূহল এবং মানবসীমা অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু ম্যালোরির গল্প কেবল একটি পাহাড় জয়ের গল্প নয়। আসলে এই গল্প এমন এক মানুষের - যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির একটি ছবি রেখে আসতে চেয়েছিলেন। যেখানে বরফের তলায় চাপা পড়ে থাকে একটি সাম্রাজ্য ও যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রজন্মের নীরব উপাখ্যান।

হার্বার্ট লি ম্যালোরির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলেন তাঁর স্ত্রী রুথ টার্নার ম্যালোরি। ম্যালোরির লেখা চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যায়, তাঁর জীবনের সমস্ত অভিযানের কেন্দ্রে ছিলেন রুথ। যখন তিনি মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে কাটিয়েছেন, যখন বিপজ্জনক পাহাড়ি পথে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন, তখনও চিঠির পাতায় বারবার ফিরে এসেছে রুথের নাম। স্ত্রীর বাধা উপেক্ষা করে ১৯২৪ সালের শেষ অভিযানে বেরোনোর আগে তিনি রুথ’কে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যদি তিনি এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছতে পারেন, তবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে তিনি রেখে আসবেন তাঁর প্রিয়তমার একটি ছবি। কোনও পতাকা নয়, কোনও সাম্রাজ্যের প্রতীক নয় - একটি ভালোবাসার স্মারক!
বিশ শতকের শুরুর পৃথিবী ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পৃথিবী। বিশ্বের নানা প্রান্তে ব্রিটিশ পতাকা উড়ছে, আর সেই সাম্রাজ্য নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রতীক খুঁজে বেড়াচ্ছে। তখনই বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট তাদের কল্পনায় হয়ে ওঠে এক নতুন লক্ষ্য - নতুন স্পর্ধা। স্বাভাবিকভাবেই এভারেস্টে প্রথম পা রাখার স্বপ্ন শুধু কয়েকজন পর্বতারোহীর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ছিল না; এর মধ্যে লুকিয়ে ছিলো সাম্রাজ্যবাদী গর্বের এক রাজনৈতিক বার্তা। ব্রিটিশ শাসক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে এই শিখর জয় ছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতেও ব্রিটিশ আধিপত্যের পতাকা গেঁথে দেওয়ার এক প্রতীকী প্রচেষ্টা। পর্বত তখন আর কেবল একটি শৃঙ্গ নয় - একটি সাম্রাজ্যের আত্মপ্রতিকৃতি। আর এই বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বপ্নেরই অংশ হয়ে উঠেছিলেন জর্জ ম্যালোরি।
জর্জ ম্যালোরিকে শুধুমাত্র একজন দুঃসাহসী অভিযাত্রী হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ আড়ালে থেকে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ম্যালোরি পশ্চিম ফ্রন্টে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার তরুণের মৃত্যু, কাদা ও রক্তে ভরা ট্রেঞ্চ, জীবনের অনিশ্চয়তা- এই সমস্তকিছু ম্যালোরির চোখের সামনে ঘটেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তাঁর প্রজন্মকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। তাই যুদ্ধ শেষ হলেও সেই স্মৃতি আত্মায় মিশে যায়। স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধোত্তর সময়ে ম্যালোরির মতো বহু মানুষের মধ্যে জীবনের অর্থ খোঁজার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। যুদ্ধ তাদের যে বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিল; দুর্ভেদ্য পর্বত শৃঙ্গ হয়তো তাদের সামনে তুলে ধরেছিলো জীবনের নতুন এক অর্থ, এক মুক্তির প্রতিশ্রুতি। এভারেস্টের পথে ম্যালোরির যাত্রা তাই কেবল উচ্চতা জয়ের অভিযান নয়; হয়তো তা নিজের ভেতরের অন্ধকারকে অতিক্রম করার এক অদম্য চেষ্টা।

ম্যালোরির এভারেস্ট যাত্রা শুরু হয় ১৯২১ সালে। তখনও এভারেস্টে ওঠার পথ আবিষ্কৃত হয়নি। গোটা পৃথিবীর কাছে এ যেন এক দুর্ভেদ্য এবং প্রায় অসম্ভব এক লক্ষ্য। সেইসময় নেপাল বিদেশিদের জন্য বন্ধ থাকায় ব্রিটিশ দল তিব্বতের দিক থেকে পাহাড়টিকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। ম্যালোরির নেতৃত্বে এই অভিযান হিমবাহ, গিরিপথ পেরিয়ে সম্ভাব্য আরোহনপথ খুঁজে বের করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তাঁরই পর্যবেক্ষণে উত্তর-পূর্ব রিজের রাস্তা ভবিষ্যৎ অভিযানের জন্য চিহ্নিত হয়। এভারেস্ট তাঁর আত্মায় প্রবেশ করে, যা সারাজীবন তাঁর পিছু ছাড়েনি।
এক বছর পরে শুরু হয় প্রথম প্রকৃত শিখর জয়ের প্রচেষ্টা। ১৯২২ সালের অভিযানে ম্যালোরি ও তাঁর সহযাত্রীরা প্রথম মানুষ হিসেবে ৮,০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় পৌঁছে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। আজকের দিনে এই উচ্চতা হয়তো পরিসংখ্যান মাত্র। কিন্তু তখন এটি ছিল মানব জীবনের সীমা সম্পর্কে সমস্ত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানো এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কিন্তু এভারেস্ট খুব দ্রুত তার মূল্য দাবি করে। ৭ই জুন এক ভয়াবহ তুষারধসে সাতজন শেরপা প্রাণ হারান। এভারেস্টের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম এত বড় প্রাণহানির ঘটনা। এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ম্যালোরিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই দুর্ঘটনার অপরাধবোধ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল। এভারেস্ট তখন তাঁর কাছে শুধু উচ্চতার চ্যালেঞ্জ নয়; হয়ে ওঠে মানুষের সীমাবদ্ধতা ও মৃত্যুর এক নির্মম সাক্ষ্য।
এভারেস্টের ইতিহাসে আমরা ম্যালোরির নাম জানি, আইরভিন ও ওডেলের নামও জানি। কিন্তু সেইসব তিব্বতি ও শেরপা বাহকদের নাম জানিনা, যারা বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে সরঞ্জাম বহন করেছিলেন আর চিনে নিতে সাহায্য করেছিলেন দুর্ভেদ্য পথ। তাঁদের শ্রম, সাহস এবং আত্মত্যাগ ছাড়া কোনও অভিযানই সম্ভব ছিল না। ক্ষমতার ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম প্রায় অনুপস্থিত। ঔপনিবেশিক যুগের লেখালেখিতে এই স্থানীয় মানুষদের কেবল ‘বাহক’ কিংবা ‘সহকারী’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা অথবা অবদানের সঠিক মূল্যায়ন কখনোই হয়নি। ফলে এভারেস্ট জয়ের যে কিংবদন্তি রচিত হয়েছে, তার কেন্দ্রে ইউরোপীয় নায়কেরা থাকলেও প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে সেই মানুষদের, যাঁদের কাঁধে ভর করেই অভিযানের স্বপ্ন বাস্তবের ভূমি স্পর্শ করেছিলো।
তৃতীয়বারের মতো যখন তিনি এভারেস্টে ফিরলেন, তখন তাঁর বয়স ৩৭। তিনি আর কেবল তরুণ অভিযাত্রী নন, তিনি সাত শেরপার মৃত্যুর স্মৃতি বহন করে চলা একজন নেতা। একজন পিতা, একজন স্বামী, যাঁর বাড়িতে অপেক্ষা করছেন তাঁর প্রিয়তমা রুথ এবং সন্তানেরা। ম্যালোরি তখন এমন একজন মানুষ, যিনি জানতেন - এটাই হয়তো তাঁর শেষ সুযোগ। তাঁর স্ত্রী ও বন্ধুরা তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু ম্যালোরি জানতেন, জীবনের কিছু আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা করা যায় না। তখন তিনি আরোও দৃঢ় ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একজন মানুষ, যিনি তাঁর জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছেন। দুচোখে তাঁর অসম্ভব কে সম্ভব করার স্বপ্ন।
৮ জুন, ১৯২৪। ম্যালোরি এবং তরুণ প্রকৌশলী অ্যান্ড্রু আরভিন ক্রমশ শিখরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। দূর থেকে তাঁদের শেষবার দেখতে পান ক্যামেরাসহযাত্রী নোয়েল ওডেল। শিখরের খুব কাছে তাঁরা। ম্যালোরির পকেটে তখনও সেই ছোট্ট ছবি, যা তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে রেখে আসতে চেয়েছিলেন। হঠাৎ-ই কালো মেঘ নেমে আসে; এবং এর পর কখনও তাঁদের আর দেখা যায়নি।
১৯৯৯ সালে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। জ্যাকেটের পকেটে পাওয়া যায় গগলস। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে রুথের সেই ছবিটি অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতিই রহস্যকে করে তোলে গভীর, জন্ম দেয় একাধিক প্রশ্নের। যদি ছবিটি তাঁর সঙ্গে না থাকে, তবে কি তিনি সেটি কোথাও রেখে এসেছিলেন? আর যদি রেখে থাকেন, তবে কি তা শিখরেই? তাহলে কি সত্যিই তিনি ছুঁয়ে ফেলেছিলেন শৃঙ্গ - কেউ জানে না ! শুধু বরফের আশেপাশে হিম হওয়ায় ঘোরাফেরা করে বিশ্ব রাজনীতির নানান কূটনৈতিক সমীকরণ।
ম্যালোরির এভারেস্ট অভিযানের এই ইতিহাসকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বপ্নের ইতিহাস বললে হয়তো ভুল হবে। লর্ড কার্জন এবং ফ্রান্সিস ইয়ংহাজব্যান্ডের মতো সাম্রাজ্যবাদী ব্যক্তিত্বরা এভারেস্টকে ব্রিটিশ গৌরবের এক নতুন সীমান্ত হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। এই কারণেই ম্যালোরির অভিযান ছিল একই সঙ্গে ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক। একদিকে তিনি ছিলেন রুথের প্রেমিক; অন্যদিকে একটি সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি। স্বাভাবিকভাবেই এই দ্বৈততা তাঁর গল্পকে করে তোলে আরও জটিল।
আজও এভারেস্টের চূড়ায় ঝড় ওঠে, তুষারপাত ঘটে, সূর্যের ছটা ঠিকরে পড়ে। হয়তো কোথাও, কোনও বরফস্তরের নিচে, এখনও ঘুমিয়ে আছে একটি ছোট্ট ছবি। হয়তো’বা নেই। কিন্তু কিংবদন্তির সৌন্দর্য এই যে, তার সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়না। জর্জ ম্যালোরি হয়তো পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখর জয় করেছিলেন, কিংবা হয়তো করেননি। কিন্তু তিনি যে একটি অসমাপ্ত প্রেমপত্র লিখে গিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়তমা রুথের উদ্দেশ্যে, আকাশের উদ্দেশ্যে এবং মানুষের অদম্য স্বপ্নের উদ্দেশ্যে - সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আর হয়তো সেই কারণেই, একশো বছর পরেও, ম্যালোরির গল্প আমাদের কাছে শুধু একটি পর্বতারোহণের ইতিহাস নয়; এটি প্রেম ও মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার গল্প !
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
জন্ম মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে। সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা। সময় কাটে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। বর্তমানে লেখালিখি, ডিজিটাল কন্টেন্ট এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কর্মব্যস্ত।