১৩ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

যন্ত্রে গলদ: জলবায়ু গবেষণা দিচ্ছে ভুল তথ্য

যন্ত্রে গলদ: জলবায়ু গবেষণা দিচ্ছে ভুল তথ্য

ভারতের জলবায়ু। প্রতীকী ছবি -দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

যন্ত্রে গলদ: জলবায়ু গবেষণা দিচ্ছে ভুল তথ্য

জলবায়ু তথ্য সংগ্রহ নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশ্নের মুখে পড়েছে ভারত।

ভুল যন্ত্রের ফাঁদ

গবেষণাগারে একের পর এক জটিল বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বসানো। বাইরে থেকে দেখতে সেগুলো বেশ ঝকঝকে, গায়ে নামী বিদেশি কোম্পানির সিলমোহর। কিন্তু তলার গল্পটা একেবারেই আলাদা। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ক্যালিব্রেশন বা সঠিক মাপকাঠি ছাড়াই ব্যবহার করা হচ্ছে এই আমদানি করা যন্ত্রগুলো। ফলাফল? একের পর এক ভুল তথ্য তৈরি হচ্ছে ভারতের জলবায়ু গবেষণায়। আর সেই ভুল তথ্যই বুক ফুলিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে দেশ-বিদেশের প্রথম সারির বিজ্ঞান জার্নালগুলোতে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টার (PSA) দপ্তরে জমা পড়া 'মেগা সায়েন্স ভিশন-২০৩৫' (MSV-2035) রিপোর্টে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের এই চরম আশঙ্কার কথাই উঠে এসেছে। ভারত যে ধীরে ধীরে নিজস্ব বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তৈরির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, এই রিপোর্ট তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

বিদেশের মডেলে ভারতের আবহাওয়া!

আমাদের দেশে জলবায়ু গবেষকের সংখ্যা ৩,০০০-এরও বেশি। কিন্তু ট্র্যাজেডি হল, তাঁদের বেশিরভাগ গবেষণাই ভারতের মাটির আসল পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে যাচাই করা হয়নি। ভারতের দীর্ঘমেয়াদী আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য যে 'আর্থ সিস্টেম মডেল' ব্যবহার করা হয়, তা আসলে আমেরিকা ও ইউরোপের জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে তৈরি! ফলে, আমাদের ভৌগোলিক ও বায়ুমণ্ডলীয় বৈচিত্র্যকে এই মডেলগুলো সঠিকভাবে ধরতেই পারে না। সেজন্যই রিপোর্টে এবার জোর দিয়ে বলা হয়েছে— ধার করা মডেলে আর নয়, ভারতের নিজস্ব ভৌগোলিক পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে এক নতুন দেশীয় মডেল তৈরি করা দরকার।

স্বনির্ভরতার গল্পে চোরা বালি

এই চরম দুরবস্থা এমন এক সময়ে সামনে এল যখন দেশজুড়ে 'আত্মনির্ভর ভারত'-এর ডাক দেওয়া হচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ল্যাবরেটরিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে 'GeM' পোর্টাল থেকে সবচেয়ে কম দামের ভারতীয় বিক্রেতার কাছ থেকে যন্ত্র কিনতে হতো। কিন্তু দেখা গেল, কম দামে জিনিস দিতে গিয়ে সেই দেশীয় বিক্রেতারা আন্তর্জাতিক মানের বা হাই-কোয়ালিটি কাস্টমাইজড যন্ত্র তৈরিই করতে পারছে না। নিম্নমানের যন্ত্রের অভিযোগে ল্যাবগুলোর কাজ লাটে ওঠার জোগাড় হওয়ায়, শেষমেশ ২০২৫ সালের জুনে সরকার কিছু সংস্থাকে এই পোর্টালের বাইরে গিয়ে বড় অঙ্কের কেনাকাটার ছাড় দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে, দেশের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা তলানিতে এসে ঠেকেছে।

রূপান্তরের আটটি রোডম্যাপ

এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বেরোনোর জন্য রিপোর্টে আটটি বড় প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে, যা আগামী তিনটি পাঁচ-বছরের মেয়াদে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারির অন্ধকূপগুলো দূর করতে ওয়েদার স্টেশন ও গ্রিনহাউস গ্যাস মনিটরিং ব্যবস্থার পরিবর্ধন।
  • বিদেশি নির্ভরতা কমাতে দেশীয় স্তরেই উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ও ক্যালিব্রেশন প্রযুক্তির বিকাশ।
  • হিমবাহের পরিবর্তন ও মেঘের গতিপ্রকৃতি ট্র্যাক করতে মহাকাশে বিশেষ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ।
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিংয়ের সাহায্যে ভারতের নিজস্ব আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল তৈরি।
  • শহরের তাপপ্রবাহ ও অ্যারোসল ডায়নামিক্স নিয়ে নিবিড় ফিল্ড রিসার্চ এবং পরিবেশের সাথে জনস্বাস্থ্যের ডেটা লিঙ্ক করার জন্য জাতীয় পর্যবেক্ষণাগার স্থাপন।
  • ষষ্ঠ প্রকল্পটি ভারতের বিদেশি আর্থ সিস্টেম মডেলের (Earth System Models) ওপর নির্ভরশীলতা এবং দেশীয় ডেটাসেটের দিকে সরে আসার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।
  • সপ্তম প্রকল্প কার্বন ক্যাপচার (কার্বন নির্গমন রোধ ও ধরে রাখা) এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি একীকরণের ওপর গবেষণাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত, যা ২০৭০ সালের মধ্যে ভারতের 'নেট-জিরো' (কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রযুক্তিগত পথ তৈরি করবে।
  • সর্বশেষে, অষ্টম প্রকল্পটি অভিযোজন বিজ্ঞানের (adaptation science) প্রতি উৎসর্গীকৃত, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপের জন্য অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করবে এবং একই সাথে পরিবেশগত তথ্যের সাথে জনস্বাস্থ্যের ফলাফলের সংযোগকারী জাতীয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (national observatories) স্থাপন করবে।

এই বিশাল যজ্ঞের জন্য খরচ ধরা হয়েছে কম করে ৭৯৫ কোটি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১,৩৫৯ কোটি টাকা। অন্যান্য জাতীয় বিজ্ঞান মিশনের তুলনায় এই বাজেট খুবই সামান্য। তবে মনে রাখতে হবে, প্রফেশনাল অজয় কে সূদের নির্দেশনায় তৈরি এই গাইডলাইনটি কিন্তু সরকারের কোনও নীতি বা আর্থিক প্রতিশ্রুতি নয়। এটি আসলে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের নিজেদের তৈরি এক আত্মদর্শনের রোডম্যাপ। ভুল শুধরে বিজ্ঞানের দুনিয়ায় ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার লড়াই এখন বিজ্ঞানীদের নিজেদের কাঁধেই।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য