

বাঙালির শিব। ছবি - Google.
৫ই আগস্ট, ২০২৬
ঢোল বাজে কাড়া বাজে
বিহা করতে শিব চল্যাছে
দেব সেনা দৈত্য সেনা
তার সাথে মিল্যাছে।।
এই হল বাংলার আদি-অকৃত্রিম গাজন, বাঙালির গাজন।
চৈত্র সংক্রান্তিতে আজও গ্রাম বাংলায় ধুমধাম করে চড়কের মেলা বসে। জেন জি-দের সুবিধার জন্য আরও সহজ করে বললে- বাংলা ক্যালেন্ডারের শেষ মাস চৈত্র মাস। সেই চৈত্রের শেষ দিন, অর্থাৎ সংক্রান্তিতে হয় চড়ক। মানে পয়লা বৈশাখের আগের দিন। আর এই চড়কের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে গাজন, গাজনের গান। অবশ্য নীল ষষ্ঠী, ১৭ শ্রাবণের মতো শিব-কেন্দ্রিক অন্যান্য ধর্মীয় তিথিগুলির আগেও গ্রাম বাংলার কিছু কিছু জায়গায় গাজন হতে দেখা যায়।
ঢোল বাজে কাড়া বাজে
বিহা করতে শিব চল্যাছে….
শুরু এই বিখ্যাত গাজনের গানে শিবের বিয়ে করতে যাওয়ার বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।
শিবের পাশে বসে শিবানী বলে
সংসার চালানো যে দায়
ভিক্ষা করে কয় দিন চলে
সোনার জাদুরা কি খায়।
এটা আরও একটি পরিচিত গাজনের গান। শুনলে মনে হবে, যেন এক দরিদ্র পরিবারে স্বামী-স্ত্রী টানাটুনির সংসার চালানো নিয়ে কথা বলছেন! এটাই বাঙালির কাছে শিব-পার্বতীর মহিমা। বঙ্গ-ভূমে তাঁরা দূরের পরমেশ্বর নন, বরং কাছের প্রিয়জন, অতি ভালোবাসার ঘরের মানুষ। বাঙালি মনন বা সমাজ ব্যবস্থায় শিব-পার্বতীর এই ছবি গড়ে উঠেছে মঙ্গলকাব্যগুলির হাত ধরে। তাই এখানে ভোলা মহেশ্বর কোথাও ধর্মরাজ, কোথাও আবার দক্ষিণরায়, বুড়োশিব ইত্যাদি লৌকিক রূপে পুজো পেয়ে থাকেন। মহাদেব ও তাঁর সঙ্গে থাকা পার্বতীর এই বাঙালি লৌকিক রূপগুলির পোশাক, সাজ সবই অন্যরকম। উত্তর ভারতীয়দের মনে যে শিবের ছবিটা গেঁথে আছে, বলিউডে যে রুদ্রমূর্তিধারী শিবকে দেখা যায় তার থেকে ইনি অনেকটাই আলাদা।
গো-বলয়ে শিবের যে 'সিক্স প্যাক' মার্কা 'বাহুবলি' ছবি দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি, সেটা গ্রামবাংলায় এসে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। এখানে শিবের একটা নোয়াপাতি ভুঁড়ি আছে, সঙ্গে ঝোলা গোঁফ… চেহারায় এক রকমের মলিনতা, যেন সংসারের ভার সামলাতে গিয়ে ধ্বস্ত গ্রাম বাংলার সাধারণ পুরুষ। বাংলার দরিদ্র পান্তা ভাত খাওয়া পুরুষরা তো কতকটা এমনই হয়ে থাকেন।
চৈত্র মাসে আজও বাংলার গ্রামে গ্রামে অনেকে গাজনের সন্ন্যাস রাখেন। গোটা মাস জুড়ে শিবের ছবি বা ছোট শিবলিঙ্গ নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে চাল, ডাল সংগ্রহ করাটা এর অন্যতম প্রথা। দিনের শেষে সেই সংগ্রহ করা চাল-ডাল ফুটিয়ে যা হয় তাই খেয়ে থাকেন গাজন সন্ন্যাসীরা। এভাবেই মাস ভর কৃচ্ছ্বসাধন করেন তাঁরা। এই সন্ন্যাসের শেষে বসে গাজনের মেলা।
সেই মেলার দিন বহু জায়গায় শিব-পার্বতীর বিয়ে হয়। আবার অনেক জায়গায় পরের দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিতে ইষ্ট ভোলা মহেশ্বরকে সন্তুষ্ট করতে চড়কে অনেক শিব ভক্ত আরও কঠিন পরীক্ষা দেন। কেউ জ্বলন্ত কয়লার উপর দিয়ে হাঁটেন, অনেকে জিভে বান ফুঁড়িয়ে রাখেন, কেউ কেউ চড়ক গাছ থেকে দড়ির সাহায্যে ঝুলে পড়ে বাঁই বাঁই করে ঘুরতে থাকেন।
মজার ব্যাপার হল গাজনের সন্ন্যাস রাখা এবং চড়কের এই উদযাপনে মূলত বাঙালি হিন্দু সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণিরাই অংশগ্রহণ করে। ভাবখানি যেন অনেকটা এইরকম- সারা বছর ভোলা মহেশ্বর উঁচু শ্রেণির-উঁচু জাতের তোমাদের, কিন্তু এই গাজনের সময় ভোলেবাবা শুধুই আমাদের! তাই বোধহয় এখানে শিব আরও বেশি পাশের বাড়ির লোকটার মতোই কিঞ্চিত মলিন রূপী।
শিব-পার্বতীর বিয়েকে কেন্দ্র করে বড় আরেকটি উৎসব হয়, তার নাম মহা শিবরাত্রি। এটা অবশ্য গোটা ভারতবর্ষ জুড়েই হয়। আসলে অনেকেই যেটা জানেন না তা হল, প্রতিমাসের কৃষ্ণপক্ষের ১৪ তম রাত্রি বা চতুর্দশীই হল শিবরাত্রি। তবে ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী মহা শিবরাত্রি হিসাবে পালিত হয়। বিভিন্ন হিন্দু পুরানে বর্ণনা করা হয়েছে, দেবী সতীর শোকে কাতর হয়ে মহাদেব গভীর ধ্যানে বসেছিলেন। সেই সুযোগে তারকাসুর স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল সবকিছু দখল করে নেয়। তাকে কোনও দেবতাই পরাজিত করতে পারছিলেন না। সেই সময় ব্রহ্মা জানান, তারকাসুরকে বধ করতে এক শক্তিশালী দেব সেনাপতি দরকার, যাকে আবার মহাদেব ও উমার সন্তান হতে হবে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব? সতীর অন্তের পর উমা রূপে তিনি আবার হিমালয় রাজের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন ঠিকই, কিন্তু তখনও মহাদেবের সঙ্গে তো তাঁর দেখাই হয়নি!
এই সময় ব্রহ্মা উদ্যোগ নিয়ে মহাদেবের সঙ্গে উমা বা পার্বতীর বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই বিয়ে হয়েছিল ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর দিন আজকের উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলার ত্রিযুগীনারায়ণ গ্রামের বিষ্ণু মন্দিরে। যা ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দির নামে খ্যাত। এরপর শিব-পার্বতীর সন্তান কার্তিক জন্ম নেয় ও দেবতাদের সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে তারকাসুরকে নিকেশ করে।
এই মহা শিবরাত্রির দিন উত্তর ভারতে ব্যাপকভাবে শিব-পার্বতীর বিয়ের রীতি পালন করা হয়। অতটা ব্যাপকভাবে না হলেও সেই প্রথা বাংলাতেও প্রচলিত। বিশেষ করে পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া, কালনার বিভিন্ন গ্রামে ঘটা করে এই দিন হর-গৌরীর বিয়ে দেওয়া হয়।
শিব শুধুই হিন্দু ধর্মের অতি শক্তিশালী একজন দেবতা নন। এই উপ-মহাদেশীয় বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্বিক চর্চায় তাঁকে শক্তির আধার রূপে গণ্য করা হয়। তাই হিন্দু ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৌদ্ধ, জৈন সহ এই উপমহাদেশে জন্ম নেওয়া প্রতিটি ধর্মমতে শিবের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু তাঁর রূপ ও বৈশিষ্ট্য অঞ্চল ভেদে বড়ই ভিন্ন।

উত্তর ভারতীয়দের কাছে শিব অনেক বেশি তাণ্ডবের দেবতা। তিনি সংহারক রূপেই সেখানে বেশি পূজিত হন। তাই সেখানে তাঁর চেহারা অনেক বেশি সুগঠিত, বলশালী। চেহারায় বিন্দুমাত্র মলিনতা নেই। বদলে ঔজ্জ্বল্য, দীপ্তি ফুটে ফুটে বের হয়। উত্তর ভারতীয় শিবের ধারণা মূলত পুরান কেন্দ্রিক।
আবার পূর্ব ভারত, বিশেষ করে এই বিস্তীর্ণ বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে শিবের আজকের বিস্তার ছড়িয়েছে অন্নদামঙ্গল, মনসামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল সহ বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যের হাত ধরে। যেখানে শিবকে কখনও অসহায় কৃষকের রক্ষাকর্তা হিসেবে লাঙল টেনে চাষ করে দিতে দেখা গেছে, আবার কোথাও বাঘের হাত থেকে সুন্দরবনের অসহায় মানুষকে বাঁচাতে তিনি দক্ষিণ রায়ের রূপ ধারণ করেছেন। অর্থাৎ গ্রাম বাংলার জীর্ণ কৃষকের কুঠীর বা সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে বসবাস করার ছাপ এখানকার শিবমূর্তির চেহারায় স্পষ্ট। ফলে এই বাংলায় শিবের মূর্তি, ছবি, ভাবনা ধ্বংসাত্মক নয়। তিনি অনেক বেশি আপনার জন, স্নেহ বৎসল আবার বড়ই খামখেয়ালিও বটে।
আবার বাংলাতেও ভোলা মহেশ্বর সব সময় যে এমন রূপে ছিলেন তাও নয়। পাল আমলে শিবের যে ছবি পাওয়া গিয়েছে তাতে তিনি অনেকটাই অন্যরকম। যে রূপ নাটেশ্বর নামে পরিচিত। যার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের নটরাজের অনেক মিল আছে, কিন্তু অমিলও প্রচুর। তিনি যেন জগতের যাবতীয় জ্ঞান, বিদ্যার আকর। একইসঙ্গে সে কী তীব্র দ্যুত্তি, আবার কী মলিন, পেলব…
আসলে শিব কোনও নির্দিষ্ট একটি রূপধারী নন। তাঁর মধ্যে সব রূপ, সব ভাবধারার মিলন ঘটেছে। তাই শিব মানেই রুদ্রমূর্তি, মহাতাণ্ডব নয়। ভোলা মহেশ্বরের আপনভোলা হতদরিদ্র রূপও সত্যি। তাই তো বিভেদ ঘুচিয়ে তিনি বাঙালির ঘরের ছেলে, ঘরের জামাই হয়ে উঠেছেন!
আসলে প্রাণের মানুষের কদরই যে আলাদা হয়!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
