শেষ আপডেট: 21 April 2026 10:11
প্লাস্টিকের বোতলে ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ লেখা, রাসায়নিক মিশ্রিত প্রসাধনীতে ‘হার্বাল’ ট্যাগ— চারদিকে যেন সবুজের ছড়াছড়ি। কিন্তু এই সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে আছে বড় প্রতারণা!
পরিবেশবান্ধবতার নামে মিথ্যা প্রচার— এই প্রবণতারই নাম গ্রিনওয়াশিং। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গবেষণায় উঠে এসেছে, বাজারে পরিবেশবান্ধব বলে দাবি করা বহু পণ্যই আসলে বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে।
গ্রিনওয়াশিং কী এবং কেন বিপজ্জনক?
গ্রিনওয়াশিং হল এমন এক বিপণন কৌশল, যেখানে কোনও সংস্থা বা ব্র্যান্ড নিজেদের পরিবেশবান্ধব বলে তুলে ধরে, অথচ বাস্তবে তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া বা পণ্য পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
এই প্রবণতা বিপজ্জনক
কারণ, এটি ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করে, প্রকৃত পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে পিছনে ঠেলে দেয়, পরিবেশ দূষণ কমানোর লড়াইকে দুর্বল করে৷
গবেষণায় কী উঠে এসেছে?
ইউরোপীয় কমিশনের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, পরিবেশবান্ধব দাবি করা পণ্যের প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে তথ্য বিভ্রান্তিকর বা অসত্য।
ভারতেও একই চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে, বিশেষ করে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ‘গ্রিন’ ট্যাগের অপব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, “সবুজ শব্দটি এখন বিক্রির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, বাস্তবের সঙ্গে যার সম্পর্ক অনেক সময়ই নেই।”
কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি গ্রিনওয়াশিং?
১. ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি: ‘সাস্টেইনেবল’ বা ‘অর্গানিক’ পোশাকের নামে দ্রুত উৎপাদন (fast fashion), যা পরিবেশের উপর মারাত্মক চাপ ফেলে।
২. প্রসাধনী শিল্প: ‘ন্যাচারাল’ বা ‘হার্বাল’ দাবি করা হলেও অধিকাংশ পণ্যে থাকে কৃত্রিম রাসায়নিক।
৩. খাদ্য ও প্যাকেজিং: প্লাস্টিক মোড়কে ‘বায়োডিগ্রেডেবল’ বা ‘রিসাইক্লেবল’ লেখা থাকলেও বাস্তবে তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয়।
৪. গাড়ি ও জ্বালানি ক্ষেত্র: কম দূষণকারী প্রযুক্তির নামে অতিরঞ্জিত দাবি, যা প্রকৃত নির্গমন কমায় না ততটা।

কীভাবে বোঝা যাবে গ্রিনওয়াশিং?
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন—
অস্পষ্ট শব্দ: “ইকো-ফ্রেন্ডলি”, “গ্রিন”, “ন্যাচারাল” (প্রমাণ ছাড়া)
নির্দিষ্ট তথ্যের অভাব
স্বীকৃত সার্টিফিকেশন না থাকা
প্যাকেজিং ও বাস্তবের মধ্যে অসামঞ্জস্য
আইনি কাঠামো কতটা শক্ত?
ভারতে ভোক্তা সুরক্ষা আইন ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলি কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিলেও, গ্রিনওয়াশিং রুখতে নির্দিষ্ট ও কড়া আইন এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে ২০২৪-২৫ সালের পর থেকে পরিবেশবান্ধব দাবির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি নতুন গাইডলাইন আনার পথে।
সাধারণ মানুষ কীভাবে সচেতন হবেন?
* পণ্যের লেবেল ভালো করে পড়ুন
* ‘১০০% ন্যাচারাল’ বা ‘কেমিক্যাল ফ্রি’ দাবিতে সন্দেহ রাখুন
* সার্টিফিকেশন (যেমন ISO, FSC ইত্যাদি) যাচাই করুন
* ব্র্যান্ডের পরিবেশ নীতির খোঁজ নিন
UNEP-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে অনেক বড় কোম্পানি Net Zero প্রতিশ্রুতি দিলেও তার প্রায় ৩০–৪০% ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য রোডম্যাপ নেই।
২০২৩-২৪ সালের মূল্যায়নে দেখা যায়, কর্পোরেট ক্লাইমেট ক্লেইমগুলির একটি বড় অংশে অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
UNEP সতর্ক করেছে, কার্বন অফসেটিং-এর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা (বাস্তব নির্গমন না কমিয়ে) গ্রিনওয়াশিংয়ের বড় লক্ষণ। রিপোর্টে উল্লেখ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে ১.৫°C লক্ষ্যমাত্রা রাখতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন প্রায় ৪২% কমাতে হবে—কিন্তু বর্তমান প্রতিশ্রুতি সেই লক্ষ্যের অনেক পিছনে।
কলকাতার বায়ুদূষণ:
Kolkata-এ শীতকালে AQI প্রায়শই ২০০–৩৫০-এর মধ্যে থাকে (যা ‘Poor’ থেকে ‘Very Poor’ স্তর)।
PM2.5 (সূক্ষ্ম দূষণ কণা) এর বার্ষিক গড় প্রায় ৬০–৯০ µg/m³! যা WHO-র নির্ধারিত নিরাপদ সীমা (৫ µg/m³)-এর তুলনায় ১০–১৫ গুণ বেশি।
শহরের মোট বায়ুদূষণের উৎসের মধ্যে আনুমানিক:
যানবাহন: ৩০–৪০%
নির্মাণের ধুলো: ২০–৩০%
শিল্প ও ইটভাটা: ২০–২৫%
শীতকালে তাপমাত্রা কমে গেলে ও বাতাস স্থির থাকলে দূষণ জমে গিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
কিছু দিনে PM2.5-এর মাত্রা ১৫০–২০০ µg/m³ ছাড়িয়ে যায়, যা ‘Severe’ পর্যায়ের কাছাকাছি।
সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন এখন বাজারের বড় হাতিয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে যদি থাকে প্রতারণা, তবে ক্ষতি শুধু ক্রেতার নয়, পুরো পরিবেশের।
‘গ্রিনওয়াশিং’-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই প্রয়োজন কঠোর আইন, স্বচ্ছ ব্যবসা এবং সর্বোপরি সচেতন নাগরিকের নজরদারি। না হলে ‘সবুজ’ শব্দটাই একদিন বিশ্বাস হারাবে, আর তার মাশুল দেবে প্রকৃতি নিজেই।