১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
মুঘলদের পরোক্ষ অবদানে শুরু প্রথম দুর্গাপুজোর!

ছবি - AI

মুঘলদের পরোক্ষ অবদানে শুরু প্রথম দুর্গাপুজোর!

calender icon 2 ১৭ই আগস্ট, ২০২৬

আজকের কলকাতার দুর্গাপুজো মানেই থিমের চমক, আলোর রোশনাই। কিন্তু এর শুরুটা কোথায় তা হয়ত অনেকেই জানেন না। ইতিহাস বলছে, সপরিবারে মা দুর্গার আরাধনার এই প্রথা আজ থেকে ৪০০ বছরেরও বেশি সময় আগে বাংলার মধ্যে প্রথম কলকাতার বুকেই শুরু হয়েছিল। সপরিবারে মা দুর্গার এই আরাধনার সার্বজনীন প্রথা গোটা বিশ্বের বুকেই সেই প্রথম।

ব্রিটিশরা তখন‌ও এ দেশে সেভাবে পা-ই রাখেনি। সেই সময়, অর্থাৎ ১৬১০ সালে, আজকের বেহালার বড়িশায় শুরু হয়েছিল প্রথম সপরিবারে মা দুর্গার পুজো। আর শুরুটা করেছিল কলকাতার বিখ্যাত জমিদার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার।

শুরুর সেই দিনগুলো

সালটা ১৬১০। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে আটটি পরগনার করমুক্ত জায়গির লাভ করেন রায় লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় মজুমদার চৌধুরী। বাংলার বড় ভূঁইয়ার অন্যতম শক্তিশালী প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুঘল সেনাপতি বিখ্যাত মানসিং-কে সহযোগিতা করার পুরস্কার স্বরূপ এই জায়গির পান তিনি। সেটা ১৬০৮ সালে। জায়গির পাওয়ার ঠিক ২ বছর পর ১৬১০ সালে লক্ষ্মীকান্ত এবং তাঁর স্ত্রী ভগবতী দেবী বড়িশার আটচালা বাড়িতে প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন।

তৎকালীন কলকাতা ছিল গহীন জঙ্গল আর জলাভূমিতে ভরা। সেই জনপদেরই এক প্রান্তে, বড়িশায় শুরু হয় এই দুর্গাপুজো। অবশ্য তৎকালীন কলকাতা, গোবিন্দপুর ও সুতানুটি- এই তিন গ্রামের তুলনায় বড়িশা এলাকায় মানুষের বসবাস অনেকটা বেশি ছিল।

আরও পড়ুন
সৈন্যদের ফেলে যাওয়া এই আবাসন‌ই আজ কলকাতার সিগনেচার
কলকাতায় পালকি ধর্মঘট! তাতেই বদলে যায় ইতিহাস
বাঙালি মুদির নামে ব্রিটিশ ভারতের ‘প্রবেশদ্বার’!

কেন সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের দুর্গাপুজো বাকিদের থেকে আলাদা?

সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের পুজো কেবল বয়সের ভারেই প্রাচীন নয়, এর রীতিনীতিতেও রয়েছে এক অভূতপূর্ব স্বকীয়তা। সব থেকে বড় চমকটা হল প্রতিমার কাঠামোয়। এরাই প্রথম সপরিবারে দেবী দুর্গার আরাধনার প্রচলন করেছিলেন। তার আগে মূলত এককভাবেই মা দুর্গার আরাধনা হতো। লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীই প্রথমবার দেবীকে তাঁর সন্তানদের নিয়ে এক ফ্রেমে বাঁধার এই অনন্য প্রথা শুরু করেন।

এছাড়া, দেবীর গায়ের রঙেও রয়েছে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। শরতের শিউলি ফুলের বোঁটার যে রং, ঠিক সেই আদলেই এখানকার দেবীর গাত্রবর্ণ তৈরি হয়। সনাতন একচালা প্রতিমার চালচিত্রে ফুটে ওঠে দশমহাবিদ্যা- ছিন্নমস্তা, বগলা, কমলাকামিনী থেকে মাতঙ্গী। আবার, অবাক করা বিষয় হল, শাক্ত প্রথার পুজো হওয়া সত্ত্বেও এই চালচিত্রের এক কোণে রাধাকৃষ্ণের‌ও পুজো হয়। শৈব, শাক্ত এবং বৈষ্ণব এই ত্রিশক্তির এক আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটে বড়িশার সাবর্ণদের পুজোয়।

বিদ্যাপতির নিয়মে তন্ত্রমতে আরাধনা

এই পুজোর নিয়মকানুন শুনলে গায়ে কাঁটা দিতে বাধ্য। আধুনিকতার কোনও ছোঁয়াই এখানে এসে পৌঁছাতে পারেনি। মহাকবি বিদ্যাপতির রচিত 'দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী' গ্রন্থ মেনে, সম্পূর্ণ তন্ত্রমতে এখানে দেবীর আরাধনা করা হয়। পুজো শুরুর দিনগুলিতে দেবীর কাঠামো তৈরি হতো মাটি আর গোলপাতা দিয়ে। আজ হয়তো সেই জায়গায় সিমেন্টের আটচালা তৈরি হয়েছে, কিন্তু পুরনো মন্দিরের স্মৃতি বহন করা কয়েকটি থাম আজও সযত্নে রক্ষা করে চলেছে ইতিহাসের অমূল্য সাক্ষ্য।

আটটি শাখায় বিভক্ত

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পরিধিও অনেকটাই বিস্তৃত হয়েছে। এখন আর সকলের পক্ষে একটি জায়গায় পুজো করা সম্ভব হয় না। তাই বর্তমানে এই পরিবারের তরফ থেকে মোট আটটি দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে কলকাতাতেই হয় ছ'টি পুজো- বড়িশার আটচালা বাড়ি, বড় বাড়ি, বেনাকি বাড়ি, মেজো বাড়ি, মাঝের বাড়ি এবং কালীকিঙ্কর ভবন। বাকি দু'টি পুজো অনুষ্ঠিত হয় উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটি এবং নিমতার পাঠানপুর অঞ্চলে। তবে, এই সব ক'টি পুজোর মধ্যে আটচালা বাড়ির পুজোটিই হল সেই আদি পুজো, যা ১৬১০ সালে শুরু হয়েছিল।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য