

কাল্পনিক ছবি - AI
১৮ই আগস্ট, ২০২৬
কলকাতার 'বাবু কালচার' বললেই প্রথমে একদল বিপুল অর্থবান অথচ উদ্ভট শখের অধিকারী শহুরে শ্রেণির কথা আমাদের মাথায় আসে। টাকা ওড়ানোর এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় মেতে থাকতেন তাঁরা। কেউ বিড়ালের বিয়েতে লক্ষ টাকা ওড়াতেন, কেউ আবার গঙ্গার বুকে বজরা ভাসিয়ে বাইজির ঘুঙুরের তালে মজে থাকতেন। তবে এই বাবুগিরির ভেতরে কখনও কখনও মানবিক 'টাকার শ্রাদ্ধ' দেখতে পাওয়া যেত। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ধর্মতলার ‘মনোহর দাস তড়াগ’।
সালটা আঠারো শতকের শেষভাগ। নতুন শাসক ইংরেজদের সহযোগী হয়ে বিত্ত আর বৈভবের অহঙ্কারে কলকাতার এক শ্রেণি তখন রীতিমতো ফুলে-ফেঁপে উঠছে। সেই সময় এক বাবুর কাণ্ড দেখে ব্রিটিশ সাহেবরা পর্যন্ত চমকে গিয়েছিল। গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদে গরুদের তেষ্টা ঘোচাতে খোদ ধর্মতলা চত্বরে আস্ত একটা পুকুর খুঁড়ে ফেলেন তিনি! সেই মানুষটির নাম ছিল মনোহর দাস।
মনোহর দাস মোটেও খাঁটি বাঙালি নন। তাঁর জন্ম ১৭২৭ সালে উত্তরপ্রদেশের বারাণসিতে। বাবা গোপাল দাস শাহ ছিলেন সেখানকার এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এবং বিত্তশালী পরিবারের মানুষ। ব্যবসার তাগিদেই ১৭৮০ সাল নাগাদ মনোহর দাস কলকাতায় আসেন এবং ধীরে ধীরে এই শহরেই থিতু হন।
সে যুগে বড়বাজার ছিল কলকাতার ব্যবসার মূল কেন্দ্র। মনোহর দাস সেখানেও নিজের প্রতিপত্তির ছাপ রেখেছিলেন। তাঁর তৈরি এক বিরাট বাজার আজও ‘মনোহরদাস কাটরা’ নামে পরিচিত। এমনকি মহাত্মা গান্ধি রোড থেকে স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে যাওয়ার পথে যে রাস্তাটা ডানদিকে পড়ে, তার নামও মনোহর দাস স্ট্রিট। বোঝাই যাচ্ছে টাকা বা প্রতিপত্তি কোনোটারই অভাব এই ব্যক্তির ছিল না। তবে বাকি বাবুদের থেকে তাঁর 'বাবুগিরি'র প্রকাশটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছিল একটু অন্যরকম।
সময়টা ১৮০০ সালের কাছাকাছি। তৎকালীন ধর্মতলা চত্বর স্বাভাবিকভাবেই আজকের মতো ছিল না। এখনকার মতো কংক্রিটের জঙ্গল তো ছিলই না বরং চারপাশে বিস্তীর্ণ সবুজ। তখন ওই এলাকায় প্রচুর গরু সহ অনেক গবাদি পশু চরে বেড়াত। গ্রীষ্মকালের দুপুরের প্রখর রোদে চড়ে বেড়ানো গবাদি পশুগুলোর পানীয় জলের বড় অভাব দেখা দিত। তৃষ্ণার্ত গরুদের এই কষ্ট দেখে মনোহর দাস ঠিক করেন কিছু একটা করতে হবে।
যেমন ভাবনা তেমন কাজ, টাকার তো আর অভাব ছিল না। তিনি এক বিশাল জলাশয় বা 'তড়াগ' (হিন্দি 'তালাও' বা হ্রদ) খনন করলেন ওই ধর্মতলা চত্বরে। ব্যাপারটা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাবলে অবাক লাগে বৈকি। সেইসঙ্গে গরুদের চড়ে বেড়ানোর জন্য পুকুরের চারপাশে পাক্কা ১০০ বিঘা জমিও কিনে ফেলেন! ভাবা যায়?
আজকের ধর্মতলার মোড়ে ১০ কাঠা জমির দাম কত হতে পারে, তা ভাবলেই মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হয়। সেখানে নাকি ১০০ বিঘা জমি কিনেছিলেন!
পুকুর কাটার পর তার চার কোণায় মনোহর দাস চারটি ছোট ছোট মন্দিরও নির্মাণ করেন। এই আটচালা বা গম্বুজওয়ালা মন্দিরগুলোর প্রতিটিতে একটি করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল— শিবলিঙ্গ, বিষ্ণু, দেবী এবং সূর্যদেবতা। তাঁর এই মহৎ এবং একইসঙ্গে চরম ব্যয়বহুল উদ্যোগটি শহরের বুকে সেই সময়ই যথেষ্ট চাঞ্চল্য ফেলেছিল। সেই থেকে এই জলাশয়ের নাম হয়ে যায় 'মনোহর দাস তড়াগ'।
লিন্ডসে স্ট্রিটের (Lindsay Street) ঠিক উল্টোদিকে ময়দানের গায়ে যে জলাশয়টি আপনি আজও দেখতে পান, সেটিই হল মনোহর দাস তড়াগ। যদিও ব্রিটিশ আমলে বা পরবর্তীকালে এই পুকুরটিকে নিয়ে বিস্তর টালবাহানা হয়েছে। মেট্রোর কাজের সময় বা আশির দশকের পর থেকে দীর্ঘদিন এটি চূড়ান্ত অবহেলার শিকার হয়। নোংরা, থার্মোকল আর প্লাস্টিকে ভরে গিয়েছিল পুরো এলাকা। চারপাশের মন্দিরগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থল।
তবে আশার কথা হল, সম্প্রতি এর সৌন্দর্যায়ন করা হয়েছে। বিকেলে জলের ফোয়ারা চলে, চারপাশটা পরিষ্কার করে একটা সুন্দর পার্কের রূপ দেওয়া হয়েছে। মন্দিরের গম্বুজগুলোতে নতুন রঙের প্রলেপ পড়েছে, যদিও ভেতরের মূর্তিগুলো সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই উধাও। ১৯৪৮ সালের বিজয়া দশমীর দিন মনোহর দাসের পঞ্চম প্রজন্মের বংশধরদের উদ্যোগে তৎকালীন রাজ্যপাল কৈলাশ নাথ কাটজু পুকুরের পূর্বদিকে একটি মার্বেলের ফলক উন্মোচন করেছিলেন, যা আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
