১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বাঙালির হেঁশেলের সেকাল: পাল-সেন-সুলতানি যুগের ফুড কালচার

প্রতীকী ছবি - AI

বাঙালির হেঁশেলের সেকাল: পাল-সেন-সুলতানি যুগের ফুড কালচার

calender icon 2 ২০শে আগস্ট, ২০২৬

মূল বিষয়

মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে রবিবারের দুপুরে ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে আলু দেওয়া খাসির মাংসের ঝোল, কিংবা রাতে রুটি খাওয়ার পর শেষপাতে নরম তুলতুলে ছানার মিষ্টি ছাড়া আজকের দিনে রসনা তৃপ্তির কথা ভাবাই যায় না। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টে কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে গেলেই এক অন্য বাংলার দেখা পাওয়া যায়। ইউরোপীয় বণিকরা বাংলার মাটিতে পা রাখার আগে পাল, সেন এবং সুলতানি যুগের প্রায় সাতশো-আটশো বছর ধরে বাংলার খাদ্যাভ্যাসে আলু, টমেটো, কাঁচালঙ্কা বা পেঁপের নামগন্ধও ছিল না। অথচ আলু, টমেটো আর কাঁচালঙ্কা ছাড়া বর্তমানে বাঙালির রান্নার কথা ভাবাই যায় না।

সেই সময়ে বাঙালি দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরি করাকে মারাত্মক অশুভ বলে মনে করত। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে, মধ্যযুগে বাঙালি কেমন খাবার খেত? শ্রেণি, ধর্ম ও শাসনকাঠামোর বদলের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে বদলে যাচ্ছিল বাঙালির পাত? ইতিহাসের গভীরে ডুব দিয়ে সেই হারানো হেঁশেলের গন্ধ নেওয়া যাক।

পাল যুগ: সহজপাচ্য আহার, মৃগয়া এবং বৌদ্ধ অহিংসার স্বাদীয় সংঘাত

অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী ছিল বাংলায় পাল শাসনের আমল। পাল'রা ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এই যুগে সমাজের বিভিন্ন স্তরে খাদ্যাভ্যাসের বৈষম্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। চর্যাপদের পদগুলো বিশ্লেষণ করে সেকালের সমাজ ও খাদ্যাভ্যাসের এক নিখুঁত ছবি পাওয়া গিয়েছে।

রাজা ও উচ্চবিত্তের ভোজ: রাজা এবং অভিজাত শ্রেণির নিত্যদিনের আহার ছিল প্রাচুর্যে মোড়া। সরু সুগন্ধি 'শালিধান'-এর ভাত এবং গাওয়া ঘি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। সেই যুগে রাজাদের অন্যতম প্রধান বিনোদন ছিল মৃগয়া বা শিকার। ফলে রাজকীয় ভোজসভায় হরিণ, বন্য শূকর এবং নানা ধরনের পাখির মাংস পোড়ানো বা ঝলসানো অবস্থায় পরিবেশন করা হত। মশলার ব্যবহার খুব বেশি না থাকলেও গোলমরিচ, পিপুল এবং এলাচের মতো সুগন্ধি মশলা ব্যবহার করতেন।

বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের অনাড়ম্বর জীবন: রাজকীয় আভিজাত্যের ঠিক উল্টো মেরুতে ছিলেন বৌদ্ধ শ্রমণ ও সন্ন্যাসীরা। অহিংসার আদর্শে বিশ্বাসী এই সন্ন্যাসীদের আহার ছিল অত্যন্ত কঠোর নিয়ম কানুন মেনে চলা ও অনাড়ম্বর। ভিক্ষা করে সংগ্রহীত অন্ন ও খাবার ছিল তাঁদের সম্বল। মূলত নিরামিষ, সহজপাচ্য এবং জলে সেদ্ধ করা খাবারই তাঁরা গ্রহণ করতেন। চালের মণ্ড, বনজ মূল এবং পাতা সেদ্ধ খেয়ে দিন কাটাতেন তাঁরা। মাংস খাওয়া তাঁদের জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল।

সাধারণ ও নিম্নবিত্তের পাত: পাল যুগে গ্রামের সাধারণ প্রজা এবং নিম্নবিত্ত প্রান্তিক মানুষদের (যেমন শবর, নিষাদ, হাড়ি) জীবনে তেল বা ঘিয়ের প্রবেশাধিকার ছিল না বললেই চলে। চর্যাপদেই হাড়িপাদের আক্ষেপে শোনা যায়— "হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী"। মানে হল- হাঁড়িতে ভাত নেই, তবু রোজ অতিথির ভিড়।

এদের হেঁশেলে মশলার ব্যবহার প্রায় ছিল না। মাঠ-ঘাট হেকে তুলে আনা বুনো শাক (কলমি, ঢেঁকি, বেতো), খাল-বিলের ছোট মাছ, গেঁড়ি-শামুক এবং কাঁকড়াই ছিল এই শ্রেণির দৈনন্দিন প্রোটিনের মূল উৎস। খাবার মূলত আগুনে সরাসরি পুড়িয়ে বা জলে সামান্য নুন দিয়ে সেদ্ধ করে খাওয়া হত। উৎসবের দিনে চাল পচিয়ে তৈরি দেশি মদ 'হাঁড়িয়া' পান করত এই শ্রেণির মানুষ।

সেন যুগ: ব্রাহ্মণ্যবাদের কড়াকড়ি ও বর্ণাশ্রমে বিদ্ধ হেঁশেল

দ্বাদশ শতাব্দীতে পাল শাসনের অবসানের পর সেন রাজাদের হাত ধরে বাংলায় কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্থান ঘটে। সমাজ বৌদ্ধ থেকে বর্ণভেদ আশ্রয়ী কট্টর রক্ষণশীল হিন্দুতে পরিণত হয়। ‌এতে সমাজ যেমন জাতপাতে বিভক্ত হল, তেমনই খাবারও ভাগ হয়ে গেল বর্ণ ও শাস্ত্রের অনুশাসন অনুযায়ী।

ব্রাহ্মণদের শাস্ত্রীয় কড়াকড়ি এবং মৎস্য-বিতর্ক:

সেন যুগে উত্তর ভারতীয় ব্রাহ্মণরা বাংলার ব্রাহ্মণদের মাছ খাওয়ার তীব্র নিন্দা শুরু করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভবদেব ভট্ট এবং জীমূতবাহনের মতো তৎকালীন বাংলার শাস্ত্রকাররা আসরে নামেন। 'বৃহদ্ধর্ম পুরাণ' ও 'ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ'-এর মাধ্যমে বাঙালি ব্রাহ্মণদের মাছ খাওয়ার শাস্ত্রীয় বৈধতা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে নিয়ম করে তাতে কিছু বিধিনিষেধ‌ও চাপিয়ে দেয়। কেবলমাত্র রুই, কাতলা, শোল বা খলসের মতো সাদা ও আঁশযুক্ত মাছই উচ্চবর্ণের মানুষ খেতে পারবেন। বোয়াল, মাগুর বা শিঙির মতো পাঁকের বা আঁশহীন মাছ, শামুক-কাঁকড়া খাওয়া ব্রাহ্মণদের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। পেঁয়াজ, রসুন এবং মসুর ডালকে অপবিত্র তকমা দিয়ে উচ্চবর্ণের হেঁশেল থেকে সে যুগে নির্বাসিত করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন
উড়িয়া ঠাকুরদের হাতের জাদুতে বদলে গেল বাঙালির হেঁশেল
বাবুয়ানির হাত ধরে বদলে যায় বাঙালির হেঁশেল
পর্তুগিজদের হাত ধরে বাংলার রান্নাঘরে কাঁচালঙ্কার প্রবেশ!

উচ্চবিত্ত জমিদার বনাম সাধারণ প্রজার পাত:

সেন যুগে জমিদার ও বিত্তবানরা দুধ, মাখন, ক্ষীর এবং দামি সুগন্ধি চাল খেতেন। অন্যদিকে, সাধারণ কৃষকদের প্রধান খাদ্য ছিল মোটা লাল চালের ভাত বা পান্তা ভাত। প্রোটিনের অভাবে সাধারণ গরিব প্রজারা সেই নিষিদ্ধ বোয়াল মাছ, ব্যাঙ বা কাঁকড়া খেত লোকচক্ষুর অন্তরালে।

মধ্যবিত্ত গৃহস্থের স্বপ্নের পাত:

এই কড়াকড়ির মধ্যেও তৎকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালির পরম তৃপ্তির আহার কেমন ছিল, তার চমৎকার প্রমাণ মেলে প্রাকৃত ভাষায় রচিত 'প্রাকৃতপৈঙ্গল' গ্রন্থে। সেখানে বলা হয়েছে: "ওগ্‌গর ভত্তা, রম্ভঅ পত্তা, গাইক ঘিত্তা, দুগ্ধ সজুত্তা,মোইলি মচ্ছা, নালিচ গচ্ছা…" অর্থাৎ- কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, নালতে (পাট) শাক, মৌরলা মাছের ঝোল এবং শেষে দুধ। কোনো জটিল মশলা নয়, এই সাধারণ সুষম আহারই ছিল তখন মধ্যবিত্তের কাছে স্বর্গের সমান।

সুলতানি যুগ: অভিজাত হেঁশেলের দুই ভিন্ন রূপ ও রন্ধনশিল্পের বিকাশ

সেন বংশের পতনের পর চতুর্দশ শতকে বাংলায় ইলিয়াস শাহি ও হুসেন শাহি বংশের হাত ধরে খাদ্যাভ্যাসে বিরাট পরিবর্তন আসে। বাংলার স্থানীয় উপাদানের সঙ্গে তুর্কি-আফগান ও ফারসি রন্ধনশৈলীর এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটে সেই যুগে।

মুসলিম অভিজাতদের রাজকীয় রান্নাঘর:

গৌড়, পাণ্ডুয়া ও সোনারগাঁয়ের সুলতানি দরবারে এই প্রথম আটার রুটি, নান এবং গরুর মাংসের প্রবেশ ঘটে। রান্নায় শুরু হল এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়। ধীর আঁচে পাত্রের মুখ আটা দিয়ে বন্ধ করে 'দম' দেওয়ার পদ্ধতি এঁরাই বাংলায় নিয়ে আসেন। খাবারে জাফরান, গোলাপ জল, কিশমিশ, পেস্তা এবং পেঁয়াজ-রসুনের বিপুল ব্যবহার এই সময় থেকেই ব্যাপকভাবে শুরু হয়। সুগন্ধি পোলাও, কোর্মা, কালিয়া, বিরিয়ানি আর রকমারি কাবাব রাজকীয় ভোজসভার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

হিন্দু অভিজাতদের ঐতিহ্যবাহী ভোজ:

সুলতানি দরবারের জাঁকজমক হিন্দু জমিদার ও বণিকদের অন্দরমহলে প্রভাব ফেললেও, তাঁরা নিজেদের হেঁশেলের প্রাচীন ধারা এক‌ইসঙ্গে সযত্নে বজায় থাকে। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর 'চণ্ডীমঙ্গল' বা বিজয়গুপ্তের 'মনসামঙ্গল' কাব্য ঘাঁটলে দেখা যায়, ধনী হিন্দুদের ভোজসভায় অনায়াসে পঞ্চাশটির বেশি পদ রান্না হত! সুলতানি যুগেই বাঙালির কোর্সভিত্তিক খাওয়ার রীতি পাকাপোক্ত রূপ পায়।

তখন উচ্চবিত্ত বাঙালির খাওয়া শুরু হত নিম বা পলতা পাতা ভাজা দিয়ে। অর্থাৎ তেতো পদ দিয়ে। এরপর আসত মুগ বা মাষকলাইয়ের ডাল, সঙ্গে কচু, ওল বা ডুমুরের রকমারি ঘণ্ট। তারপর পাতে পড়ত রুই, চিতল বা ভেটকি মাছের সর্ষে বাটা দিয়ে কালিয়া। সবশেষে থাকত চালতা, আমড়া বা তেঁতুলের অম্বল।

ছানা বিবর্জিত মিষ্টি:

ছানার ব্যবহার না থাকায় এই পুরো সাত-আটশো বছর ধরেই মিষ্টি তৈরি হত চালের গুঁড়ো, নারকেল, ইক্ষুগুড় (আখের গুড়) এবং দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি ক্ষীর দিয়ে। মালপোয়া, ক্ষীরপুলি, পিঠে, পায়েস এবং নাড়ুর একচেটিয়া আধিপত্য ছিল হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের শেষপাতে।

প্রাচীনকালের প্রান্তিক মানুষের পোড়ানো খাবার, সেন যুগের শাস্ত্র-শাসিত নিরামিষ-আমিষের দ্বন্দ্ব থেকে সুলতানি যুগের সুগন্ধি কালিয়া- এই সুদীর্ঘ সাত-আটশো বছরের বিবর্তনই আসলে আজকের সমৃদ্ধশালী বাঙালি রান্নার ভিত গড়ে দিয়েছে। ইতিহাস আসলে শুধু রাজায় রাজায় যুদ্ধের নয়, ইতিহাস লুকিয়ে থাকে রান্নাঘরের ধোঁয়ায়, মশলার গন্ধে'ও।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য