kanan devi -old photo
২২শে এপ্রিল, ২০২৬
আজ জন্মদিন
সময়ের প্রান্তিক অন্ধকারে জন্ম নিয়েও আলোকে এক্কেবারে নিজের করে নেওয়ার গল্পই কানন দেবী-র জীবন। ১৯১৬ সালের ২২ শে এপ্রিল, হাওড়ায় জন্ম নেওয়া কাননবালা খুব অল্প বয়সেই বুঝে ফেলেছিলেন—জীবন মানে সংগ্রাম। পিতৃহীনতা, দারিদ্র্য, অন্যের বাড়িতে কাজ করা অন্নের অনিশ্চয়তা - এসবই ছিল তাঁর শৈশবের অনিবার্য অংশ। তবুও এই অন্ধকারই তাঁর ভিত গড়ে দেয় আর রচিত হয় শিল্প, সাহস ও নারীস্বাধীনতার এক অনন্য ইতিহাস।
মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। ১৯২৬ সালে ম্যাডান থিয়েটারের প্রযোজনায় ও জ্যোতিশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নির্বাক ছবি ‘জয়দেব’-এ একটি ছোট চরিত্রে তাঁর প্রথম অভিনয়। সেই সময় ভারতীয় সিনেমা ছিল নির্বাক থেকে সবাক যুগে রূপান্তরের পথে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে- সৌন্দর্য, প্রতিভা আর ব্যক্তিত্ব - এই তিনের সম্মিলনে কানন দেবী হয়ে ওঠেন এক বহুমুখী শিল্পী।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় নিউ থিয়েটার্স-এ। ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে এই প্রতিষ্ঠান ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম কেন্দ্র। ১৯৩৫ সালে নির্মিত জ্যোতিশ বন্দোপাধ্যায়ের ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ তাঁকে অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। এরপর ১৯৩৭ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে অভিনেত্রী থেকে তিনি হয়ে ওঠেন তারকা, ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘সিংগিং স্টার’। প্রায় ৭০টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন কানন দেবী। এর মধ্যে রয়েছে - ‘ঋষির প্রেম’, ‘প্রহ্লাদ’, ‘কংসবধ’, ‘বিষ্ণুমায়া’, ‘মা’, ‘কণ্ঠহার’, ‘বাসবদত্তা’, ‘পরাজয়’, ‘যোগাযোগ’, ‘মুক্তি’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘সাথী’, ‘পরিচয়’, ‘শেষ উত্তর’, ‘মেজদিদি’ - এর মতো একাধিক চলচ্চিত্র।

রাস্তাটা যদিও এতটা সহজ ছিল না। অভিনয়ের জন্য আপত্তি থাকা সত্বেও বেশ এমন কিছু দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়েছে, যা তৎকালীন সময়ে ছিল 'অশালীন'। অনেক সময়ই পাননি সঠিক পারিশ্রমিক। তবু বারবার নিয়মের বেড়াজাল টপকে সমাজের চোখ রাঙানিকে স্রেফ পরোয়া না করে এক নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেছেন। এমনটাও বলা হয় যে, পর্দায় চুমু খাওয়ার মধ্যে দিয়ে বাংলা তথা ভারতীয় নারীকে সাবালিকা হতে সাহায্য করেছেন কানন দেবী। শুধুমাত্র তাই-ই নয়, কলকাতার রাস্তায় চট বিছিয়ে তাঁর ফটোগ্রাফ বিক্রি হতো, মহিলাদের কাছে তিনি ছিলেন জ্বলন্ত ফ্যাশন আইকন।
কানন দেবীর কাছে সংগীতচর্চা নিছক পেশা নয়, বরং এটি ছিল তাঁর আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। তিনি ওস্তাদ আল্লারাখা, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম, অনাদি দস্তিদার ও পঙ্কজ কুমার মল্লিক দের মতো পণ্ডিত মানুষদের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। আধুনিক গান ও রবীন্দ্রসংগীতেও তাঁর দক্ষতা ছিল অপূর্ব। অভিনয় ছাড়াও অসংখ্য সিনেমায় তিনি প্লেব্যাক করেছেন। ‘তুফান মেইল যায়’, ‘যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন’, ‘কথা কইবো না বউ’, ‘ঘর যে আমাকে ডাক দিয়েছে’, ‘তোমারে ভুলতে পারিনা’, ‘ফেলে যাবে চলে যাবে তুমি জানি’ ; অথবা রবীন্দ্রসংগীত ‘আজ সবার রঙ্গে’ - গানগুলি অপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আজও যদি কোন রেডিও, এম এম চ্যানেল, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল ফোনের রিংটোনে - ‘আমি বনফুল গো… ‘ গানটি বেজে ওঠে, কানন দেবীর ব্যতিক্রমী কণ্ঠের মায়াজাদু আমাদের একটা আস্ত ইতিহাস স্মরণ করায় আর এক অদ্ভুত মোহময়তায় আকৃষ্ট হয় হৃদয়।
যখন সমাজে অধিকাংশ নারী অবগুণ্ঠিত আর চলচ্চিত্র জগতে পর্দার সামনে সীমাবদ্ধ, সেখানে কানন দেবী পা রাখেন প্রযোজনার জগতে। ‘শ্রীমতী পিকচার্স’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন - নারী কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, সৃষ্টির নিয়ন্ত্রকও হতে পারে। শুধু তাই নয়, আরো দুজন সাথীকে নিয়ে গড়ে তোলেন পরিচালনার একটি দল, নাম দেন - সব্যসাচী।
সমাজসেবা ও মানবিক মূল্যবোধে কানন দেবী নিজেকে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’ শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয় -এটি এক যুগের সামাজিক ইতিহাস।
১৯৪১ সালে নীতিন বসু পরিচালিত ‘পরিচয়’ এবং এই ছবির-ই হিন্দি সংস্করণ ‘লগন’-এ নায়িকার চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য বিএফজেএ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মানে ভূষিত হন কানন দেবী। ১৯৬৮ সালে চলচ্চিত্রশিল্পে অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে তিনি ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার পান। এছাড়াও সারাজীবনে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মান। তাঁর মৃত্যুর পর ২০১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশের ডাক বিভাগ তাঁর নামে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
সকলের অন্তরালে ১৯৯২ সালের ১৭ই জুলাই তাঁর জীবনাবসান হলেও তাঁর স্বপ্নের উত্তরাধিকার আজও জীবন্ত। কানন দেবী কেবল একজন শিল্পী নন - এক রূপান্তরের প্রতীক। তিনি তাঁর জীবনের মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছেন, স্বাধীনতা কোনো উপহার নয় - এটি অর্জনের বিষয়। আর সেই অর্জনের পথে দরকার সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের স্বরকে শোনানোর ক্ষমতা। কারণ তিনি শুধু পথ দেখাননি - তিনি নিজেই পথ তৈরি করেছিলেন। আর তাই কানন দেবী এক নাম নয়, এক নির্ভীক উচ্চারণ - যেখানে প্রতিটি নারী নিজের সম্ভাবনাকে নতুন করে চিনতে শেখে…!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
জন্ম মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে। সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা। সময় কাটে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। বর্তমানে লেখালিখি, ডিজিটাল কন্টেন্ট এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কর্মব্যস্ত।