

সুন্দরবনের বিবর্তনের ইতিহাস। ছবি - AI
১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সুন্দরবনের কথা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের হলুদ কালো ডোরাকাটা রূপ। গা ছমছমে নিশ্ছিদ্র ম্যানগ্রোভ অরণ্য। আর সর্বত্র নদী-খাঁড়িতে কুমির, কামোটের উৎপাত। কিন্তু এই গহীন অরণ্য চিরকাল এমন ছিল না।
সুন্দরবনের নদীগুলো শুধু জল বয়ে নিয়ে যায় না। নদী এখানে ইতিহাস লেখে। আবার নিজেই অবলীলায় সেই ইতিহাস মুছে দেয়। সুপ্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত সুন্দরবনের নদীর গতিপথ পরিবর্তন হলেই এখানকার প্রকৃতি, সভ্যতা এবং মানুষের জীবনের খোলনলচে সম্পূর্ণ বদলে যায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম ব-দ্বীপ সুন্দরবন। এটি ভূ-প্রকৃতির গঠনের দিক থেকে আজও নবীন অবস্থায় আছে। তাই বারবার এখানে নদীর স্রোতসহ ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন হতে দেখা যায়।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে গুপ্ত যুগ পর্যন্ত সুন্দরবনের ছবিটা ছিল একেবারে অন্য রকম। গঙ্গার মূল স্রোত তখন ভাগীরথী, আদি গঙ্গা ও বিদ্যাধরী দিয়ে বইত। বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জল অবলীলায় মিশত বঙ্গোপসাগরে। এই মিষ্টি জলের কারণে এখানকার মাটি ছিল অত্যন্ত উর্বর। নোনা জলের প্রকোপ তখন বলতে গেলে ছিলই না। আজকের মতো নিশ্ছিদ্র বাদাবনের তখন অস্তিত্বেই ছিল না। চারদিকে ছড়ানো ছিল উন্নত কৃষিজমি আর ব্যস্ত লোকালয়।
এই অনুকূল পরিবেশেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন গঙ্গারাজ্য বা গঙ্গারিডি সাম্রাজ্য। চন্দ্রকেতুগড় ছিল সেযুগের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক নৌবন্দর।
এই সময় এখানকার বিদ্যাধরী নদীর কল্যাণে রোম থেকে শুরু করে সুদূর আরব দুনিয়ার সঙ্গে বাংলার বাণিজ্য চলত। বাঘমারা বা গোবর্ধনপুরের মতো সুন্দরবনের একেবারে ভেতরের এলাকাতেও ওই সময়ে উন্নত সভ্যতার প্রমাণ মিলেছে। সেই সময় এই অঞ্চলে মূলত ধনী সওদাগর, দক্ষ কারিগর এবং কৃষকদের বসবাস ছিল। নদীপথের বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করে সমাজের এক বিত্তশালী শ্রেণি তখন বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। সব মিলিয়ে সেই সময় সুন্দরবন ছিল এক সমৃদ্ধ এলাকা।
কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম বড়ই অদ্ভুত। দ্বাদশ শতকের পর থেকে বাংলায় এক বিরাট ভূ-স্তরের গঠনগত পরিবর্তন শুরু হয়। এরফলে নদীর স্রোতের প্রবাহের দিক বদল ঘটে যায়। এই দিকবদলই সুন্দরবনের ইতিহাস চিরতরে বদলে দেয়। গঙ্গার মূল স্রোত ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে সরে গিয়ে পদ্মার রূপ নিতে শুরু করে। এর ফল হয় মারাত্মক। বিদ্যাধরী বা আদি গঙ্গার মতো নদীগুলোয় মিষ্টি জলের প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। নদীখাতগুলো ক্রমশ শুকিয়ে আসতে থাকে। সেই সুযোগে বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের নোনা জল প্রবল বেগে নদীর খাঁড়িগুলোতে ঢুকতে শুরু করে।
মিষ্টি জলের অভাবে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি রাতারাতি নোনা হয়ে যায়। ফলে কৃষিকাজ লাটে ওঠে। এর প্রভাবে উন্নত সভ্যতা আর সুন্দরবনে টিকতে পারে না। দলে দলে বিত্তশালী বণিক ও সাধারণ মানুষ ওই জনপদ ছেড়ে উত্তর দিকে পালাতে বাধ্য হয়। কৃষকরাও সুন্দরবন ত্যাগ করে। পড়ে থাকে ইটের দালানকোঠা, বড় বড় বাড়ি আর মন্দির। ধীরে ধীরে সেগুলোর উপর সুন্দরী, গরান আর গেঁওয়ার ম্যানগ্রোভ অরণ্য ছেয়ে যায়। গড়ে ওঠে এক নিশ্ছিদ্র গহীন জঙ্গল। মথুরাপুরের প্রাচীন জটার দেউল আজও সুন্দরবনের বুকে সেই সভ্যতার নিঃসঙ্গ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
পাল ও সেন রাজাদের পর এই অঞ্চল পুরোপুরি জঙ্গলে ঢেকে যায়। পরবর্তীকালে মুঘল আমলে প্রতাপাদিত্যের মতো বারোভুঁইয়ারা এই গহীন জঙ্গলকেই বেছে নিয়েছিল তাদের দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে। বারো ভূঁইয়াদের কেউ কেউ সুন্দরবনের জঙ্গলের মধ্যেই গড়ে তুলেছিল তাদের রাজধানী। জনগোষ্ঠীর চরিত্রেও তখন ব্যাপক বদল আসে। বিত্তশালী সওদাগরদের জায়গায় নদীপথে দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করে পর্তুগিজ হার্মাদ আর মগ জলদস্যুরা। পাশাপাশি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মধু ও কাঠ সংগ্রহ করতে আসা কিছু প্রান্তিক মানুষ এই জঙ্গলের আনাচেকানাচে আশ্রয় নেন।
আঠারো শতকের শেষদিকে ইংরেজ শাসনে সুন্দরবনে এল আরেক নতুন পরিবর্তন। ১৭৮১ সাল নাগাদ ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট টিলম্যান হেঙ্কেল রাজস্ব আদায়ের লোভে জঙ্গল পরিষ্কারের উদ্যোগ নিলেন। শুরু হল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অসম লড়াই। নির্বিচারে গাছ কাটা চলতে থাকল। রাজস্বের লোভে মাইলের পর মাইল ম্যানগ্রোভ সাফ করে ফেলা হয়। ফলে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের আয়তন ক্রমশ কমে সে দক্ষিণ দিকে সরে যেতে থাকে।
এই সময়ই ঘটে এক অদ্ভুত জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন। জঙ্গল সাফ করার জন্য ব্রিটিশ সাহেবরা ও জমিদাররা এক নতুন জনগোষ্ঠীকে এখানে নিয়ে এলেন। মেদিনীপুর, ওড়িশা এবং ছোটনাগপুর থেকে দলে দলে সাঁওতাল, মুন্ডা ও ওঁরাও সম্প্রদায়ের প্রান্তিক মানুষদের, অর্থাৎ আদিবাসী মূলনিবাসী জনগোষ্ঠীকে এখানে আনা হয়। নতুন কৃষিজমি তৈরির চেষ্টা চলে। নোনা জল ঠেকাতে সেই প্রথম নদীর দু'পাশে মাটির ভেড়ি বা বাঁধ দেওয়া শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ভুল। কারণ এর ফলে নদীর স্বাভাবিক পলি উপচে দ্বীপ উঁচু হওয়ার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
আজকের সুন্দরবন এক বিপন্ন বাস্তুতন্ত্রের পরীক্ষাগার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সুন্দরবনের ভেতরের নদীগুলো আক্ষরিক অর্থে আর নদী নেই। সেগুলো খাঁড়িতে পরিণত হয়েছে। জোয়ারের সময় জল উপচে পড়ে, আর ভাটায় শুকনো খটখটে। উজান থেকে মিষ্টি জল আসার কোনও পথ আজ আর অবশিষ্ট নেই। সুন্দরবনের মাটি বর্তমানে অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে এখানকার বিখ্যাত সুন্দরী গাছ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সুন্দরবনের জঙ্গল এখন অনেক পাতলা।
যে মাটির বাঁধ একসময় সুন্দরবনের মানুষকে মানুষকে বাঁচিয়েছিল, আজ সেটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঁধের কারণে পলি স্থলভাগকে উঁচু করতে পারেনি। পরিবর্তে নদীর বুকে পলি জমা হয়ে হয়ে নাব্যতা একেবারে কমে গিয়েছে। এখন সুন্দরবনের নদীগুলোতে বা খাঁড়িগুলোতে খুব অল্পই জল ধরে। এর কুপ্রভাবে নদীর জলস্তরের থেকে এখানকার স্থলভাগ নিচে চলে গিয়েছে। ফলে আয়লা বা আমফানের মতো ঘুর্নিঝড় এলেই নদীর নোনা জল বাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সব।
মানুষের বসবাসের এই প্রতিকূল ভূ-প্রকৃতিতে এখন মূলত জলবায়ু জনিত উদ্বাস্তু, প্রান্তিক জেলে এবং দরিদ্র কৃষকেরা বসবাস করে। বাঘের সঙ্গে লড়াই করে সুন্দরবনের টিকে থাকাটা ঠিক যতটা কঠিন, বর্তমানে জলবায়ুর সঙ্গে লড়াই করে এখানে অস্তিত্ব ধরে রাখাটা তার থেকেও বোধহয় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
