

প্যাসিভ স্মোকিংয়ে বাড়ছে মৃত্যু। ছবি - AI
১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
হাতে সিগারেট নেই। কিন্তু আশপাশের মানুষটি ধূমপান করছেন। সেই ধোঁয়াই নিঃশব্দে ঢুকে পড়ছে ফুসফুসে। এত দিন ‘প্যাসিভ স্মোকিং’ বা পরোক্ষ ধূমপানকে অনেকেই নিছক অস্বস্তির বিষয় বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। কিন্তু নতুন গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। ভারতে পরোক্ষ ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু মৃত্যুই নয়, কোটি কোটি মানুষ এখনও নিয়মিত অন্যের তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসছেন।
Global Burden of Disease (GBD) 2023-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, ১৯৯০ সালে ভারতে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে আনুমানিক ২ লক্ষ ১৭ হাজার ৭০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লক্ষ ২৫ হাজার ৬০০। অর্থাৎ তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
তবে গবেষণার ছবিতে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য। জনসংখ্যার অনুপাতে পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে আসার হার কমেছে। কিন্তু ভারতের বিপুল জনসংখ্যার কারণে মোট আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এখনও ভয়াবহ রকম বেশি।
২০২৩ সালে ভারতে আনুমানিক ৪৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে এসেছেন। অর্থাৎ দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজেরা ধূমপান না করেও অন্যের সিগারেট বা তামাকজাত পণ্যের ধোঁয়ার ঝুঁকি বহন করছেন।
১৯৯০ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭ কোটি ৫০ লক্ষ। ফলে শতাংশের হিসাবে exposure কমলেও বাস্তবে আক্রান্ত মানুষের মোট সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭ কোটি।
পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হল—বিপদ অনেক সময় বাইরে নয়, নিজের বাড়ির ভিতরেই।
কেউ ঘরের এক কোণে, বারান্দায় বা দরজার কাছে সিগারেট ধরালেই ধোঁয়া শুধু তাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতিকর কণা। পরিবারের অন্য সদস্যরা তা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেন।
বিশেষত ছোট ফ্ল্যাট, কম বায়ু চলাচল করে এমন ঘর কিংবা গাড়ির মতো বদ্ধ জায়গায় ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি শুধু ফুসফুসে আটকে থাকে না। দীর্ঘ সময় তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। গবেষণায় ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজকে পরোক্ষ ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত অসুস্থতা ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ছাড়াও ফুসফুসের ক্যানসার, COPD, হাঁপানি এবং শ্বাসনালির বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে দ্বিতীয় হাতের ধোঁয়ার সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, সিগারেটটি অন্য কেউ ধরালেও তার স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আপনি পুরোপুরি মুক্ত নন।
একই ঘরে বাবা, মা বা পরিবারের অন্য কোনও সদস্য ধূমপান করছেন। পাশে বসে বা খেলছে শিশু। সিগারেটটি তার হাতে নেই। কিন্তু ধোঁয়া তার শরীরেও ঢুকছে।
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও গুরুতর। কারণ তাদের ফুসফুস ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তখনও পুরোপুরি বিকশিত হয় না। পরোক্ষ ধূমপান শিশুদের শ্বাসনালির সংক্রমণ, হাঁপানি ও অন্যান্য শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বজুড়েও ছবিটি ভয়াবহ। ২০২৩ সালে প্রায় ৭৬.৭ কোটি শিশু দ্বিতীয় হাতের তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছিল বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।
অনেকের ধারণা, ঘরে জানলা খুলে, ফ্যান চালিয়ে কিংবা ধূমপান করার সময় দরজার কাছে দাঁড়ালেই বিপদ কমে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
বাতাস চলাচল করলেও তামাকের ধোঁয়ার ক্ষতিকর কণার সম্পূর্ণ নির্মূল নিশ্চিত করা যায় না। তাই বিশেষজ্ঞদের মূল পরামর্শ—ঘর এবং গাড়ির মতো বদ্ধ জায়গাকে সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত রাখা। অর্থাৎ, ‘ধোঁয়া কমানো’ নয়—ধোঁয়াকে ঢুকতেই না দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
গর্ভাবস্থাতেও পরোক্ষ ধূমপানকে হালকা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তামাকের ধোঁয়ার ক্ষতিকর উপাদান গর্ভবতী মহিলা এবং গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে বাড়িতে কোনও মহিলা অন্তঃসত্ত্বা থাকলে তাঁর আশপাশে ধূমপান না করার বিষয়টি শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়, স্বাস্থ্য সুরক্ষার জরুরি শর্ত।
পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতির হিসাব শুধু মৃত্যুর সংখ্যায় শেষ হচ্ছে না। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারতে এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৯২.৮ লক্ষ DALYs—অর্থাৎ রোগ, অক্ষমতা ও অকালমৃত্যুর কারণে হারানো সুস্থ জীবনবর্ষ—নষ্ট হয়েছে। তার মানে, ‘প্যাসিভ স্মোকিং’ কোনও সামান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের আয়ু, কর্মক্ষমতা এবং পরিবারের উপরেও।
পরোক্ষ ধূমপানের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত এখানেই। একজনের ধূমপানের সিদ্ধান্তের প্রভাব গিয়ে পড়ছে এমন মানুষের উপর, যিনি হয়তো জীবনে একটি সিগারেটও খাননি।
ভারতে তিন দশকে পরোক্ষ ধূমপানজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি বাড়ির ভিতরে, কর্মক্ষেত্রে এবং জনজীবনে তামাকের ধোঁয়ার বিস্তারের বড় সতর্কবার্তা।
সিগারেট ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাই শুধু নিজের ফুসফুস বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নয়। নিজের চারপাশের মানুষকেও বাঁচানোর সিদ্ধান্ত।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
