২৮শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
কলকাতার সম্প্রসারণ ও পরিবর্তিত ল্যান্ডস্কেপ কতটা দীর্ঘমেয়াদী?

কলকাতার উন্নয়ন ও বিতর্ক। ছবি - AI

কলকাতার সম্প্রসারণ ও পরিবর্তিত ল্যান্ডস্কেপ কতটা দীর্ঘমেয়াদী?

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

কলকাতার রূপান্তর: উন্নয়ন বনাম অন্তর্ভুক্তি

কলকাতার আধুনিক পরিকাঠামোগত রূপান্তর ভৌগোলিক বৈষম্য, জেনট্রিফিকেশন, পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ধ্বংস এবং বিপর্যস্ত পরিবহনের মতো গুরুতর সংকটের জন্ম দিচ্ছে। টেকসই ভবিষ্যতের জন্য চোখধাঁধানো অট্টালিকার চেয়ে প্রকৃতি রক্ষা, সাশ্রয়ী আবাসন এবং সর্বজনীন নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই জরুরি।

মূল বিষয়

ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের গর্ব আর আধুনিক ‘স্মার্ট সিটি’র মোহ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে আজ এক অদ্ভুত রূপান্তরের সাক্ষী কলকাতা। স্থাপত্যের নস্টালজিয়া আর চায়ের আড্ডার উষ্ণতায় যে শহরকে 'তিলোত্তমা' তকমা দেওয়া হয়, সাম্প্রতিক গবেষণায় তার চকচকে আবরণের ভেতরের রূঢ় বাস্তবটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ORF)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা—‘টুওয়ার্ডস সাসটেইনেবল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ সিটিজ: দ্য কেস অফ কলকাতা’—এই শহরের সার্বিক বিকাশ ও রূপান্তরের ওপর এক গুরুত্বপূর্ণ আলো ফেলেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের ১১ নম্বর বুনিয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG 11) প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে গবেষণাটি একটি অত্যন্ত জরুরি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: কলকাতা কি সত্যিই সব শ্রেণির মানুষের বাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারছে, নাকি উন্নয়নের নামে চলছে এক পরিকল্পিত বিচ্ছিন্নতা?

ভৌগোলিক অসাম্য ও নাগরিক পরিষেবার বঞ্চনা

কলকাতার সামগ্রিক পৌর পরিকাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শহরের সুযোগ-সুবিধার বণ্টন কোনো অর্থেই সমদর্শী নয়। পানীয় জল, ভূগর্ভস্থ নিকাশি কিংবা আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক নাগরিক অধিকারগুলো ওয়ার্ড ও এলাকাভেদে ভীষণভাবে বৈষম্যমূলক। শহরের এক প্রান্তে যখন আকাশচুম্বী বিলাসবহুল আবাসন ও নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা নিশ্চিত হচ্ছে, তখন ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যকর পরিবেশ আজও অধরা। নিরাপদ শৌচাগার ও পর্যাপ্ত পরিস্রুত পানীয় জলের ঘাটতি কেবল একটি পরিকাঠামোগত ব্যর্থতা নয়; এটি আসলে শহরের আর্থ-সামাজিক বিভাজনের জীবন্ত প্রতিফলন। ফলে তিলোত্তমার ভূগোলে কিছু এলাকা আধুনিকতার আলোয় আলোকিত হলেও এক বিরাট অংশের মানুষের প্রতিদিনের জীবন লড়াইয়ে পর্যবসিত।

‘রিয়েল এস্টেট রাজ’, জেনট্রিফিকেশন ও শিকড়ছেঁড়া জীবন

গত কয়েক দশকে কলকাতার নগরায়ণের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে লাগামহীন আবাসন শিল্প। ‘উন্নয়ন’ ও ‘পুনর্বাসন’-এর মুখরোচক বিজ্ঞাপনের আড়ালে রাজনৈতিক ও জমি মাফিয়ার যৌথ আঁতাত ঐতিহ্যবাহী পাড়া সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানছে। দ্রুতগতির ‘জেনট্রিফিকেশন’ বা অভিজাতকরণের কোপে পড়ে শহরের শতাব্দীপ্রাচীন চেনা চালচিত্র আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। পুরোনো বাড়ি বা ঘিঞ্জি এলাকা ভেঙে যখন ঝাঁ-চকচকে আবাসন উঠছে, তখন স্থানীয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিঃশব্দে ঠাঁই হারাচ্ছে। তাদের বাধ্য হয়ে সরে যেতে হচ্ছে শহরের প্রান্তসীমায়, যেখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা কার্যত অপ্রতুল। ফলে শহরের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন চুরমার হচ্ছে এবং অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে শহর ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন কিছু ছোট ছোট এলাকা বিভক্ত হয়ে পড়ছে।

প্রকৃতির সংকেত: ‘নগরের পরিবেশ’ বনাম ‘নগরের বাস্তুতন্ত্র’

কলকাতার বুনিয়াদি ভবিষ্যতের পথে সবচেয়ে বড় অশনিসংকেত তার পরিবেশগত বিপর্যয়। আমরা এতদিন পরিবেশকে দেখেছি নিছক কিছু পার্কের সবুজায়ন বা রাস্তার ধারের কৃত্রিম সৌন্দর্যায়ন হিসেবে—গবেষকরা যাকে বলছেন ‘ইকোলজি ইন সিটিজ’। কিন্তু চরম অবহেলিত রয়ে গেছে ‘ইকোলজি অফ দ্য সিটি’ বা সমগ্র শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য। পূর্ব কলকাতার জলাভূমি (East Kolkata Wetlands)—যা শহরের প্রাকৃতিকভাবে নিকাশি জল পরিশোধন করে এবং বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে—আজ আবাসন ব্যবসার লোভে একটু একটু করে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত বর্জ্য নিষ্কাশন ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম খামতি। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের তলিয়ে যাওয়া কোনো নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক নিকাশিনালীর মুখ সিমেন্ট-কংক্রিটে বুজিয়ে দেওয়ার অবশ্যম্ভাবী ফল।

গতিহীন ট্রানজিট ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিবহন

আরও পড়ুন
বটতলা সাহিত্য ও ছাপাখানার সেই সোনালী দিন
এই বনেদি বাড়িতে কলাবউ-কে মা দুর্গা রূপে পুজো করা হয়! প্রতিমা নেই
কলকাতার এই রাজবাড়িতে বছরে তিনটে দুর্গাপুজো হয়!

একটি মানবিক শহরের প্রধান শর্ত হল স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদ নাগরিক সচলতা। কিন্তু কলকাতার বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থা যেন এক অচলাবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও সামগ্রিক সড়কের জায়গা সীমিত। ফলে তীব্র যানজট ও বিষাক্ত ধোঁয়া শহরবাসীর ফুসফুসকে প্রতিনিয়ত সংকুচিত করছে। যেখানে মেট্রো বা বাসের মতো সর্বজনীন গণপরিবহনকে আরও বেশি সমন্বিত ও সাশ্রয়ী করার প্রয়োজন ছিল, সেখানে সাধারণ পথচারীদের হাঁটার পরিসরটুকুও ফুটপাত বেদখল হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। সাইকেল বা পরিবেশবান্ধব বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার বদলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় তাদের নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে রাখা হচ্ছে, যা শহরের গতিশীলতাকে পরিবেশ ও মানুষ—উভয় দিক থেকেই প্রতিকূল করে তুলেছে।

সমাধান কোন পথে?

কলকাতা কেবল কংক্রিটের কাঠামো নয়; এ শহর বেঁচে থাকে তার বিচিত্র শ্রমজীবী মানুষ, সংস্কৃতির বহুত্ববাদ এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার ঐতিহাসিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। কলকাতাকে সত্যিকার অর্থে টেকসই ও সর্বজনীন করে তুলতে হলে: 

বাস্তবধর্মী তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা: কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, কেএমডিএ (KMDA) ও কেএমসি (KMC)-র মতো সংস্থাগুলোকে আধুনিক ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে নিকাশি ও গৃহনির্মাণ নীতি কার্যকর করতে হবে।

সবার জন্য সাশ্রয়ী আবাসন: আবাসন ব্যবসা যেন নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে শহরছাড়া না করে; বস্তি উন্নয়ন প্রকল্পে বাসিন্দাদের সেই জায়গাতেই পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

জলাভূমি ও সবুজের কঠোর আইনি সুরক্ষা: রামসার ক্ষেত্রভুক্ত পূর্ব কলকাতার জলাভূমি রক্ষা এবং পরিবেশ আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের রাজনৈতিক আপস বন্ধ করতে হবে।

জনবান্ধব পরিবহন নেটওয়ার্ক: হাঁটার মতো ফুটপাত, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন এবং মেট্রো-বাসের মধ্যে সমন্বিত টিকিট ও রুট ব্যবস্থার বিকাশ ঘটাতে হবে।

একটি শহরের আসল মহিমা তার উড়ালপুল বা বহুতল অট্টালিকায় মাপা যায় না; তার বিচার হয় সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক নাগরিকের ভালো থাকার ওপর। কলকাতা যদি এই উন্নয়ন-মরীচিকার ফাঁদ এড়িয়ে সময়োপযোগী পরিবেশ সচেতন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পথে না হাঁটে, তবে উন্নয়নের নামে সে কেবল তার শতাব্দীপ্রাচীন আত্মাকেই বিসর্জন দেবে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য