২৭শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ক্যাফে মাছি মারছে! ফের জমছে কফি হাউসের আড্ডাটাই?

কফি হাউজেই জমছে আড্ডা! Image: AI

ক্যাফে মাছি মারছে! ফের জমছে কফি হাউসের আড্ডাটাই?

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

এসপ্রেসো ছেড়ে খাঁটি আড্ডা! ঝাঁ-চকচকে ক্যাফে ফেলে কেন নর্থ কলকাতায় ফিরছে জেন-জি? চারশো টাকার ক্যাপুচিনো আর কাচের ঘরের মিঠে আলোয় মন ভরছে না তরুণ প্রজন্মের?

সাউথের দামি এসপ্রেসো বার ছেড়ে কেন কলেজ স্ট্রিট ও নর্থ কলকাতার পুরনো ক্যাফেতে ভিড় করছে জেন-জি? আধুনিক কফি শপ বনাম ঐতিহ্যের আড্ডা—তারুণ্যের এই নতুন ট্রেন্ডের ইন-ডেপথ বিশ্লেষণ।

মূল বিষয়

কাচের দেওয়াল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মৃদু গুঞ্জন, আর কার্ডবোর্ডের কাপে নামের বানান ভুল লেখা তিনশো টাকার ক্যাপুচিনো—গত এক দশক ধরে শহুরে তারুণ্যের হ্যাংআউট বলতে এটাই ছিল চেনা ছবি। ল্যাপটপ খুলে নিঃশব্দে ‘ওয়ার্ক ফ্রম ক্যাফে’ বা ইনস্টাগ্রামের জন্য পারফেক্ট ফ্রেমের সেলফি। আধুনিক কফি শপ ছেড়ে কেন তরুণ প্রজন্ম নর্থ কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘আড্ডা’ ও ক্যাফেগুলোতে ফিরছে? উত্তরটা আপনারও জানা নেই, তাই তো? চলুন, খোঁজা যাক।

হাওয়া কি উল্টো বইতে শুরু করেছে?

সাউথ বা সল্টলেকের কাচঘেরা এসপ্রেসো বারের একঘেয়েমি ছেড়ে আজকের তরুণ প্রজন্ম—যাদের জেন-জি বা মিলেনিয়াল বলে দেগে দেওয়া হয়—তারা হঠাৎ দল বেঁধে উত্তর কলকাতার সরু গলিতে ভিড় জমাচ্ছে কেন? কেন সাউথের রুফটপ লাউঞ্জের চেয়ে কলেজ স্ট্রিটের ইন্ডিয়ান কফি হাউস, কিংবা হাতিবাগান-শ্যামবাজারের শতাব্দীপ্রাচীন চেনা কাঠের টেবিলগুলো আজ আবার বিশ-বাইশ বছরের ছেলেমেয়েদের আড্ডায় গমগম করছে?

উত্তরটা স্রেফ সস্তায় পেটপুজো নয়। এর শিকড় অনেক বেশি গভীর—নস্টালজিয়া, আত্মিক টান আর এক নিখাদ স্বাধীনতার খোঁজে।

১. ওয়াই-ফাইয়ের কৃত্রিম আবহ বনাম রক্তমাংসের মানুষের আড্ডা

আধুনিক চেইন ক্যাফেগুলো ডিজাইন করাই হয় আপনাকে একটা অদৃশ্য দূরত্বে রাখার জন্য। সেখানে ব্যাকগ্রাউন্ডে জ্যাজ বা লো-ফাই মিউজিক বাজে ঠিকই, কিন্তু নিজের টেবিলে বসে পাশের টেবিলের মানুষের সাথে কথা বলা যায় না। ল্যাপটপের নীল আলোয় সবাই সেখানে এক-একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

উত্তর কলকাতার ক্যাফে বা কেবিনের চালচিত্র একেবারেই আলাদা। এখানে টেবিল শেয়ার করাটা কোনো অপরাধ নয়, বরং সংস্কৃতি। কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের উঁচু সিলিং আর বনবন করে ঘোরা বিশাল পাখার নিচে অচেনা একজনের পাশে বসে ধোঁয়া ওঠা কফি আর ইনফিউশন খেতে খেতেই শুরু হয়ে যায় সিনেমা, রাজনীতি কিংবা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে তুমুল তর্ক। তরুণ প্রজন্ম আজ সেই স্ক্রিন-নির্ভর একাকিত্ব থেকে মুক্তি চাইছে। তারা এমন একটা স্পেস খুঁজছে যেখানে পাশের মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে হাসা যায়, টেবিল চাপড়ে যুক্তি সাজানো যায়—কাচের ঘরের কৃত্রিম ভদ্রতা মেনে নিচু গলায় ফিসফিস করতে হয় না।

২. মেনুর জটিলতা নয়, প্লেটে ঐতিহ্যের খাঁটি স্বাদ

আমেরিকানো, কর্টাডো নাকি ফ্ল্যাট হোয়াইট—আধুনিক ক্যাফেতে ঢুকলে কফির নাম সিলেক্ট করতেই অর্ধেক এনার্জি শেষ হয়ে যায়। তার ওপর সেই খাবারের স্বাদ প্রায় সর্বত্র একরকম কৃত্রিম।

নর্থ কলকাতার কেবিন আর ঐতিহ্যবাহী ক্যাফেগুলোতে সেই মেকি আড়ম্বর নেই। এখানে আজও মেনু কার্ড মানে স্মৃতি আর খাঁটি বাঙালিয়ানা:

আরও পড়ুন
ছানা কাটানোই ছিল ‘পাপ’! বাঙালির মিষ্টি-বিপ্লবের অজানা গপ্পো
বেনারসে যাবেন? এই ভুলগুলো করবেন না!
একঘেয়ে দার্জিলিং? সস্তায় পাহাড় ঘুরুন এই ৫ রুটে!
  • মিত্র ক্যাফের ডায়মন্ড ফিশ ফ্রাই আর মগজ কষা।
  • দিলখুশা কেবিনের ডিমের ডেভিল আর কবিরাজি।
  • ফেভারিট কেবিনে বসে কাঠের বেঞ্চে পা তুলে এক কাপ কড়া চা আর লেমন বিস্কুট।

এই খাবারগুলোর কোনো কৃত্রিম প্যাকেজিং নেই। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা সেই খাঁটি সর্ষের তেলের ঝাঁঝ, বিট নুনের গন্ধ আর কড়া স্বাদের ব্ল্যাক কফি—তরুণদের কাছে কেবল ‘ফুড’ নয়, আস্ত একটা কালচারাল স্টেটমেন্ট।

৩. পকেটের স্বস্তি: বিলাসিতা নয়, দৈনন্দিন আড্ডার আশ্রয়

যে কোনো তরুণ, বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া বা যারা সদ্য চাকরিতে ঢুকেছে, তাদের কাছে ক্যাফে কেবল শনিবারের বিলাসিতা নয়—রোজকার স্ট্রেস বাস্টার। সাউথের একখানা বড় ব্র্যান্ডের কফি শপে এক কাপ কফি আর একটা ব্রাউনি খেলেই পকেট থেকে খসে যায় ৫০০-৭০০ টাকা। সপ্তাহে তিন দিন বসলে পকেট ফাঁকা।

অথচ নর্থ কলকাতার ট্র্যাডিশনাল ক্যাফেগুলোতে আড্ডা দিতে কোনো ‘এন্ট্রি ফি’ বা ন্যূনতম বিলের চাপ নেই। কফি হাউসে ২০-৩০ টাকার ইনফিউশন আর এক প্লেট পকোড়া নিয়ে চার ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। ওয়েটার এসে তাড়া দেবে না, বিল ধরিয়ে দিয়ে টেবিল খালি করার ইঙ্গিত করবে না। এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আর উদার পরিবেশ আজকের তরুণদের কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা।

৪. ইনস্টাগ্রাম বনাম ‘ভিন্টেজ অ্যাস্থেটিক্স’: মেকি ফ্রেমের ক্লান্তি

সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে কৃত্রিম নিয়ন সাইন, প্যাস্টেল রঙের দেওয়াল আর সাজানো ক্যাকটাসের টব দেখে আজকের প্রজন্ম ক্লান্ত। তারা খুঁজছে ‘র’ (Raw) এবং খাঁটি সত্যতা।

উত্তর কলকাতার লাল মেঝের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, খড়খড়ি দেওয়া পেল্লায় জানলা, পলেস্তারা খসা পুরনো দেওয়াল, মার্বেল টপের টেবিল আর কাঠের পুরনো নকশাদার চেয়ার—এর চেয়ে বড় ‘ভিন্টেজ অ্যাস্থেটিক্স’ আর কী হতে পারে? নর্থের ক্যাফেগুলোতে ক্যামেরা তাক করলে কোনো কৃত্রিম ফিল্টারের প্রয়োজন পড়ে না; ইতিহাস নিজেই ফ্রেমের ভেতরে আলো হয়ে ধরা দেয়।

শিকড়ের কাছে ফেরা

আধুনিকতা কাউকে ফিরিয়ে দেয় না, কিন্তু আধুনিকতার মেকি চটক একটা সময়ের পর মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে। কাচের দেওয়ালে ঘেরা ঝাঁ-চকচকে ক্যাফেগুলো হয়তো স্ট্যাটাস সিম্বল হতে পারে, কিন্তু উত্তর কলকাতার আড্ডাগুলো একটা অনুভূতি।

আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন সাইলেন্ট করে পুরনো কাঠের টেবিলে বসে কফির কাপে তুফান তুলছে, তখন বুঝে নিতে হবে—বাঙালির আড্ডা মরেনি। সে শুধু কর্পোরেট এসপ্রেসোর মোহ কাটিয়ে আবার তার নিজের ঘরের দাওয়ায়, নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে এসেছে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়

সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য