৮ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

কমলা বাসিন: প্রতিবাদের কণ্ঠ, পরিবর্তনের কবিতা

কমলা বাসিন: প্রতিবাদের কণ্ঠ, পরিবর্তনের কবিতা

kamla bhasin

কমলা বাসিন: প্রতিবাদের কণ্ঠ, পরিবর্তনের কবিতা

calender icon 2 ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬

আজ জন্মদিন

“আমি নারী, তাই আমি সম্মানের যোগ্য” - এই উচ্চারণ কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি এক বিপ্লবের সূচনা। আর সেই বিপ্লবের যিনি মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি হলেন - কমলা বাসিন।

ভারতের নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে কমলা বাসিন এমন এক নাম, যাঁর কাজ ও চিন্তা সীমান্ত পেরিয়ে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে নাড়া দিয়েছে। নিজেকে তিনি 'মধ্যরাত্রি প্রজন্ম' বলে উল্লেখ করতেন। আসলে ভারত ভাগের সময়ে যাদের জন্ম তাঁরা নিজেদের প্রজন্মকে এইভাবেই অভিহিত করেন। ১৯৪৬ সালের ২৪শে এপ্রিল রাজস্থানে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই প্রখর মননশীল নারী তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন লিঙ্গসমতা ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

মাটি থেকে উঠে আসা এক কণ্ঠস্বর

বাসিন রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি গ্রহনের পর ফেলোশিপ নিয়ে পশ্চিম জার্মানির ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘উন্নয়নে সমাজবিজ্ঞান’ নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। উচ্চশিক্ষা লাভের পর তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইউনাইটেড নেশন-এর বিভিন্ন প্রকল্পে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ অংশে নারী, শিশু ও প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নের কাজে অংশগ্রহণ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, ধর্ষণ ও যৌন হিংসার বিরুদ্ধে পৃথিবীব্যাপী তৈরি হওয়া - ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইসিং’ ক্যাম্পেইনের দক্ষিণ এশিয়ার দ্বায়িত্বভার সামলেছেন বাসিন। তবে শুধুমাত্র কাগজে-কলমে উন্নয়ন কিংবা প্রতিবাদ নয়, তিনি বিশ্বাস করতেন বাস্তব পরিবর্তন আসে মানুষের চিন্তার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।

সহজ ভাষায় জটিল তত্ত্ব

নারীবাদকে একাডেমিক গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছিলেন কমলা। তাঁর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয় - “কিঁউকি ম্যায়  লড়কি হুঁ, মুঝে পঢ়না হ্যায়’ -এর মতো কবিতা। ইংরেজি ভাষায় তাঁর লেখা “What is Patriarchy?”, “Understanding Gender” কিংবা “Exploring Masculinity” এবং হিন্দি ভাষায় বিন্দিয়া থাপার-এর সাথে যৌথ ভাবে লেখা - “হসনা তো সংঘর্ষকে দিন মে ভি জরুরী হ্যায়”  -এর মতো বইগুলোতে তিনি পিতৃতন্ত্র ও লিঙ্গবৈষম্যের মতো জটিল বিষয়কে ব্যাখ্যা করেছেন অত্যন্ত সহজ ও প্রাণবন্ত ভাষায়। ফলে তাঁর লেখা যেমন তথ্যসমৃদ্ধ, তেমনই পাঠকের জন্য হয়ে উঠেছে সহজবোধ্য। তাঁর লেখা - “Borders & Boundaries: Women in India's Partition’ -এর মতো বইয়ে উঠে এসেছে দেশভাগ, জাতিপ্রথা, ব্রাহ্মণ্যবাদ, নারী বৈষম্য -  কীভাবে প্রতীয়মান এবং দেশের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় এইগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। পাশাপাশি কমলা বাসিন শিশুদের জন্য ’লাল পরী’, ‘ধমক ধম’ -এর মতো মজার ছড়া ও কবিতার বই রচনা করেছেন, যেখানে তারা একেবারে সাবলীল ভাষায় লিঙ্গ, নারীবাদ এবং পিতৃতন্ত্র সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।

সংগঠন, সংহতি ও সংগ্রাম

কমলা বাসিন ছিলেন একজন অসাধারণ সংগঠক। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘সঙ্গত’ দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী আন্দোলনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এই সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের নারী অধিকারকর্মীরা একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা নারী স্বাধীনতার এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এরই সাথে রাজস্থানে ‘সেবা মন্দির’’-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার সুবাদে ভারতভূমিতে জল, জঙ্গল, জমি, আদিবাসী অধিকার ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা - ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীবাদ কোনো একক দেশের বিষয় নয়; এটি এক আন্তঃসীমান্ত মানবাধিকার আন্দোলন আর যার সাথে গভীর ভাবে জড়িয়ে আছে একজন প্রান্তিক মানুষের জীবন, জীবিকা ও বেঁচে থাকার প্রশ্ন এবং স্বাধীন নাগরিক অধিকার। তবে  শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয় - গান, কবিতা ও নাটকের মাধ্যমে তিনি আন্দোলনকে মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। তাঁর কণ্ঠে নারীবাদ হয়ে উঠত এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। ফলে সাধারণ মানুষও সহজে এই আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পেরেছে।

স্বীকৃতি ও সম্মান

কমলা বাসিন কখনও পুরস্কারের জন্য কাজ করেননি, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানে  তাঁর অসামান্য অবদান বিভিন্ন স্তরে স্বীকৃত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান তাঁকে নারী অধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সম্মানিত করেছে। তবে যেদিন অন্তত ভারতবর্ষে নারী তথা সাধারণ মানুষের সামাজিক ন্যায় ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে সেইদিন হয়তো আমরা তাঁকে প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন করতে পারবো।

উত্তরাধিকার 

তিনি বিশ্বাস করতেন-পুঁজিবাদী ও পশ্চিমী পরিসর নয় বরং এই ভারতবর্ষের শিকড়েই লুকিয়ে আছে মুক্তির গান। ২০২১ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর  তাঁর প্রয়াণ ঘটে, কিন্তু তাঁর চিন্তা ও আদর্শ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আজকের সমাজে যখন লিঙ্গবৈষম্য ও সহিংসতা এখনও বিদ্যমান, তখন কমলা বাসিন আমাদের শিখিয়ে যান -পরিবর্তন শুরু হয় প্রশ্ন থেকে, আর সেই প্রশ্নই মুক্তির পথ দেখায়।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
সৌরীশ পান্ডে ঋষি

সৌরীশ পান্ডে ঋষি

জন্ম মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে। সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা। সময় কাটে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। বর্তমানে লেখালিখি, ডিজিটাল কন্টেন্ট এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কর্মব্যস্ত।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য