

হেরিটেজ হোমস্টে-এর প্রতীকী ছবি - AI
বাংলার পুরনো জমিদারবাড়ি বা রাজবাড়িকে আধুনিক লাক্সারি হোমস্টেতে রূপান্তরিত করার এবং সেগুলোতে পর্যটকদের ছুটে যাওয়ার মূল হুক পয়েন্ট হল স্টোরিটেলিং বা ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি। ফাইভ স্টার হোটেলের চার দেওয়ালের আলাদা কোনও গল্প থাকে না। কিন্তু এই বাড়িগুলোর ইট কাঠ পাথরে মিশে আছে শত শত বছরের ইতিহাস। এর আকর্ষণ ঐতিহ্য ও নস্টালজিয়া প্রেমী বাঙালির কাছে অত্যন্ত বেশি।
সকালবেলা মোবাইলের অ্যালার্মের বদলে যদি শাঁখের আওয়াজে ঘুম ভাঙে? তাও আবার সেগুন কাঠের তৈরি পেল্লায় এক চারপায়া পালঙ্কে শুয়ে (খাট নয়, পালঙ্ক'ই)! চোখ খুলেই দেখলেন মাথার উপর ঝুলছে পুরনো দিনের বিশাল ঝাড়বাতি আর টানা পাখা। ঘরের বাইরে পা রাখতেই চোখে পড়ল বিরাট এক ঠাকুর দালান, খিলানযুক্ত টানা বারান্দা আর রোদে ভাসছে কয়েকশো বছরের পুরনো ইটের দেওয়াল। এরপর দুপুরে খেতে বসে দেখলেন রুপোর থালায় পরিবেশন করা হয়েছে ধোঁয়া ওঠা গোবিন্দভোগ চালের পোলাও আর মটন ডাকবাংলো। কেমন হবে?
শুনতে কোনও ঐতিহাসিক সিনেমার দৃশ্য মনে হলেও, এটা এখন আর নিছক কল্পনা নয়। উইকেন্ডের ছুটিতে কয়েকদিনের জন্য রাজা বা জমিদার পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠার সুযোগ এখন আপনার হাতের মুঠোতেই। আম বাঙালির রাজকীয় ফ্যান্টাসি আর নস্টালজিয়াকে পুঁজি করেই বাংলার পর্যটন মানচিত্রে এক নতুন বিপ্লব শুরু হয়েছে। কংক্রিটের শহর থেকে পালিয়ে দু'দণ্ড শান্তির খোঁজে মানুষ এখন সপ্তাহের শেষে একটু অন্যরকম ছুটি কাটাতে চাইছেন। আর সেই চাহিদার কথা মাথায় রেখেই রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি এবং জমিদার বাড়িগুলো একে একে সেজে উঠছে বিলাসবহুল হোমস্টে বা হেরিটেজ হোটেল হিসাবে।
বিশাল জায়গা জুড়ে থাকা এই বিশাল প্রাসাদ বা বাড়িগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা বর্তমান প্রজন্মের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছিল। দেওয়াল খসে পড়ছিল, বট অশ্বত্থের শিকড়ে ঢাকা পড়ছিল অতীত। একদিকে যেমন বিপুল খরচ আছে তেমনই পরিবারের সদস্যরা অনেকেই কর্মসূত্রে বিদেশে বা ভিনরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের শিকড় আর ঐতিহ্যকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে অনেকেই বাণিজ্যিকীকরণের পথ বেছে নিয়েছেন। স্থাপত্যের পরিভাষায় যাকে বলে 'অ্যাডাপ্টিভ রিইউজ'।
অর্থাৎ পুরনো খোলসটিকে সযত্নে অবিকৃত রেখে ভেতরটাকে পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আধুনিক করে তোলা। বাড়ির মূল কাঠামো, চুন সুরকির গাঁথনি বা পুরনো দিনের আসবাবপত্র ঠিক রেখে সেখানে আধুনিক বাথরুম, ওয়াইফাই বা সুইমিং পুল যোগ করা হয়েছে বা হচ্ছে। এই ভাবেই পুরনো জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়িগুলির একাংশের আমূল রূপান্তর ঘটেছে।
পুরনো একটি ভগ্নপ্রায় প্রাসাদকে আধুনিক লাক্সারি প্রপার্টিতে পরিণত করতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। এই বিপুল বিনিয়োগ তুলতে এবং রক্ষণাবেক্ষণ বজায় রাখতে এগুলির ভাড়াও রাখা হয় প্রিমিয়াম স্তরে। এক রাতের জন্য এখানে থাকতে গেলে সাধারণত ৬ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হয় পর্যটকদের। তবে শুধু ঘর ভাড়াই নয়, সিনেমা বা সিরিয়ালের শুটিং এবং ডেস্টিনেশন ওয়েডিং থেকেও মোটা অঙ্কের রাজস্ব আসে প্রপার্টিগুলোর।
এই পরিবারগুলির ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির বিষয়টি পাশে সরিয়ে রাখলে এর সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি হল, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ। এই রাজবাড়ি বা জমিদারবাড়িগুলো মূলত গ্রাম বা মফস্বল এলাকায় অবস্থিত। ফলে এগুলি লাক্সারি হোমস্টেতে রূপান্তরিত হওয়ায় এখানে এলাকার মানুষ সরাসরি কাজ পাচ্ছেন। কেউ রাঁধুনি, কেউ নিরাপত্তারক্ষী আবার কেউ হাউসকিপিংয়ের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষিজাত পণ্য এবং হস্তশিল্পেরও দারুণ কদর বাড়ছে পর্যটকদের কাছে। কারণ এই হোমস্টেতে থাকতে এসে অনেকেই সকালের দিকে বা বিকেলের দিকে আশেপাশের এলাকা ঘুরে দেখেন। তাঁদের সঙ্গে স্থানীয়দের কথা হয় এবং সেখানেকার বৈশিষ্ট্যযুক্ত কিছু পেলে অনেক সময় তাঁরা সেগুলো কিনে নিয়ে যান।
মূলত উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষজন, যারা কোলাহলমুক্ত পরিবেশে এক্সক্লুসিভ অভিজ্ঞতা খোঁজেন, তারাই এখানে ভিড় জমান। পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালি এবং বিদেশি পর্যটকরাও বাংলার হারিয়ে যাওয়া নিজস্ব সংস্কৃতিকে চাক্ষুষ করতে এখানে ছুটে আসেন।
রাজস্থানের প্রাসাদের মতো অত খরচ না করেই যদি বাংলার বুকেই রাজকীয় আবহে বিয়ে করা যায়, তবে তো কথাই নেই। আর তাই বর্তমানের ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের ট্রেন্ডের হাত ধরে প্রতিবছর বিয়ের মরশুমে নিয়ম করে মোটা অঙ্কের রোজগার হয় এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলিতে গড়ে ওঠা হোমস্টেগুলোর। কারণ অনেকেই এখানে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করেন। এতে কম খরচে এক ধরনের রাজকীয় পরিবেশে বিয়ে করার সাধ বা শখ পূরণ করা সহজেই সম্ভব হয়।
তবে এগুলির আকর্ষণের ও চাহিদার মূল হুক পয়েন্ট হল স্টোরিটেলিং বা ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি। ফাইভ স্টার হোটেলের চার দেওয়ালের আলাদা কোনও গল্প থাকে না। কিন্তু এই বাড়িগুলোর ইট কাঠ পাথরে মিশে আছে শত শত বছরের ইতিহাস। অনেক সময় এগুলিতে যারা আসেন তাদের সঙ্গে ওই পুরনো জমিদার বা রাজবাড়ির কোনও সদস্য নিজেই হয়ত বসে পারিবারিক ঐতিহ্য নিয়ে গল্প করেন, অনেক অজানা ঘটনা শোনান। এর আকর্ষণ ঐতিহ্য ও নস্টালজিয়া প্রেমী বাঙালির কাছে অত্যন্ত বেশি।
এছাড়াও কাঁসা-পিতলের বাসনে ডাব চিংড়ি, মটন ডাকবাংলো বা গোবিন্দভোগ চালের পোলাও খাওয়ার অভিজ্ঞতা মানুষকে দারুণভাবে টানে। অনেকেই এর মধ্যে ক্ষনিকের জন্য হলেও এক ধরনের আলাদা আভিজাত্যবোধ অনুভব করেন। তার জন্য মোটা টাকা খরচ করতেও দ্বিধা করেন না।
পুরনো জমিদারবাড়ি বা রাজবাড়িকে রূপান্তর করে আজকের দিনে আধুনিক লাক্সারি হোমস্টেতে পরিণত করা হয়েছে, এমন জনপ্রিয় ৯টি জায়গার সন্ধান আপনাদের কাছে তুলে ধরা হল-
দ্য রাজবাড়ি বাওয়ালি: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাওয়ালিতে অবস্থিত মণ্ডল জমিদারদের এই বাড়িটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো। একসময় এটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে এটিকে নিখুঁতভাবে সংস্কার করে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সেরা বিলাসবহুল হেরিটেজ রিসর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে রাজকীয় অন্দরমহল, বিশাল দালান, আধুনিক সুইমিং পুল এবং খাঁটি বাঙালি খাবারের দারুণ ব্যবস্থা আছে।

ইটাচুনা রাজবাড়ি: হুগলির পান্ডুয়ার কাছে অবস্থিত এই বাড়িটি 'বর্গী ডাঙা' নামেও পরিচিত। ১৭৬৬ সালে কুণ্ডু পরিবারের তৈরি এই বিশাল বাড়িতে বর্গীরা হামলা করেছিল। সেই দুরন্ত ইতিহাস এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেটাকেই এখন অন্যতম বিলাসবহুল হোমস্টেতে পরিণত করা হয়েছে। এখানকার সাবেকি সাজসজ্জা এবং সন্ধ্যায় ঠাকুর দালানে আরতির পরিবেশ এখানে আসা পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
বাড়ি কোঠি: মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই হেরিটেজ বুটিক হোটেলটি একেবারে অন্যরকম। আঠারো শতকের এই বাড়িতে বাংলার জমিদার এবং রাজস্থানি শেঠদের স্থাপত্যের অপূর্ব মেলবন্ধন চোখে পড়ে। এখানকার মূল আকর্ষণ হল গঙ্গার ঘাটে সূর্যাস্ত দেখা এবং সম্পূর্ণ স্থানীয় রাজস্থানি ও বাঙালি মিশেলের নিরামিষ পদের স্বাদ নেওয়া। উল্লেখ্য, এটি গড়ে তুলেছিলেন রাজস্থানের শেঠরা। তাই এখানে এলে পর্যটকরা এক টুকরো রাজস্থানি সংস্কৃতির ছোঁয়া ভালোভাবেই পাবেন।

আমাদপুর রাজবাড়ি: পূর্ব বর্ধমানের চৌধুরী পরিবারের এই রাজবাড়িটি প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। এটি সম্পূর্ণ এক শান্ত গ্রামীণ পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত। এখানে রয়েছে একাধিক প্রাচীন দিঘি এবং টেরাকোটার মন্দির। সাবেকি বাঙালি আতিথেয়তার জন্য এটি দারুণ জনপ্রিয়।
মহেশগঞ্জ এস্টেট (বালাখানা): নদিয়া জেলার মায়াপুরের কাছে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক বাড়িটি একসময় নীলকর সাহেবদের কুঠি ছিল। পরে তা পালচৌধুরী জমিদারদের হাতে আসে। এর ফরাসি স্থাপত্য এবং লম্বা খড়খড়ির জানালাযুক্ত বারান্দা পর্যটকদের এক অন্যরকম শান্ত পরিবেশে বিশ্রামের সুযোগ করে দেয়।
ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি: মল্লদেব রাজপরিবারের এই প্রাসাদে ইতালীয় ও মুসলিম স্থাপত্যের দারুন মেলবন্ধন রয়েছে। বিশাল এই প্রাসাদের নিচের তলা এবং অতিথিশালাটিকে বর্তমানে একটি বিলাসবহুল হেরিটেজ হোটেলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দফতরের সহায়তায় পরিচালিত হয়। এখানে এসে থাকা মানে ঐতিহ্যের পাশাপাশি জঙ্গলমহলে আদিমতার ছোঁয়া পাওয়া।
কাশিমবাজার রাজবাড়ি: মুর্শিদাবাদের রায় বাহাদুর পরিবারের এই বিশাল রাজবাড়িতে ইউরোপীয় ও দেশীয় স্থাপত্যের স্পষ্ট ছোঁয়া রয়েছে। ইতিহাস বিজড়িত এই প্রাসাদের একটি অংশকে অত্যন্ত যত্নসহকারে সংস্কার করে বিলাসবহুল গেস্টহাউস হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মহিষাদল রাজবাড়ি: পূর্ব মেদিনীপুরে অবস্থিত গর্গ পরিবারের এই রাজবাড়ির ফুলবাগ নামক অংশটিতে বর্তমানে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজবাড়িতে থাকার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এখানে একটি মিউজিয়ামও রয়েছে, যা পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
ক্যালকাটা বাংলো: এটি ঠিক রাজবাড়ি না হলেও কলকাতার ঐতিহ্যকে দারুণভাবে বহন করছে। উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারে ১৯২০ সালের একটি ঐতিহ্যবাহী টাউনহাউসকে নিখুঁতভাবে সংস্কার করে লাক্সারি হেরিটেজ হোমস্টে তৈরি করা হয়েছে। এখানে এলে তৎকালীন জমিদারি ও বনেদি কলকাতার স্বাদ চেটেপুটে উপভোগ করতে পারবেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
