

দিয়েগো ফোরলান যখন টেনিস প্লেয়ার। ছবি - Google
দিয়েগো ফোরলান এমন একজন তারকা, যিনি ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা ফিফা বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাই হননি, পাশাপাশি তিনি যতদিন খেলেছেন, ততদিনই তিনি ছিলেন সমর্থকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে।
তাঁকে দেখতেই হলিউড নায়কদের মতো। অনেকটা তাঁকে দেখতে টেনিসের কিংবদন্তি বিয়ন বর্গের মতোও লাগে। সেই দিয়েগো ফোরলান শহর কলকাতায় সপ্তাহ দুয়েক কাটিয়ে ফের উরুগুয়ে দল নিয়ে মন্টিভিডিও উড়ে গেলেন। রেখে গেলেন বহু স্মৃতি, ভারতকে ৬-১ গোলে হারানোর পরে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে তাঁর চেয়ারও খানিকটা মজবুত হল।
দিয়েগো ফোরলান এমন একজন তারকা, যিনি ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা ফিফা বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাই হননি, পাশাপাশি তিনি যতদিন খেলেছেন, ততদিনই তিনি ছিলেন সমর্থকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে। তাঁর জন্ম ১৯৭৯ সালের ১৯মে রাজধানী মন্টিভিডিও সংলগ্ন কারাস্কো নামক স্থানে। তাঁদের একান্নবর্তী পরিবার ছিল। বাবা-মা, তিন ভাই, এক বোন, কাকার চার সন্তান, দাদু-দিদিমা ও দিদিমারও বোন তাঁদের সঙ্গেই থাকতেন।
ফোরলান নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘‘কারাস্কো সেইসময় এখনকার মতো এত জনবহুল ছিল না। আমরা ভাইরা মিলে রাস্তাতেই ফুটবল, টেনিস খেলতাম। কোনও সমস্যাই হতো না।’’ ফোরলান ফুটবলের চেয়ে বেশি টেনিসই খেলতেন। ক্যাম্বিস বলকে ভিজিয়ে তাঁর ফোরহ্যান্ড, ব্যাকহ্যান্ড সেইসময় বন্ধুমহলে বেশ সমাদৃত ছিল। ফোরলানরা যেহেতু খুবই সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন, সেই কারণে তাঁদের পড়াশুনো নিয়ে বেশ কঠোর ছিলেন বাবা-মা। ফোরলান রীতিমতো ভাল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশুনো করেছেন। তাঁর ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল স্প্যানিশ এবং সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল ইংরাজি। যে কারণে এই নামী প্রাক্তন উরুগুয়ান স্ট্রাইকারের ইংলিশ বেশ সমৃদ্ধ।
ফোরলানের ছোটবেলার জীবন বেশ সুন্দর কাটছিল। কিন্তু আচমকা তাঁদের পরিবারে ঘনিয়ে আসে এক ভয়ঙ্কর বিপদ। ১৯৯১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, ফোরলানের বোন আলেহান্দ্রা একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন এবং অবশেষে পঙ্গু হয়ে যান। যে দুর্ঘটনায় তাঁর প্রেমিকের মৃত্যু হয়। চিকিৎসার বিপুল খরচ তাঁদের পরিবারকে আর্থিক সঙ্কটে ফেলে দিয়েছিল। সেইসময় ফোরলানরা পাশে পেয়েছিলেন দিয়েগো মারাদোনাকে। তাঁর তহবিল থেকে ফোরলানদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করা হয়।
এই পর্বে ফোরলান বেশি টেনিসের প্রতি নিবেদিন প্রাণ ছিলেন। তিনি যত না বেশি ফুটবল খেলতেন, তারচেয়েও বেশি টেনিসে দক্ষ ছিলেন। তাঁর আদর্শের টেনিস তারকা হলেন বরিস বেকার ও স্টিফেন এডবার্গ। ফোরলান এখনও টেনিস কোর্টে নামলে রীতিমতো ঝড় তোলেন। কিন্তু তাঁর পরিবার সিদ্ধান্ত নিল টেনিস খেলে দ্রুত উন্নতি হওয়ার চেয়ে ফুটবল বেশি এগিয়ে দেবে তাঁকে। সেই থেকেই বাবা-দাদার মতোই তিনিও ফুটবলে বেশি মনোযোগী হলেন। ছোট বোনের চিকিৎসা খাতে যা খরচ হয়েছিল, তাতে তাঁর পরিবারে সঙ্কট দেখা দেয়, ফোরলানের ফুটবলার উত্তরণের এটাও একটা কারণ ছিল।
ভারতীয় ফুটবল সম্পর্কে আগেই ধারণা ছিল ফোরলানের। তিনি আইএসএলে মুম্বই সিটি এফসি-র হয়ে খেলতে এসেছিলেন, সেইসময় সেই দলে খেলতেন সুনীল ছেত্রীও। সেবার বন্ধু সুনীলকে ভারতীয় দলের উন্নতির রুটম্যাপ দিয়ে গিয়েছিলেন এই মহাতারকা। এবারও তিনি সিটি অফ জয়-তে এসে ওই বিষয়ে আলোকপাত করে গিয়েছেন।
ভারতীয় দলের রোগ সারানোর ফোরলানের সেই প্রেসক্রিপশনটা এরকম: শিকড় শক্ত করো, ফুটবল অ্যাকাডেমি গড়ে তোলো। একেবারে গোড়া থেকে ভিত শক্ত করতে হবে। উরুগুয়ে কোচের বক্তব্য, “প্রশ্নটি সহজ নয়। তবে শিকড় থেকে কাঠামো তৈরি করতে হবে। অ্যাকাডেমি গড়তে হবে। ছোট ছোট বাচ্চাদের আরও বেশি করে ফুটবল খেলতে হবে।” তাঁর মতে, “দেশজুড়ে অ্যাকাডেমির সংখ্যা বাড়লে লিগ আরও শক্তিশালী হবে। উঠে আসতে দেখা যাবে বহু প্রতিভাবান ফুটবলার। ঘরোয়া পরিকাঠামো মজবুত না হলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য পাওয়া অধরাই থেকে যাবে।”
ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ভারতীয় দলের ম্যাচ দেখেছেন ফোরলান। সেই ম্যাচ দেখার হিসেবে জানিয়েছেন, ভারতের খেলার মধ্যে উন্নতির ছাপ স্পষ্ঠ। তবে আরও হিসেব করে মাঠে নামতে হবে বিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে। প্ল্যান এ না খাটলে কী করে অন্য ছকে বাজিমাত করা যায়, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে কোচকেও। তার আগে সেই মতো অনুশীলনে সেগুলি রপ্ত করানোও জরুরী। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে ভিনিসিয়াসকে বারবার অফসাইড ট্র্যাপে ফেলার জন্য ভারতীয় ডিফেন্ডারদের প্রশংসা শোনা গিয়েছে ফোরলানের কথায়। তাঁর বিশেষ করে ভাল লেগেছে মনবীর সিং, সাহাল ও রায়ান উইলিয়ামসের খেলা।
মুম্বই সিটি এফসি-র হয়ে খেলার সময় সুনীল ছেত্রীর সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। এবারও তিনি সুনীলের খোঁজ করেছেন কলকাতার মিডিয়ার কাছে। সেবার রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামে অ্যাটলেটিকো দ্য কলকাতার বিরুদ্ধে জয়সূচক গোলও করেছিলেন ফোরলান। এবার কলকাতা সফরে সেই মাঠও দেখে এসেছেন তিনি। যদিও ওই আইএসএলের ফাইনালে ফোরলানকে লাল কার্ড দেখে বসে যেতে হয়। সেই কালো স্মৃতিও ভোলেননি এই মহাতারকা।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
