২৭শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
শিশুমনের নীরব সংকট! প্রতি সাতজনের একজন মানসিক সমস্যায়

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আশঙ্কা। ছবি - Google

শিশুমনের নীরব সংকট! প্রতি সাতজনের একজন মানসিক সমস্যায়

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

বিপর্যয় এড়াতে পরিবার ও স্কুলকে কী করতে হবে?

বাড়ি, স্কুল এবং সামাজিক পরিবেশ শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতিরিক্ত কঠোর শাসন, শারীরিক শাস্তি, বুলিং বা সহপাঠীদের হাতে নিয়মিত হেনস্থা এবং নিরাপত্তাহীন পরিবেশ শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুমনের নীরব সংকট রুখতে জরুরি পদক্ষেপের ডাক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার!

মূল বিষয়

শৈশবের হাসির আড়ালেও জমতে পারে উদ্বেগ, অবসাদ, একাকিত্বের মতো গভীর সমস্যা। কখনও পড়াশোনার চাপ, কখনও সহপাঠীদের হেনস্থা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব-বিভিন্ন কারণে বিপর্যস্ত হতে পারে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার লক্ষণ সামনে এলেও তা গুরুত্ব পায় না। কেউ ভাবেন, বয়সের ধর্ম; কেউ আবার শিশুর আচরণকে শুধুই জেদ বা অবাধ্যতা বলে উড়িয়ে দেন। এই অবহেলার পরিণতি সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তাই শিশু ও কিশোরদের মানসিক সুস্থতা রক্ষায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একযোগে উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)।

হু-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সি প্রতি সাত জনের মধ্যে এক জন কোনও না কোনও মানসিক সমস্যায় ভোগে। উদ্বেগ, অবসাদ এবং আচরণগত সমস্যা এই বয়সে অসুস্থতা ও অক্ষমতার অন্যতম কারণ। আরও উদ্বেগের বিষয়, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার প্রায় অর্ধেকের সূত্রপাত ঘটে ১৮ বছর বয়সের আগেই। অর্থাৎ, সমস্যাকে চিহ্নিত করে যথাসময়ে সহায়তা দেওয়া গেলে বহু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠার আগেই হস্তক্ষেপ করা সম্ভব।

কেন বাড়ছে উদ্বেগ?

কৈশোরে শরীর ও মনের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। নিজের পরিচয় তৈরি করা, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, পড়াশোনায় সাফল্য অর্জন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিষয় এই সময় মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় পারিবারিক অশান্তি, আর্থিক অনিশ্চয়তা, হিংসা, নির্যাতন কিংবা সহপাঠীদের হাতে অপমান, তা হলে সমস্যার ঝুঁকি আরও বাড়ে।

হু-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাড়ি, স্কুল এবং সামাজিক পরিবেশ শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতিরিক্ত কঠোর শাসন, শারীরিক শাস্তি, বুলিং বা সহপাঠীদের হাতে নিয়মিত হেনস্থা এবং নিরাপত্তাহীন পরিবেশ শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, পরিবারের সমর্থন, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ, সুস্থ বন্ধুত্ব এবং আবেগ সামলানোর দক্ষতা মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে সুরক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারে।

সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবও উপেক্ষা করার নয়। অন্যের সাজানো জীবনযাপনের ছবি দেখে নিজেকে ছোট মনে করা, অনলাইনে অপমানিত হওয়া, ক্রমাগত তুলনার মধ্যে থাকা কিংবা ঘুমের সময় কমে যাওয়া- এসবের প্রভাব পড়তে পারে কিশোর-কিশোরীদের মনে। তবে সব সমস্যার জন্য সামাজিক মাধ্যমকেই দায়ী করা যায় না। শিশুর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং সামাজিক পরিবেশ মিলিয়েই মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।

কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন অভিভাবকেরা?

শিশুর আচরণে হঠাৎ বা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা গেলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেমন—

১. আগে যে শিশু বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে ভালবাসত, সে হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে।

২. ঘুমের সময় বা খাওয়াদাওয়ার অভ্যাসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছে।

৩. সামান্য বিষয়েও অস্বাভাবিক রাগ, কান্না, ভয় কিংবা উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।

৪. পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাচ্ছে, স্কুলে যেতে অনীহা তৈরি হচ্ছে অথবা ফলাফলে আচমকা অবনতি হচ্ছে।

৫. নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলছে, নিজেকে অন্যদের কাছে বোঝা বলে মনে করছে কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করছে।

৬. বন্ধু, খেলাধুলো বা আগে পছন্দের কাজকর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

তবে এই লক্ষণগুলির এক বা একাধিক দেখা গেলেই যে শিশুর মানসিক অসুস্থতা হয়েছে, তা নয়। বয়সজনিত পরিবর্তন, শারীরিক অসুস্থতা বা সাময়িক চাপের কারণেও এমন আচরণ দেখা যেতে পারে। কিন্তু পরিবর্তনগুলি দীর্ঘদিন ধরে চললে, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে অথবা শিশু নিজেকে সামলাতে না পারলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

শিশুর কথা শুনুন, তাড়াহুড়ো করে উপদেশ নয়

মানসিক সমস্যার প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু কোনও উদ্বেগের কথা জানালে সঙ্গে সঙ্গে বকাঝকা করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা কিংবা ‘এত ছোট বয়সে আবার কীসের চিন্তা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং মন দিয়ে তার কথা শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং বিচার না করে পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন
ওসিডি পুরাণ
টানা বসে কাজ করেন? কোন রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে!
কীভাবে ওয়ার্ক ফ্রম হোমেও ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স করবেন?

পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিশু ভয় না পেয়ে নিজের সমস্যা বলতে পারে। পড়াশোনার ফলাফল বা প্রতিযোগিতার বাইরে তার পছন্দ, বন্ধুত্ব, ভয় এবং আনন্দের বিষয়েও নিয়মিত কথা বলা দরকার। শিশুকে সব সমস্যার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে, এমন নয়। অনেক সময় মন দিয়ে শোনাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় সহায়তা হয়ে ওঠে।

অভিভাবকদের নিজেদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে মতবিরোধ হলে তা কী ভাবে সামলানো হচ্ছে, রাগের সময় কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে কিংবা ব্যর্থতার পর পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন- এসব দেখে শিশুরা আবেগ সামলানোর পদ্ধতি শেখে। তাই ভুল করলে শাস্তি দেওয়ার বদলে ভুল থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

স্কুলেও প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা

শিশু-কিশোরদের দিনের বড় অংশ কাটে স্কুলে। তাই শিক্ষকদের শুধু পড়াশোনার অগ্রগতি নয়, পড়ুয়ার আচরণ এবং মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের দিকেও নজর রাখতে হবে। সহপাঠীদের হাতে হেনস্থা, দল থেকে কাউকে বাদ দেওয়া, অনলাইন বুলিং কিংবা শিক্ষকের সামনে অপমানিত হওয়ার মতো ঘটনা দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বয়সোপযোগী আলোচনা, আবেগ সামলানোর শিক্ষা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সহপাঠীদের প্রতি সহমর্মিতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থাও থাকা দরকার। কোনও পড়ুয়া সমস্যার কথা জানালে তাকে শাস্তি দেওয়া বা অন্যদের সামনে বিব্রত করা চলবে না। তার গোপনীয়তা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

হু-র পরামর্শ, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার উদ্যোগ কেবল চিকিৎসাকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পরিবার, স্কুল, সমাজ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে হবে। সমস্যার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি এমন পরিবেশ গড়ে তোলাও জরুরি, যাতে মানসিক সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমে।

কী করণীয়, হু-র পরামর্শ

শিশু ও কিশোরদের মানসিক সুস্থতা রক্ষায় কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

প্রথমত, ছোটবেলা থেকেই আবেগ চেনা এবং তা প্রকাশ করার সুযোগ দিতে হবে। দুঃখ, ভয়, রাগ কিংবা হতাশা অনুভব করা অস্বাভাবিক নয়—এই ধারণা শিশুর মনে তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, সমস্যা হলে কী ভাবে সাহায্য চাইতে হয়, তা শেখানোও জরুরি।

দ্বিতীয়ত, নিয়মিত ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা, খেলাধুলো এবং বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে সুস্থ যোগাযোগ বজায় রাখতে উৎসাহ দিতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে ভারসাম্য থাকলে মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা বাড়তে পারে।

তৃতীয়ত, হেনস্থা, নির্যাতন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশু যেন বাড়ি, স্কুল এবং অনলাইন পরিসরে নিরাপদ বোধ করে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, মানসিক সমস্যাকে লজ্জা বা দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজন হলে মনোবিদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য নিতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সমস্যা চিহ্নিত করা যায়, তত দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করা সম্ভব।

পঞ্চমত, আত্মহানি বা আত্মহত্যা নিয়ে কথা বললে তা অবহেলা করা চলবে না। কোনও শিশু নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে কিংবা তাৎক্ষণিক বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে একা না রেখে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা ও পেশাদার সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন

মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা সময়মতো চিহ্নিত না হলে তার প্রভাব পড়াশোনা, সম্পর্ক, শারীরিক সুস্থতা এবং পরবর্তী জীবনের উপরেও পড়তে পারে। উদ্বেগ বা অবসাদে ভোগা শিশুরা অনেক সময় নিজেদের গুটিয়ে নেয়, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক হারায়। দীর্ঘদিন সমস্যার চিকিৎসা না হলে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও তার প্রভাব থেকে যেতে পারে।

তবে মানসিক সমস্যার অর্থ এই নয় যে শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকার। যথাসময়ে সহায়তা, পরিবারের সমর্থন, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেলে অনেক শিশুই পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারে। তাই সতর্কতার অর্থ আতঙ্ক ছড়ানো নয়; বরং সমস্যাকে চিনতে শেখা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তার মূল কথা, শিশুদের মানসিক সুস্থতা শুধু অভিভাবকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়। সরকার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ- সকলেরই ভূমিকা রয়েছে। শিশুর নীরবতা, আচরণের পরিবর্তন কিংবা বারবার সাহায্য চাওয়ার ইঙ্গিতকে অবহেলা না করে গুরুত্ব দেওয়া গেলে অনেক বড় সংকটের আগেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ করা সম্ভব।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য