২৮শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
চোরবাগানের ট্র্যাজেডি, থিম উন্মাদনা এবং আগামীর রূপরেখা

চোরবাগান থেকে শিক্ষা নেবে বাঙালি? ছবি - Google

চোরবাগানের ট্র্যাজেডি, থিম উন্মাদনা এবং আগামীর রূপরেখা

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

দায় না এড়িয়ে দায় নিতে হবে সকলকে- এটাই চোরবাগানের শিক্ষা

পুজোর আনন্দে মাততে গিয়ে এই শহরের ১৯ জন সহা নগরিক স্রেফ নেই হয়ে গেছেন! এর দায় পুলিশ-প্রশাসন থেকে শুরু করে পুজোর আয়োজক এমনকি সাধারণ দর্শনার্থী, সকলের। তাই দায় অন্যের ঘাড়ে না চাপিয়ে বা ব্লেম গেম না খেলে বরং এখন দায় শিকার জরুরি। আগামী দিন আর যাতে এমন বিপর্যয় না হয় তার জন্য সবার আগে দরকার আমাদের সকলের আয়নার সামনে দাঁড়ানো।

মূল বিষয়

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। আর কলকাতার দুর্গাপুজো মানেই আলোর রোশনাই এবং বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝে যে এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদ লুকিয়ে আছে তা এবারের মহাসপ্তমীর সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তের আগের সেকেন্ড পর্যন্ত কেউ ভাবতে পারেনি। নাকি তার প্রচুর ইঙ্গিত ছিল কিন্তু আমরাই উপেক্ষা করে গিয়েছি? অন্তত তার আগের দুই-এক দিনে ওই পুজো মণ্ডপ পরিদর্শনের যাওয়া দর্শনার্থীদের একাংশের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দেখে এই প্রশ্নটা উঠে আসা স্বাভাবিক।

মহাসপ্তমীর সন্ধ্যেয় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে যা ঘটে গিয়েছে তা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়। এ বাঙালির হৃদয়ের এক গভীর ক্ষত। সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবের রাতে আমাদের এই সহ নাগরিক ১৯ জনের তরতাজা প্রাণ নিমেষে শেষ হয়ে গেল। স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হয়ে উঠল পুজোর আকাশ। এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সবাইকে অনেকগুলো কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অন্যের দিকে আঙুল তোলার বদলে আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা, মনোভাবের দিকে ফিরে তাকানোটা এখন খুব দরকার।

অভিশপ্ত সন্ধ্যের সেই কয়েক ঘণ্টা

১৭ অক্টোবর, শনিবারের সেই অভিশপ্ত সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট থেকে চোরবাগানের দিকে যাওয়া সরু গলিতে তখন তিল ধারণের জায়গা ছিল না। হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি আসে। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে দর্শনার্থীদের বেশিরভাগ মণ্ডপের দিকে ছুটে যায়। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি। প্রবল ভিড়ের চাপে মণ্ডপের ভেতরের অস্থায়ী লোহার কাঠামোর একাংশ ভেঙে পড়তে পারে বলে আতঙ্ক ছড়ায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুজো কমিটির পক্ষ থেকেও কেউ একটা মাইকে ঘোষণা করেন, মণ্ডপের কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। তাই সকলকে যেন দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত বেরিয়ে যায়।

এই একটি ঘোষণাতেই গোটা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার দর্শনার্থীর মধ্যে শুরু হয় চরম হুড়োহুড়ি। এই ভিড়ের প্রবল চাপে মণ্ডপের প্রস্থান পথটি ভেঙে পড়ে। মানুষের প্রবল হুড়োহুড়ি এবং চাপে একে অন্যের ঘাড়ে পড়ে যান। পদপিষ্ট এবং শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় ১৩ জন মহিলা ও একটি শিশু সহ মোট ১৯ জনের। এই মর্মান্তিক ঘটনায় সরকারি হিসাব মতো আহত হন আরও অন্তত ২৫ দর্শনার্থী।

থিম কালচার ও মানুষের উন্মাদনা

এই বিপর্যয়ের শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পিছনের দিকে হাঁটতে হবে। পাড়ার পুজোর সেই সাবেকিআনা আজ আর প্রায় নেই। তার জায়গা নিয়েছে মেগা থিমের জাঁকজমক। থিম কালচার একসময় শিল্পের প্রকাশ হিসেবে উঠে এলেও আজ তা এক চরম প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। থিমের চমকে কোন মণ্ডপ কত বেশি মানুষকে টানল, সেটাই এখন কলকাতার দুর্গাপুজো কমিটিগুলোর সাফল্যের মাপকাঠি। আর এই থিমের চমক দেখতে মানুষের বাঁধনছাড়া ঢল নামে।

দর্শনার্থীদের এই ভিড়ই অনেক সময় বিপর্যয়ের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। মণ্ডপের ভেতরে ঢুকে সেলফি তোলা বা অসাধারণ সব কারুকাজ দেখার জন্য বহু দর্শনার্থী থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। আজকের ব্লগের দুনিয়ায় সেই সমস্যা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এদিকে পিছন থেকে হাজার হাজার মানুষের স্রোত যে ধেয়ে আসছে সেদিকে কারও খেয়াল থাকে না। হুজুকের উন্মাদনায় মানুষ ভুলে যায়, তার এই বেখেয়ালের জন্য যে কোনও মুহূর্তে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে।

আরও পড়ুন
কোথায় হারিয়ে গেল পার্ক স্ট্রিটের সেই উথালপাতাল রাত?
পর্দা খসতেই, স্বাদ হারাল প্রেম? কলকাতার কেবিন কালচারের সংকট!
কলকাতার স্ট্রিট আর্ট ও বদলে যাওয়া চেনা অলিগলি

দেশপ্রিয় পার্ক বনাম চোরবাগান- ভূগোল বদলে মরণফাঁদের ফাঁস আর‌ও তীব্র

ভিড়ের চাপে দুর্গাপুজোয় বিপর্যয়ের সম্ভাবনা কলকাতায় নতুন নয়। ২০১৫ সালে দেশপ্রিয় পার্কের ভয়াবহ অবস্থার কথা অনেকেরই মনে আছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্গা প্রতিমা দেখার জন্য সেদিন সুনামি আছড়ে পড়েছিল দক্ষিণ কলকাতার এই পুজো মণ্ডপে। পরিস্থিতি সামলাতে সেদিন‌ও প্রশাসনকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছিল। তাতেও সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে বড় বিপর্যয় ঠেকাতে সেদিন কলকাতা পুলিশ দেশপ্রিয় পার্কে পুজোয় দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। এটা যদি মিল হয় তবে দেশপ্রিয় পার্ক এবং চোরবাগানের পরিস্থিতির মধ্যে অমিল‌ও যথেষ্ট।

দেশপ্রিয় পার্ক ছিল একটি বড় খোলা মাঠ। পাশে রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের মতো চওড়া রাস্তা ছিল। ফলে ভিড়কে কোনোক্রমে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া বা ছত্রভঙ্গ করা সম্ভব হয়েছিল কলকাতা পুলিশ সহ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির। কিন্তু চোরবাগানের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। এমনিতেই উত্তর কলকাতার গলিগুলো অত্যন্ত সরু হয়। একবার সেই গলির গোলকধাঁধায় কয়েক হাজার মানুষ ঢুকে পড়লে তাদের পেছনে ফেরার বা দ্রুত বের করে আনার কোনও উপায় থাকে না। এই ফানেল এফেক্ট বা বোতলের গলার মতো অবস্থাই চোরবাগানকে আর‌ও বেশি করে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছে।

কমিটির সিদ্ধান্তগত খামতি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতা

এই জায়গায় পুজো কমিটির বাস্তব সিদ্ধান্তগত খামতিগুলো এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মণ্ডপের ধারণক্ষমতা কত আর কত মানুষ গলিতে ঢুকছেন তার কোনও হিসেব সম্ভবত চোরবাগান পুজো কমিটির কাছে ছিল না। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল ছিল মাইকের ওই ঘোষণা। বিপদের সময় মানুষকে শান্ত করার বদলে ওই ঘোষণা চরম আতঙ্ক তৈরি করে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। স্ত্রী হারানো এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবকদের কাউকেই সাহায্যে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। গলির ভেতর অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে না পারায় দীর্ঘক্ষণ বিনা চিকিৎসায় পড়ে থাকতে হয় অনেককে। প্রস্থান পথের কাছে পর্যাপ্ত আলো পর্যন্ত ছিল না বলেও অভিযোগ উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে একটা বিষয়ে পরিষ্কার, বিপর্যয় ঘটলে সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কোনও বিকল্প ব্লুপ্রিন্ট এখানকার আয়োজকদের হাতে ছিল না।

আগামীর রূপরেখা

চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু আবেগ দিয়ে পুজো পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। প্রথমত, আগামী বছর থেকে প্রতিটি দুর্গাপুজো মণ্ডপের প্রস্থান পথকে প্রবেশ পথের চেয়ে অনেক বেশি চওড়া করতে হবে। সরু গলির পুজোগুলির ক্ষেত্রে আপৎকালীন বিকল্প রাস্তা বা এস্কেপ রুট রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

এর পাশাপাশি মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিজিটাল বা ম্যানুয়াল ক্রাউড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা দরকার। মণ্ডপের ভিতরের নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা পূর্ণ হলেই বাইরের রাস্তা থেকে এন্ট্রি বন্ধ করে দিতে হবে। এছাড়াও ভিড় সামলাতে বাফার জোন তৈরি করা এবং যে কোনও জরুরি পরিস্থিতির জন্য জিরো ক্রাউড জোন রাখা আগামী দিনের জন্য খুব জরুরি। উৎসবের আনন্দ যেন আর কোনোদিন এমন বিষাদে পরিণত না হয় তার জন্য এখন থেকেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকার, প্রশাসনের পাশাপাশি পুজো কমিটিগুলি এবং সাধারণ দর্শনার্থী প্রত্যেকেরই ভূমিকা ইতিবাচক হতে হবে। তবেই আগামী দিনে বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য