

স্টুডিওর ভেতরে আন্তর্জাতিক মানের ভিএফএক্স এবং চরিত্র নির্মাণের কাজ। ছবি:AI
হলিউডের ব্যাক-অফিস থেকে বৈশ্বিক মঞ্চের কেন্দ্রবিন্দুতে। উন্নত প্রযুক্তি, এআই ও মৌলিক চিত্রনাট্যের জোরে কীভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ঝড় তুলছে ভারতীয় অ্যানিমেশন? জেনে নিন বিস্তারিত।
দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় অ্যানিমেশন স্টুডিওগুলোকে কেবল হলিউডের ‘ব্যাক-অফিস’ বা সস্তা আউটসোর্সিং হাব হিসেবে দেখা হতো। মার্ভেল, ডিজনির মতো মেগা প্রোডাকশনের জটিল ভিএফএক্স (VFX) কিংবা ফ্রেম রেন্ডারিংয়ের কাজ ভারতীয় টেকনিশিয়ানরা নীরবে সম্পন্ন করতেন। তবে আন্তর্জাতিক পর্দায় তাঁদের নিজস্ব পরিচিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিনোদন মানচিত্রের চাকা দ্রুত ঘুরতে শুরু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), আধুনিক সিজিআই (CGI) এবং দেশীয় চিত্রনাট্যের জোরে বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তুলেছে দেশ। আন্তর্জাতিক বিনোদন বিশেষজ্ঞদের নজর এখন indian animation industry global standards-এর দিকে। ভারতের অ্যানিমেশন কি সত্যিই এবার হলিউডের শতাব্দীপ্রাচীন আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত? ভাবছেন তো বাড়াবাড়ি? আজ্ঞে না! সবটা জানলে আপনিও অবাক হতে বাধ্য।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের মেধা পশ্চিমের স্টুডিওগুলোয় নামমাত্র খরচে ব্যবহৃত হতো। হলিউডের বড় ফ্র্যাঞ্চাইজির ভিজ্যুয়াল এফেক্টের সিংহভাগ তৈরি হলেও ভারতের নিজস্ব কোনও বৈশ্বিক অ্যানিমেশন ব্র্যান্ড গড়ে ওঠেনি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় নির্মাতারা আউটসোর্সিংয়ের বাইরে এসে নিজস্ব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (IP) তৈরি করছেন। গত কয়েক বছরে ‘মহা অবতার নৃসিংহ’ কিংবা সমসাময়িক অ্যানিমেশন প্রজেক্টগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বক্স অফিসে শত শত কোটির ব্যবসা করে নিজেদের ক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
তাছাড়া পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক গল্পের পাশাপাশি আধুনিক কল্পবিজ্ঞান এবং রহস্য রোমাঞ্চ নিয়ে মৌলিক গল্প তৈরি হচ্ছে। ভারতের সমৃদ্ধ সাহিত্য ও লোকগাথা অ্যানিমেশনের জন্য এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। ফলে বিদেশি গল্পের অন্ধ অনুকরণ ছেড়ে ভারত এখন নিজস্ব সংস্কৃতির শিকড়ে ভর করে অনন্য ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা উপহার দিচ্ছে।

প্রযুক্তির দিক থেকে হলিউডের সাথে ভারতের যে বিস্তর আর্থিক ব্যবধান ছিল, তা দ্রুত কমে আসছে। আগে যেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ থ্রিডি ফিচার ফিল্ম তৈরি করতে শত শত কোটি টাকা লাগত, এখন জেনারেটিভ এআই ও আধুনিক ইঞ্জিন সেই খরচ এক ধাক্কায় বহু গুণ কমিয়ে দিয়েছে।
আনরিয়েল ইঞ্জিন ৫ (Unreal Engine 5) এবং উন্নত রিয়েল-টাইম রেন্ডারিং প্রযুক্তি ভারতীয় স্টুডিওগুলোর কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে আলো, ছায়া ও টেক্সচারের সূক্ষ্ম কাজ এখন হলিউডের সমকক্ষ হয়ে উঠছে।
এর পাশাপাশি মোশন ক্যাপচার (Mo-Cap) প্রযুক্তির ব্যবহার দেশীয় চরিত্রের নড়াচড়ায় এক স্বাভাবিক বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দিয়েছে। ভারতীয় টেকনিশিয়ানদের মেধা ও বিশ্বমানের সফটওয়্যারের মেলবন্ধন এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব তৈরি করেছে। সিনে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ও গ্লোবাল ট্রেন্ড সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বুঝতে পড়ুন আমাদের ভিএফএক্স ও মেগা বাজেটের ভারতীয় সিনেমার ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং এআই বিপ্লবে অ্যানিমেশন ও ডিজিটাল আর্টের আমূল বদল।
ভারতীয় অ্যানিমেশনের সামনে এখন গোটা পৃথিবীর বাজার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম কিংবা ডিজনি প্লাসের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো বহু ভাষায় ডাবিং করে দেশীয় কনটেন্ট বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
এর ফলে শুধুমাত্র ভারতীয় দর্শক নন, লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ দর্শকরাও ভারতীয় অ্যানিমেশনে আকৃষ্ট হচ্ছেন। জাপানি ‘অ্যানিমে’ (Anime) যেমন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ড্রয়িং স্টাইলের জোরে বিশ্বজুড়ে বিপুল ফ্যানবেস তৈরি করেছে, ভারতের অ্যানিমেশনও এখন সেই একই পথে হাঁটছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দর্শকরা এখন নতুন গল্প ও অপরিচিত সংস্কৃতির সন্ধান করছেন। ভারতীয় চিত্রনাট্যের গভীর দর্শন, লোককাহিনি এবং রঙের বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে এক সম্পূর্ণ নতুন স্বাদ নিয়ে আসছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে ভারতীয় কনটেন্টের গ্রহণযোগ্যতা আগের চেয়ে অনেকটাই দৃঢ় হয়েছে।

প্রযুক্তিতে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও হলিউডকে পুরোপুরি টেক্কা দেওয়া কিন্তু সহজ কাজ নয়। কারণ পিক্সার বা ডিজনির একেকটি প্রজেক্টের পেছনে থাকে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক পুঁজি ও বহু বছরের গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা।
ভারতে এখনও পর্যন্ত বড় বাজেটের অ্যানিমেশন ছবিতে বড় প্রযোজকরা নিয়মিত লগ্নি করতে কিছুটা ইতস্তত করেন। তাছাড়া অ্যানিমেশনকে শুধুই শিশুদের বিনোদন বলে মনে করার এক পুরনো সামাজিক মানসিকতা এখনও দেশে রয়ে গেছে।
সেই কারণে বড় বাজেটের স্পেকট্যাকলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের পরিপক্ব চিত্রনাট্য নির্মাণ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যতক্ষণ না প্রাপ্তবয়স্ক দর্শক টিকিট কেটে হলে অ্যানিমেশন সিনেমা দেখতে যাবেন, ততক্ষণ বাজার সম্পূর্ণ সাবালক হবে না। তবে নির্মাতারা এখন উপলব্ধি করছেন যে কেবল চটকদার গ্রাফিক্স নয়, আবেগের গভীরতাই একটি ছবিকে বিশ্বমঞ্চে অমরত্ব দিতে পারে।
আউটসোর্সিংয়ের ব্যাকস্টেজ থেকে উঠে এসে সামনের সারির গল্পকার হয়ে ওঠার এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারত। হলিউডের অ্যানিমেশন ফর্মুলা যখন অনেক ক্ষেত্রে একঘেয়ে সিক্যুয়েলে ক্লান্ত, তখন ভারতের সামনে রয়েছে প্রাচীন পুরাণ থেকে আধুনিক থ্রিলারের বিশাল ক্যানভাস। উন্নত প্রযুক্তি, এআইয়ের দক্ষ ব্যবহার এবং দেশীয় মেধার মেলবন্ধনে অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রি এখন সাবালক হয়ে উঠেছে। সরকারি উৎসাহ ও বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলোর সাহসী লগ্নি যদি অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্বমানের টেক্কা দেওয়া আর নিছক স্বপ্ন থাকবে না। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বক্স অফিসে হলিউডকে সমানে সমানে টক্কর দিয়ে ভারতীয় অ্যানিমেশন বিশ্বদরবারে স্বমহিমায় নিজের আসন পাকা করে নেবে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
