৩১শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
মেয়ের কেরিয়ারের জন্য ৫০ লক্ষের চাকরি ত্যাগ ভারতের দাবা মায়ের

মেয়ের কেরিয়ারের জন্য ৫০ লক্ষের চাকরি ত্যাগ ভারতের দাবা মায়ের

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

মেয়ের জন্য মায়ের কেরিয়ার বিসর্জন

মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের কেরিয়ার ছেড়ে দেওয়া এক মা এখন গোটা দাবা সমাজের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছেন। তিনিই ভারতের দাবা মা হিসেবে এই মুহূর্তে পরিচিত হচ্ছেন।

মূল বিষয়

মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের কেরিয়ার বিসর্জন দিয়েছিলেন। বছরে ৫০ লক্ষ টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই যে এক দিন উত্তর ভারতের দাবার জগতে নতুন দিশা দেখাবে, তা হয়তো ভাবেননি নিধি ভাসিন রোহিল্লা।

মেয়ের জন্য আত্মত্যাগ

মেয়ের দাবা কেরিয়ার গড়তে গিয়ে যে সমস্যাগুলির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে, আজ সেই সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজতেই কাজ করছেন তিনি। তাঁর তৈরি দাবা অ্যাকাডেমি এবং বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন বহু দাবাড়ু। নিধির বড় মেয়ে শিবিকা রোহিল্লা ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে, সাড়ে ছ’বছর বয়সে দাবা খেলা শুরু করে। মাত্র ছ’মাসের মধ্যে দিল্লি রাজ্য দাবা প্রতিযোগিতায় নিজের বয়স বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে শিবিকা। মেয়ের প্রতিভা দেখে তখনই তার দাবা কেরিয়ারকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বাবা-মা।

দন্ত চিকিৎসায় ডিগ্রি থাকলেও নিধি তখন বিভিন্ন নামী কর্পোরেট সংস্থায় বিক্রয় ও বিপণনের কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্বামী দিল্লির এইমসের চিকিৎসক। দু’জনেই ব্যস্ত থাকায় মেয়েকে নিয়মিত প্রতিযোগিতায় নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল। পাশাপাশি, সেই সময় দিল্লিতে উন্নত মানের দাবা প্রশিক্ষকের সংখ্যাও ছিল খুব কম।

শিবিকার আন্তর্জাতিক দাবা কেরিয়ারের জন্য দেশের বাইরে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য একজন অভিভাবককে সময় দিতে হত। শেষ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন নিধি। কোভিড অতিমারির ঠিক আগে বছরে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। নিধির কথায়, শিবিকার রেটিং প্রায় ২০০০-এ পৌঁছে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মাস্টার এবং অন্যান্য খেতাবের জন্য প্রয়োজনীয় মান অর্জনের লক্ষ্যে আরও বেশি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া জরুরি ছিল।

দাবার পিছনে বিপুল খরচ করতে গিয়ে পরিবারের সঞ্চয়ও দ্রুত কমতে থাকে। কোনও বাইরের আর্থিক সাহায্য ছিল না। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক সময় সংশয়ে পড়ে যান তাঁরা। শেষ চেষ্টা হিসাবে ব্রাজিলের একটি বড় প্রতিযোগিতায় শিবিকাকে নিয়ে যান। সেখানে ভাল ফল করলে দাবা কেরিয়ার চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে ঠিক হয়েছিল। শিবিকা নিজের বিভাগে প্রথম পাঁচের মধ্যে শেষ করে। তার পরেই মেয়ের দাবা কেরিয়ার নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তাঁরা।

দিল্লিতে দাবার পরিবেশ তৈরি

আরও পড়ুন
নীরজ! আজ তাঁর স্মৃতিই প্রেরণা আনমলদের
১৪ থেকে একলাফে ১১৪! প্যারা এশিয়াডে পদকের বৃষ্টি
দিনে সরকারি আমলা, রাতে প্র্যাকটিস করে প্যারালিম্পিক্সে ইতিহাস

শিবিকার কেরিয়ার এগিয়ে গেলেও নিধি বুঝতে পারছিলেন, দিল্লিতে উন্নত মানের অনুশীলন এবং প্রতিযোগিতার সুযোগ যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মাস্টার ও গ্র্যান্ডমাস্টারদের বিরুদ্ধে খেলার প্রস্তুতি নিতে শিবিকাকে ঘণ্টায় ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা দিয়ে অনুশীলনের সঙ্গী জোগাড় করতে হত। কিন্তু শিবিকা অধিকাংশ সময় সেই অনুশীলনকারীদের হারিয়ে দিত। ফলে প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছিল না। দিল্লিতে এক জায়গায় অনেক শক্তিশালী দাবাড়ুকে একসঙ্গে পাওয়ার সুযোগও ছিল না।

সেই সমস্যার সমাধান করতে নিধি তৈরি করেন এসআর দাবা অ্যাকাডেমি (এসআরসিএ)। শুরুতে মাত্র দু’-তিন জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে শুরু হয়েছিল প্রশিক্ষণ। এখন সেখানে প্রায় ৮০ জন দাবাড়ু প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এর পাশাপাশি শুরু হয় ‘চেস কফি কানেক্ট’। বিভিন্ন ক্যাফেতে দাবাড়ুদের একত্রিত করে নিয়মিত অনুশীলন, পারস্পরিক আলোচনা এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই শতাধিক দাবাড়ু ও দাবাপ্রেমী এক জায়গায় মিলিত হন। নিধির কথায়, দক্ষিণ ভারতে দাবাড়ুদের মধ্যে যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দলবদ্ধভাবে প্রতিযোগিতায় যাওয়ার সংস্কৃতি রয়েছে, দিল্লিতে তার অভাব ছিল। সেই পরিবেশ তৈরি করতেই তাঁর এই উদ্যোগ।

দাবাড়ুদের প্রয়োজনেই উদ্যোগ

নিধির কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, দাবাড়ু এবং অভিভাবকদের প্রয়োজন বুঝে নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা। প্রতিযোগিতার আগে অনুশীলনের জন্য ২৫ মিনিটের সঙ্গে প্রতি চালে পাঁচ সেকেন্ড বাড়তি সময়ের ব্যবস্থা চেয়েছিলেন অভিভাবকেরা। সেই অনুযায়ী প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তিনি।

বয়স্ক দাবাড়ুদের আর্থিক সমস্যার কথা ভেবে প্রবেশমূল্যে ছাড় দেওয়া হয়েছে। যে মেয়েদের দাবা খেলার ক্ষেত্রে বাবাদের কাছ থেকে যথেষ্ট সমর্থন মেলে না, তাদের বিনামূল্যে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়। ‘হেল্পিং হ্যান্ডস’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে কিছু শিশুকে বিনামূল্যে দাবার বই ও প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। পাশাপাশি, দাবা শেখার জন্য বিশেষ কার্ড তৈরি করেছেন নিধি। তাঁর উদ্যোগে রয়েছে ‘মাইন্ড টু মুভস’ নামে ক্রীড়া মনস্তত্ত্ব বিভাগ। বড়ো প্রতিযোগিতার আগে রেটিং নিয়ে উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ সামলানোর বিষয়ে অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সেখানে। দাবাড়ুদের অভিভাবকদের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানের অভাব দূর করতে তৈরি হয়েছে ‘চেস মমস ক্লাব’।

দাবার আনন্দই আসল

নিধির উদ্যোগে শুধু প্রতিভাবান শিশুদের নয়, বয়স্ক দাবাড়ুদেরও খেলায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই তাঁকে জানিয়েছেন, স্কুলে দাবা খেললেও দীর্ঘ দিন নিয়মিত খেলার সুযোগ পাননি। ‘চেস কফি কানেক্ট’-এর মাধ্যমে তাঁরা আবার দাবার বোর্ডে ফিরতে পেরেছেন। দৃষ্টিহীন এবং স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন দাবাড়ুর মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজনও করেছে তাঁর সংস্থা। নিধির মতে, দাবা শুধুমাত্র প্রতিযোগিতা, রেটিং কিংবা খেতাব জয়ের খেলা নয়। কোনও শিশু যদি শুধুমাত্র খেলার আনন্দে দাবা খেলে, তা হলে সারা জীবন এই খেলাটির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। তবে এত উদ্যোগের পরেও আর্থিক সমস্যার সমাধান হয়নি। এখনও কোনও বড়ো স্পনসর নেই। নিজেদের অর্থেই অধিকাংশ প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণ চালাতে হয়। দাবার পরিকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে বিভিন্ন খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্য দিকে, শিবিকা এখন লন্ডনে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছেন। তিনি মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টার (ডব্লিউআইএম) হয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি দাবাও চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি লন্ডনে একটি প্রতিযোগিতায় জয়ও পেয়েছেন তিনি। শিবিকার দাবা কেরিয়ার গড়তে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল নিধির, সেই অভিজ্ঞতাই আজ উত্তর ভারতের বহু দাবাড়ুর ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে লাগছে। মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের কেরিয়ার ছেড়ে দেওয়া এক মা এখন গোটা দাবা সমাজের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছেন। তিনিই ভারতের দাবা মা হিসেবে এই মুহূর্তে পরিচিত হচ্ছেন।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
শুভ্র মুখোপাধ্যায়
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য