raghunath-murmu-
৫ই মে, ২০২৬
আজ জন্মদিন
সব ভাষারই এক জন্মকথা থাকে। কিছু ভাষা জন্মায় রাজসভায়, কিছু বইয়ের পাতায় - আর কিছু ভাষা জন্মায় মানুষের বুকের ভেতর, অরণ্যের ছায়ায় ও ঢেউয়ের শব্দে। সাঁওতালি তেমনই এক ভাষা - যার গল্প ছিলো, স্মৃতি ছিলো, ছিলো সুর কিন্তু কোন অক্ষর ছিলো না। সেই নীরবতার মধ্যে একদিন একজন মানুষ উঠে দাঁড়ালেন - রঘুনাথ মুর্মু। যার ভেতরে লুকিয়ে ছিলো ভাষার মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ, আর নীরব বিপ্লবের এক অনন্য ইতিহাস। রঘুনাথ মুর্মু - সেই নাম যিনি শুধু অক্ষর নির্মাণ করেন নি, আসলে তিনি একটি জাতির আত্মপরিচয় লিখেছেন।
শিকড়ের সন্ধানে
১৯০৫ সালের ৫ মে, ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের এক নিভৃত গ্রামে জন্ম। চারপাশে প্রকৃতি, মানুষের সরল জীবন, আর মুখে মুখে বয়ে চলা সাঁওতালি ভাষা। ওড়িয়া ভাষা দ্বারা পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ার সময় মাত্র সাত বছর বয়সেই রঘুনাথ বুঝতে পারেন - তাঁদের ভাষা আছে, কিন্তু তা লেখার নিজস্ব কোনো মাধ্যম নেই। বারিপদা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ক্রমে তিনি বুঝতে পারলেন - একটি ভাষা কেবলমাত্র উচ্চারণে বেঁচে থাকতে পারেনা! তাই বন্ধুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, রঘুনাথ মন দিলেন সম্পূর্ণ অন্য খেলায় - এই পৃথিবীর মাটি আর তাতে হাজারো আঁকিবুঁকি! কানে বাজতে থাকা নিজের আপন ভাষার অনুরণনের মধ্যে দিয়ে আঁকতে শুরু করলেন অপ্রচলিত একাধিক চিহ্ন। গভীর অধ্যাবসায়, নিরলস পরিশ্রম আর হাজারো গবেষণা - একটি লিপির সন্ধানে। তিনি তখন বারিপদা উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঠরত, মাথার মধ্যে সারাক্ষণ ঘুরপাক খাচ্ছে ভাবনার প্রতিধ্বনি - "একটি ভাষা হারিয়ে গেলে, হারিয়ে যায় একটি পৃথিবী"। ছুটির দিনগুলোয় জনমানবহীন কাপি-বুরু জঙ্গলে নিভৃতে কাটতো দিন, সঙ্গী শুধুমাত্র খাতা ও কলম।
প্রকৃতি থেকে লিপি
১৯২৫ সাল, এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত - ঘটে গেলো নীরব বিপ্লব। এই কাপি-বুরু জঙ্গলে বসেই রঘুনাথ মুর্মু সৃষ্টি করলেন ‘অল চিকি ‘- সাঁওতালি ভাষার প্রথম নিজস্ব লিপি। এই লিপি কোনো ধার করা কাঠামো নয়, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার এক অবিস্মরণীয় দলিল। অল চিকির প্রতিটি চিহ্নে মাটির গন্ধ, নদীর স্রোত, পাখির ডাক, মানুষের শ্বাস মিশে আছে - যেন একটি ভাষার জীবন্ত শরীর।
মঞ্চে ভাষার বিপ্লব
লিপি তৈরি করেই থেমে থাকেননি রঘুনাথ। তিনি বুঝেছিলেন - অক্ষরকে বাঁচাতে হলে তাকে মানুষের জীবনে ঢুকতে হবে। বাদামতলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় ১৯৩৬ সালে তিনি লিখে ফেলেন অল চিকি লিপির প্রথম বই - ‘ হড় সেরেঞ ’ । ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম নাটক - ‘বিদু চাঁদান’। রায়রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করাকালীন সমাজের কাছে অল চিকি-কে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই নাটককে সম্বল করে তিনি ময়ুরভঞ্জ, ঝাড়খন্ডের একের পর সাঁওতাল গ্রাম ঘুরতে শুরু করলেন। তাঁর প্রচেষ্টা সফল হলো, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লো তাঁর নব্য আবিষ্কৃত লিপি আর মানুষ ভালোবেসে তাদের এই প্রিয় শিক্ষকের নাম দিলো - ‘গুরু গোমকে ‘।
স্বীকৃতির সংগ্রাম
একটি লিপি তৈরি করা যতটা কঠিন, তার স্বীকৃতি পাওয়া তার চেয়েও কঠিন। রঘুনাথ মুর্মুকে শুধুমাত্র নিজের ভাষার অধিকারের দাবিতে একাধিক লড়াই লড়তে হয়েছে, করতে হয়েছে আত্মত্যাগ। দেশের স্বদেশী আন্দোলনের সময় অল চিকি লিপির প্রচারের অপরাধে তাঁকে দীর্ঘদিন তাঁর স্ত্রীর সাথে নানা স্থানে আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছে। ১৯৪৭-এ স্বাধীন হয়েছে দেশ, কেটেছে বন্দীদশা, যদিও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু রঘুনাথ থামেননি - ‘দাড়ে গে ধন’ , ‘খেরওয়াল বীর’, ‘সিদো কানহু সান্তাড় হুল’, ‘হিতলৗয়’, ‘বাহা সেরেঞ’, ‘এলখা পতব’ -এর মতো একাধিক নাটক, কাব্যগ্রন্থ এবং অলচিকি লিপির বর্ণপরিচয় - ‘অল উপরুম’ রচনার মধ্যে দিয়ে একটি ভাষাকে সংরক্ষণ করে গেছেন।তারপরেও প্রশাসনিক অবহেলা, শিক্ষাব্যবস্থার অনীহা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা - সবকিছুর বিরুদ্ধে অকল্পনীয় লড়াই থামেনি। তাঁর অদম্য জেদ, নিরলস প্রচেষ্টা এবং সাঁওতাল সপ্রদায়ের দীর্ঘ আন্দোলন অবশেষে জয়ী হয়েছে। বর্তমানে সাঁওতালি ভাষা ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে স্বীকৃতি লাভ করেছে। অল চিকি আজ শুধুই একটি লিপি নয় - এটি একটি সাংস্কৃতিক অধিকার।
স্বপ্ন ও সম্মান
১৯৮২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি মনের মধ্যে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে রঘুনাথ মুর্মু দেহত্যাগ করেন এবং একটি ভাষার জন্য রেখে যান আগামীর অনন্ত সম্ভাবনা। তাঁর যুগান্তকারী কাজের স্বীকৃতি দিয়ে রাঁচি ইউনিভার্সিটি এই মহান কর্মযোগীকে সম্মানিয় ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেছে। বিভিন্ন পুরস্কারের মাধ্যমে ওড়িয়া সাহিত্য একাডেমি তাঁর সাহিত্য কর্মকে সম্মান জানিয়েছে। তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়েছে একাধিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়। আজ সাঁওতালি ভাষায় বই লেখা হয়, পড়াশোনা হয়, গবেষণা হয় এবং এই সমস্ত কিছুর মধ্যে দিয়েই নীরবে উচ্চারিত হয় - রঘুনাথ মুর্মুর নাম!
অক্ষরের ভেতরে এক মানুষের স্পন্দন
রঘুনাথ মুর্মুর গল্প আসলে খুব নীরব এক গল্প। এখানে বড় কোনো আওয়াজ নেই, নেই প্রচারের ঝলক। আছে শুধু এক মানুষের গভীর বিশ্বাস - ভাষা মানে পরিচয়, আর পরিচয় মানে অস্তিত্ব। আসলে তিনি কেবল অক্ষর তৈরি করেননি, একটি জাতিকে নিজের নাম লিখতে শিখিয়েছেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
জন্ম মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে। সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা। সময় কাটে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। বর্তমানে লেখালিখি, ডিজিটাল কন্টেন্ট এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কর্মব্যস্ত।