

প্রতীকী ছবি - AI
২৫শে আগস্ট, ২০২৬
উনিশ শতকের বাংলায় ব্যাপক আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল সমাজ সংস্কারের ঢেউ। জরাজীর্ণ রক্ষণশীলতাকে চুরমার করে নতুন সমাজ গড়ার উন্মাদনায় মেতেছিল নবীন ও যুক্তিবাদী প্রজন্ম। ঠিক সেই সময়ই এমন এক ঘটনা ঘটে, যা শুধু তৎকালীন বাংলার শিক্ষিত সমাজকেই প্রবল ধাক্কা দেয়নি, চিরতরে ভেঙে টুকরো করে দিয়েছিল ঐতিহাসিক ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনকে।
যিনি নিজে বহু লড়াই করে ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতায় বাল্যবিবাহকে নিষিদ্ধ করেছিলেন, সেই কেশবচন্দ্র সেন'ই কি না নিজের তেরো বছরের মেয়ের বিয়ে দেন এক নাবালক মহারাজার সঙ্গে! এই ঘটনা ইতিহাসে 'কোচবিহার বিবাহ বিতর্ক' নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।
কোচবিহার তখন অবিভক্ত বঙ্গের উত্তরে ব্রিটিশদের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'বাফার স্টেট' বা কৌশলগত দেশীয় রাজ্য। মহারাজা শিবেন্দ্র নারায়ণের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন নাবালক নৃপেন্দ্র নারায়ণ। তখন বয়স মাত্র ১৫ বছর। আর ঠিক এই সুযোগটারই যেন অপেক্ষাতেই ছিল ব্রিটিশরা।
ব্রিটিশদের লক্ষ্য ছিল নাবালক মহারাজাকে এমন এক পরিবেশে বড় করা, যাতে রাজপরিবারের প্রাচীন রক্ষণশীল প্রথা এবং দেশীয় সংস্কৃতি তাঁকে ছুঁতে না পারে। তাঁকে পুরোপুরি 'সাহেবি' ছাঁচে গড়ে তুলতে চেয়েছিল তারা। এর জন্য লেফটেনান্ট গভর্নর রিচার্ড টেম্পল এক অভিনব ছক কষেন। মহারাজার জন্য এমন এক পাত্রীর খোঁজ শুরু হয়, যিনি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের বাইরের কেউ। আর সেই সূত্র ধরেই খোদ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক তথা সর্বময় কর্তা অবিসংবাদিত নেতা কেশবচন্দ্র সেনের কাছে গিয়ে তাঁর বড় মেয়েকে মহারাজার সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয় ইংরেজরা।
১৮৭২ সালে কেশবচন্দ্র সেনের আপ্রাণ চেষ্টায় এবং প্রবল লড়াইয়ের পর পাস হয়েছিল 'নেটিভ ম্যারেজ অ্যাক্ট' বা 'তিন আইন'। এই আইন পাসের পর বাল্যবিবাহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৪ বছর, আর ছেলেদের ১৮ বছর করা হয়েছিল ওই আইনে।
অথচ এর ঠিক ছয় বছর পর, ১৮৭৮ সালে যখন কোচবিহারের মহারাজার সঙ্গে তাঁর বড় মেয়ে সুনীতি দেবীর বিয়ের প্রস্তাব ইংরেজদের তরফ থেকে এল, তখন কেশবচন্দ্র যেন এক লহমায় আজকের দিনের রাজনীতিবিদদের মত পাল্টি খেয়ে যান! ওই সময় কোচবিহারের মহারাজার বয়স ছিল ১৫ বছর, আর সুনীতির বয়স সবে ১৩ পেরিয়েছে। মানে দু'জনেই কেশবচন্দ্র সেনদের উদ্যোগে পাস হওয়া আইন মোতাবেক নাবালক।
সেই সময় কেশবচন্দ্র সেনের এই ভূমিকা গোটা দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। কলকাতার শিক্ষিত সমাজে ছি ছিক্কার পড়ে যায়। সমালোচকদের মতে, রাজপরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার হাতছানি এবং অঢেল ক্ষমতার মোহ এড়াতে পারেননি স্বয়ং কেশবচন্দ্র। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বুঝিয়েছিল, এই বিবাহ হলে এক দেশীয় রাজ্যের মহারাজা ব্রাহ্ম সমাজের ছত্রছায়ায় চলে আসবেন, যাতে আখেরে সমাজেরই লাভ হবে।
এদিকে এই চরম আদর্শচ্যুতিকে ঢাকার জন্য কেশবচন্দ্র অদ্ভুত এক তত্ত্ব খাড়া করেন। তিনি দাবি করেন, এটি সাধারণ বিয়ে নয়, এটি হল 'ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ'! ঈশ্বর নাকি স্বয়ং তাঁকে এই বিবাহ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
কথা ছিল, বিয়ে হবে সম্পূর্ণ নিরাকার ব্রাহ্ম মতে। কোনও ধরনের মূর্তিপুজো বা পৌত্তলিক রীতিনীতি সেখানে থাকবে না। কিন্তু কোচবিহার পৌঁছানোর পর কেশবচন্দ্র দেখলেন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজপরিবারের অন্দরমহল এবং রক্ষণশীল হিন্দু পুরোহিতরা তাদের পুরনো নিয়মকানুনে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে কার্যত অনঢ় হয়ে বসে থাকে। তাঁদের দাবি ছিল, রাজবাড়ির বিয়ে হিন্দু প্রথাতেই হবে।
ব্রিটিশদের চাপ এবং রাজপরিবারের জেদের কাছে কার্যত আত্মসমর্পণ করেছিলেন নীতিভ্রষ্ট কেশবচন্দ্র। যে মানুষটি সারাজীবন পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তিনি নীরবে দাঁড়িয়ে দেখলেন তাঁর মেয়ের বিয়ের আসরে রাখা হয়েছে শালগ্রাম শিলা! ব্রাহ্ম উপাচার্যদের সরিয়ে দিয়ে হিন্দু পুরোহিতরা মন্ত্র পড়লেন। এমনকি কেশবচন্দ্রকে বিয়ের মূল মণ্ডপে প্রবেশের অধিকার পর্যন্ত দেওয়া হলো না। সেদিন রাজকীয় ঐশ্বর্যের কাছে মাথা নত হয়ে গিয়েছিল ব্রাহ্ম সমাজের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের।
খবরের কাগজের পাতায় এই বিয়ের খবর কলকাতায় পৌঁছানো মাত্রই বাংলার প্রগতিশীল যুবসমাজের মধ্যে ক্ষোভের সুনামি আছড়ে পড়ে। শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো তরুণ ব্রাহ্ম নেতারা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি কেশবচন্দ্র সেনের না এই দ্বিচারিতা।
তাঁরা প্রকাশ্যেই কেশবচন্দ্রের পদত্যাগ দাবি জানান। কিন্তু ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ কেশবচন্দ্র উপাসনা মন্দিরে তালা ঝুলিয়ে দেন। বিরোধীদের তাড়াতে ডাকা হল পুলিশ! ব্রাহ্ম সমাজের ভেতরে এই কদর্য রূপ আগে কখনও কেউ দেখেনি।
ফলস্বরূপ যা হওয়ার তা-ই হল। ১৮৭৮ সালের ১৫ মে কলকাতার টাউন হলে এক ঐতিহাসিক ও বিক্ষুব্ধ সভার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় 'সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ'। কেশবচন্দ্রকে ত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। চিরতরে দু'ভাগ হয়ে যায় বাংলার নবজাগরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
