

ডলার ধাক্কা খাবে? ছবি - Google
এক মুদ্রা নয়, দেশভেদে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির পথে জোট, রুপিতে লেনদেন বাড়ানোর সম্ভাবনা ভারতের, বদলাতে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চেনা সমীকরণ৷ ২০২৬ সালের ঘোষণাতেও বলা হয়েছে, এই ক্ষেত্রে ‘একটি মডেল সবার জন্য’, এমন ধারণা নয়, বরং সদস্য দেশগুলির জাতীয় অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এত দিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশের হিসাব হয়েছে ডলারে। তেল থেকে শিল্পপণ্য, কাঁচামাল থেকে পরিষেবা, দেশের সীমানা পেরিয়ে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন মুদ্রার ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। কিন্তু সেই ব্যবস্থার বিকল্প খোঁজার চেষ্টা আর কেবল আলোচনার টেবিলে আটকে নেই। বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতিগুলির অন্যতম জোট ব্রিকস এ বার স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি এবং সীমান্ত-পেরোনো পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার দিকে এগোচ্ছে।
২০২৬ সালের নয়াদিল্লি ঘোষণায় ব্রিকস দেশগুলি আন্তঃদেশীয় পেমেন্ট ব্যবস্থার পারস্পরিক সংযোগ এবং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিষ্পত্তি নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে, বিষয়টি সদস্য দেশগুলির নিজস্ব অগ্রাধিকারকে সম্মান করেই এগোবে।
এই জায়গাতেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। ব্রিকসের নিজস্ব একটি অভিন্ন মুদ্রা, ইউরোর মতো কোনও ‘ব্রিকস কারেন্সি’, চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকও জানিয়েছে, এই মুহূর্তে এমন কোনও প্রস্তাব নেই। বরং আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সদস্য দেশগুলির নিজস্ব মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিষ্পত্তি।
সহজ কথায়, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য হলে তার একটি অংশ রুপি ও রুবলে মেটানোর সুযোগ বাড়তে পারে। একই ভাবে অন্য সদস্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে সংশ্লিষ্ট দুই দেশের জাতীয় মুদ্রা ব্যবহারের রাস্তা তৈরি হতে পারে। এর ফলে প্রতিটি লেনদেনে ডলারকে মধ্যবর্তী মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়োজন কিছু ক্ষেত্রে কমতে পারে।
এর পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত, দুই ধরনের কারণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার যত বেশি, ততই বিভিন্ন দেশের সংস্থা ও ব্যাঙ্ককে ডলার-ভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হয়। স্থানীয় মুদ্রায় সরাসরি লেনদেন বাড়াতে পারলে কিছু ক্ষেত্রে মুদ্রা বদলের খরচ এবং লেনদেনের সময় কমানো সম্ভব।
এ ছাড়াও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ডলারের ওঠানামার ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়ার চেষ্টা রয়েছে। ব্রিকসের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির আলোচনাতেও দ্রুত, কম খরচে এবং আরও দক্ষ আন্তঃদেশীয় পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
এই ব্যবস্থায় ভারতের অন্যতম বড় সম্ভাবনা রুপিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও বেশি ব্যবহার করা। ভারত ইতিমধ্যেই স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির জন্য Local Currency Settlement System এবং রুপির ব্যবহার বাড়াতে Special Rupee Vostro Account-এর মতো ব্যবস্থা চালু করেছে। এর ফলে বিদেশি বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রুপিতে বাণিজ্য নিষ্পত্তির কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
ব্রিকসের বিস্তৃত স্থানীয় মুদ্রা-ভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে সেই পরিকাঠামোর ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত যে দেশগুলির সঙ্গে বড় আকারে পণ্য ও পরিষেবা বাণিজ্য করে, সেখানে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ বাড়লে রুপির আন্তর্জাতিক ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
এখানে অতিরঞ্জনের সুযোগ নেই। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা হলেও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় ডলারের আধিপত্য এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে বিশ্বের বরাদ্দকৃত বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে ডলারের অংশ ছিল প্রায় 57.13 শতাংশ। অর্থাৎ স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রবণতা বাড়লেও ডলার এখনও বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা।
তাই এই পরিবর্তনকে এখনই ‘ডলারের পতন’ বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একক নির্ভরতার বদলে একাধিক মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য শুনতে সহজ হলেও বাস্তবে তার বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। দুই দেশের মুদ্রার চাহিদা যদি সমান না হয়, তা হলে বাণিজ্যের ভারসাম্য কী ভাবে বজায় থাকবে, এটি বড় প্রশ্ন। যেমন, ভারত কোনও দেশের কাছ থেকে বেশি আমদানি করল কিন্তু সেই দেশ ভারতের কাছ থেকে তুলনায় কম পণ্য কিনল, তখন রুপিতে জমা হওয়া অর্থ কী ভাবে ব্যবহার করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তার সঙ্গে রয়েছে মুদ্রার বিনিময় হার, বাজারে তারল্য, ব্যাংকিং পরিকাঠামো, পেমেন্ট সিস্টেমের পারস্পরিক সংযোগ এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রশ্ন। বিভিন্ন দেশের আর্থিক আইন ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নীতি আলাদা হওয়ায় একটি অভিন্ন ব্যবস্থা তৈরি করাও সহজ নয়।
এই কারণেই ব্রিকস আপাতত কোনও একক মুদ্রার দিকে না গিয়ে ধাপে ধাপে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং পেমেন্ট ব্যবস্থার সংযোগের দিকে এগোচ্ছে। ২০২৬ সালের ঘোষণাতেও বলা হয়েছে, এই ক্ষেত্রে ‘একটি মডেল সবার জন্য’, এমন ধারণা নয়, বরং সদস্য দেশগুলির জাতীয় অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিশ্ব বাণিজ্যের মুদ্রা-ব্যবস্থা এক দিনে বদলাবে না। ডলারের শক্তি শুধু তার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নয়; এর পিছনে রয়েছে গভীর আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবহার, মার্কিন ট্রেজারি বাজারের গভীরতা এবং বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা আর্থিক পরিকাঠামো।
তবু ব্রিকসের স্থানীয় মুদ্রা-ভিত্তিক বাণিজ্যের উদ্যোগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এটি সফল হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের পাশাপাশি অন্য মুদ্রার ব্যবহার বাড়তে পারে। সেই তালিকায় রুপির জায়গাও আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, সামনে হয়তো এমন এক বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি হবে না যেখানে ডলার রাতারাতি হারিয়ে যাবে। বরং তৈরি হতে পারে বহুমুদ্রার বাণিজ্যব্যবস্থা, যেখানে ডলারের পাশাপাশি রুপি, ইউয়ান, রুবল এবং অন্যান্য জাতীয় মুদ্রায় সরাসরি লেনদেনের সুযোগ বাড়বে।
সেই পরিবর্তনের শুরুটা ছোট হলেও তার প্রভাব হতে পারে বড়। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মুদ্রা শুধু লেনদেনের মাধ্যম নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি দেশের অর্থনৈতিক ক্ষমতা, কূটনৈতিক প্রভাব এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে তার অবস্থান।
ব্রিকসের স্থানীয় মুদ্রার উদ্যোগ তাই শেষ পর্যন্ত শুধু ডলারের বিকল্প খোঁজার গল্প নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে একক মুদ্রা-নির্ভরতা থেকে বহুমুখী আর্থিক ব্যবস্থার দিকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার সম্ভাব্য ইঙ্গিত।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
