

কলকাতা মেট্রো। ছবি - Google
হাওড়া থেকে সল্টলেক, নিউ গড়িয়া থেকে বিমানবন্দর, জোকা থেকে মাঝেরহাট- নতুন মেট্রোপথে শুধু কমছে যাত্রার সময় নয়, বদলে যাচ্ছে শহরের আবাসন, কর্মক্ষেত্র ও দৈনন্দিন জীবনের হিসাব! ফলে মেট্রোর লাইন যত বাড়ছে, তার সঙ্গে শহরের উপরিভাগেও বদলে যাচ্ছে মানুষের বসবাসের মানচিত্র।
একটা সময় কলকাতায় বাড়ি কেনার আগে প্রশ্ন উঠত, এলাকাটা কেমন? বাজার আছে তো? স্কুল, হাসপাতাল কতটা কাছে? এখন সেই তালিকায় ঢুকে পড়েছে আরও একটি প্রশ্ন, কাছের মেট্রো স্টেশন কোথায়?
শহরের পরিবহণের মানচিত্র যত দ্রুত বদলাচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাচ্ছে আবাসনের মানচিত্রও। নতুন মেট্রো লাইন মানেই শুধু কয়েক কিলোমিটার নতুন রেলপথ নয়। তার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের ‘দূরত্ব’-এর ধারণা। যে পাড়া এক সময় অফিসপাড়া থেকে অনেক দূরের বলে মনে হত, মেট্রো এসে সেই দূরত্বকে অনেকটাই ছোট করে দিয়েছে। ফলে কলকাতা ও তার আশপাশে বাড়ি কেনা, ভাড়া নেওয়া, জমি কেনা কিংবা নতুন আবাসন তৈরির সিদ্ধান্তেও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মেট্রো-সংযোগ।
গত কয়েক বছরে কলকাতা মেট্রোর সম্প্রসারণে সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। উত্তর-দক্ষিণের পুরনো অক্ষের বাইরে তৈরি হয়েছে পূর্ব-পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং বিমানবন্দরমুখী নতুন করিডর। ফলে কলকাতার কেন্দ্রকে ঘিরে থাকা শহরটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে একাধিক মেট্রো-কেন্দ্রিক অঞ্চলের শহরে।
এই বদলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো। হাওড়া ময়দান থেকে সল্টলেক সেক্টর ৫ পর্যন্ত পরিষেবা চালু হওয়ার পর হাওড়া ও সল্টলেকের মধ্যে যাতায়াতের ছবিটাই বদলে গিয়েছে। দেশের প্রথম নদীর নীচ দিয়ে মেট্রো চলাচল এই করিডরকে শুধু প্রযুক্তিগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ করেনি, শহরের অর্থনীতি এবং আবাসনের ক্ষেত্রেও তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা।
হাওড়ার বহু এলাকা এত দিন কলকাতার কর্মক্ষেত্র থেকে তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন বলে বিবেচিত হত। রাস্তার যানজট, সেতুর উপর চাপ এবং দীর্ঘ যাত্রার কারণে সল্টলেক বা পূর্ব কলকাতায় কাজ করা অনেকের কাছেই হাওড়ায় বাড়ি নেওয়া খুব আকর্ষণীয় ছিল না।
এখন সেই হিসাব বদলাচ্ছে। বাড়ি একটু দূরে হলেও যদি মেট্রো স্টেশন কাছে থাকে, অফিসে পৌঁছতে সময় কম লাগবে। এই ধারণাই ধীরে ধীরে আবাসনের বাজারে গুরুত্ব পাচ্ছে। শিয়ালদহ, ফুলবাগান, সল্টলেক, সেক্টর ৫- এই করিডরের সঙ্গে যুক্ত এলাকাগুলিও তাই শুধু যাত্রী পরিবহণের দিক থেকে নয়, আবাসন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকেও নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
কলকাতার আবাসন বাজারে সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। আগে কোনও তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করা কর্মীর সামনে প্রধান বিকল্প ছিল, সল্টলেক বা নিউ টাউনের কাছাকাছি বাড়ি নেওয়া। কারণ অফিস থেকে দূরে থাকলে প্রতিদিনের যাতায়াতই হয়ে উঠত বড় সমস্যা।
এখন সেই সমীকরণ কিছুটা বদলেছে। হাওড়া, শিয়ালদহ, ফুলবাগান কিংবা অন্য কোনও সংযোগকারী এলাকার বাসিন্দা মেট্রো ধরে সেক্টর ৫-এ পৌঁছতে পারছেন। ফলে কর্মস্থল এবং বাসস্থানের মধ্যে সরাসরি দূরত্বের বদলে যাতায়াতের সময়টাই হয়ে উঠছে বড় মাপকাঠি।
এর ফলে শহরের বাইরে তুলনামূলক সস্তা এলাকায় বাড়ি কিনে মেট্রোয় যাতায়াত করার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ আবাসনের বাজারে ‘লোকেশন’ শব্দটির অর্থও বদলাচ্ছে।
কারণটা সহজ। একটি মেট্রো স্টেশন একটি এলাকার সঙ্গে শুধু রেল যোগাযোগ তৈরি করে না। তার চারপাশে তৈরি হয় অটো, বাস, টোটো, দোকান, রেস্তরাঁ, অফিস, ছোট ব্যবসা এবং অন্যান্য পরিষেবার নতুন চাহিদা। ফলে স্টেশনের হাঁটা দূরত্বের মধ্যে থাকা আবাসনের আকর্ষণও বাড়ে।
বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে গাড়ি না থাকলেও অফিস, কলেজ, হাসপাতাল বা শহরের অন্য প্রান্তে পৌঁছনো যায়। পরিবারের একাধিক সদস্য আলাদা আলাদা গন্তব্যে গেলেও মেট্রো একটি নির্ভরযোগ্য পরিবহণ ব্যবস্থা হয়ে ওঠে। তাই আগামী দিনে কলকাতার আবাসনের ক্ষেত্রে একটি নতুন হিসাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, বাড়ির আয়তন কত, তার পাশাপাশি মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত হাঁটতে কত মিনিট লাগে।
কলকাতার পরিবহণ ব্যবস্থায় আরও একটি বড় পরিবর্তন এসেছে বিমানবন্দরমুখী মেট্রো সংযোগে। দমদম ক্যান্টনমেন্ট, যশোর রোড হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রো যোগাযোগ তৈরি হওয়ায় উত্তর কলকাতা এবং উত্তর শহরতলির বহু এলাকার গুরুত্ব নতুন করে বাড়ছে। বিমানযাত্রী, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কর্মী, ব্যবসায়ী কিংবা নিয়মিত দেশের বাইরে যাতায়াত করা মানুষ সবার কাছেই এই যোগাযোগের মূল্য আলাদা।
এখানেও আবাসনের হিসাব বদলাতে পারে। আগে বিমানবন্দরের কাছাকাছি থাকা মানে ছিল মূলত দমদম বা সংলগ্ন কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। এখন মেট্রো নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত হচ্ছে, সেই পরিসরও বাড়ছে।
দক্ষিণ কলকাতার নিউ গড়িয়া থেকে পূর্ব কলকাতার দিকে মেট্রো যোগাযোগও আবাসনের মানচিত্রে নতুন রেখা তৈরি করেছে। নিউ গড়িয়া, ইএম বাইপাস, বেলেঘাটা হয়ে ভবিষ্যতের বৃহত্তর সংযোগ, এই অক্ষটি কার্যকর হলে দক্ষিণ কলকাতা, পূর্ব কলকাতা এবং বিমানবন্দরমুখী অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত আরও সহজ হবে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে রাজারহাট, নিউ টাউন, বেলেঘাটা এবং বাইপাস সংলগ্ন আবাসন বাজারে। বিশেষ করে যে সব এলাকায় এখনও তুলনামূলক বড় জমি রয়েছে, সেখানে মেট্রো পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন আবাসন প্রকল্পের সম্ভাবনাও বাড়ে। কারণ নির্মাতাদের কাছে পরিবহণ-সংযোগ কোনও প্রকল্পের অন্যতম বড় বিক্রির হাতিয়ার।
দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতার ছবিটাও আলাদা নয়। জোকা থেকে মাঝেরহাটের মেট্রো যোগাযোগ বহু বছরের একটি সমস্যা কমিয়েছে, শহরের মূল অংশে দ্রুত পৌঁছনোর সমস্যা। জোকা, ঠাকুরপুকুর, বেহালা সংলগ্ন এলাকায় তুলনামূলক কম দামে বাড়ি বা ফ্ল্যাট পাওয়া যায়। কিন্তু এত দিন অনেক ক্রেতার আপত্তি ছিল একটাই, যাতায়াত।
মেট্রো সেই আপত্তির একটা বড় অংশ দূর করেছে। ফলে আগামী দিনে এই অঞ্চলে আবাসনের চাহিদা আরও বাড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে শুধু মেট্রো স্টেশন হলেই হবে না- রাস্তা, নিকাশি, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার এবং শেষ মাইলের যোগাযোগ কতটা উন্নত হচ্ছে, তার উপরও এলাকার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
মেট্রোর প্রভাব শুধু ফ্ল্যাট বিক্রির বাজারে আটকে থাকে না। ভাড়ার বাজারেও তার ছাপ পড়ে। যে সব জায়গায় আগে অফিস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছতে দীর্ঘ সময় লাগত, মেট্রো চালুর পরে সেখানে ভাড়াবাড়ির চাহিদা বাড়তে পারে। বিশেষ করে তরুণ চাকরিজীবী, ছাত্রছাত্রী এবং ছোট পরিবারের কাছে মেট্রোর কাছাকাছি এক বা দুই কামরার ফ্ল্যাট আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
অন্য দিকে, মেট্রো স্টেশনের খুব কাছে থাকা পুরনো বাড়ি বা ছোট জমিও নতুন মূল্য পেতে পারে। কারণ সেখানে ভবিষ্যতে বহুতল বা বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা থাকে।
এখানেই সতর্ক হওয়ার জায়গা। কোনও এলাকায় মেট্রো আসছে শুনেই জমি বা ফ্ল্যাটের দাম হঠাৎ লাফিয়ে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রকল্পের কাজ কত দূর এগিয়েছে, স্টেশন বাস্তবে কোথায় হচ্ছে, স্টেশন থেকে বাড়ির দূরত্ব কত, রাস্তার অবস্থা কেমন, এলাকায় জল-নিকাশি কেমন-সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ‘ভবিষ্যতে মেট্রো হবে’ এই আশ্বাসে কোনও সম্পত্তির জন্য অস্বাভাবিক দাম চাওয়া হলে ক্রেতাকে যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কারণ মেট্রোর মানচিত্রে কোনও এলাকা থাকা আর বাস্তবে সেখানে সুবিধা পৌঁছে যাওয়া- দুটি এক জিনিস নয়।
সম্ভাবনা যথেষ্ট। কলকাতা এমনিতেই ঘনবসতিপূর্ণ শহর। নতুন করে রাস্তা তৈরি করে যানজট কমানোর সুযোগ সীমিত। গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু রাস্তার পরিসর একই হারে বাড়ছে না। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত গণপরিবহণই শহরের ভবিষ্যতের অন্যতম বড় ভরসা।
আর সেই গণপরিবহণের মেরুদণ্ড হয়ে উঠছে মেট্রো। তাই বর্তমানে কলকাতার আবাসনের বিজ্ঞাপনে হয়তো শুধু ‘স্কুলের কাছে’, ‘বাজারের কাছে’ বা ‘হাসপাতালের কাছে’ লেখা থাকছে না। তার সঙ্গে বড় অক্ষরে লেখা থাকছে, ‘মেট্রো স্টেশন থেকে পাঁচ মিনিট।’ এই একটি বাক্যই হয়তো কোনও ফ্ল্যাটের বাজারদর, ভাড়ার চাহিদা এবং ক্রেতার সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা নেবে।
কলকাতার বদল তাই শুধু মাটির নীচে পাতালপথে নয়। মেট্রোর লাইন যত বাড়ছে, তার সঙ্গে শহরের উপরিভাগেও বদলে যাচ্ছে মানুষের বসবাসের মানচিত্র। এক সময় যে কলকাতাকে কেন্দ্র করে শহর গড়ে উঠেছিল, আগামী দিনের কলকাতা হয়তো গড়ে উঠবে একাধিক মেট্রো-কেন্দ্রকে ঘিরে, যেখানে বাড়ির ঠিকানার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেই ঠিকানা থেকে মেট্রো স্টেশনের দূরত্ব।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
