

প্রতীকী ছবি - AI
১২ই আগস্ট, ২০২৬
খাদ্য সংস্কৃতির কথা উঠলে কলকাতা চিরকালই এক বিশাল 'মেল্টিং পট' হিসেবে পরিচিত হয়ে এসেছে। সময়ের হাত ধরে এই শহরে এসে ভিড় জমিয়েছে আর্মেনিয়ান, ইহুদি, চিনা, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এবং অবশ্যই পার্সিরা। একসময় পার্সিরা কলকাতার বাণিজ্যে ও সমাজ জীবনে দাপটের সঙ্গে বিচরণ করলেও, আজ তিলোত্তমার বুকে পার্সি সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা স্রেফ কয়েকশোতে এসে ঠেকেছে।
কিন্তু সংখ্যার বিচারের পার্শিরা কলকাতায় একেবারে প্রান্তিক শ্রেণিতে পরিণত হলে কী হবে, তাঁরা নিজেদের স্বকীয়তা, সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাসকে আজও পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। একটি জাতির আত্মপরিচয় যে কতটা গভীরভাবে তার রান্নাঘরে লুকিয়ে থাকে, কলকাতার পার্সি সমাজ তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কলকাতার বুকে পার্সি খাবারের কথা উঠলেই অবধারিতভাবে উঠে আসে বৌ স্ট্রিটের 'ক্যালকাটা পার্সি ধর্মশালা'-র নাম। এটি যেন শহরের কোলাহলের মাঝে এক টুকরো শান্ত পারস্য। বাণিজ্যিকভাবে ফুলে-ফেঁপে ওঠা রেস্তোরাঁর চাকচিক্য এখানে নেই, কিন্তু আছে এক পরম ঘরোয়া উষ্ণতা। আগে শুধুমাত্র পার্সিদের জন্য নির্দিষ্ট থাকলেও, এখন ভোজনরসিক কলকাতাবাসীর কাছেও এই ধর্মশালার ক্যান্টিন তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে।
পাশাপাশি, শহরের বেশ কিছু পার্সি পরিবারের গৃহিণীরা হোম-শেফ হিসেবে এবং ছোট ছোট ক্যাটারিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের এই ঐতিহ্যবাহী রান্নাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
পার্সি রান্নার আসল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে এর উৎসে। প্রাচীন পারস্যের রাজকীয়তা এবং ভারতের গুজরাটের স্থানীয় মশলার এক অভাবনীয় মেলবন্ধন ঘটেছে এই রান্নায়।
টক-মিষ্টির যুগলবন্দি: পার্সিরা খাবারে 'খাট্টু-মিঠ্ঠু' বা টক-মিষ্টি স্বাদের এক আশ্চর্য ভারসাম্য বজায় রাখেন। এই টকভাব আনতে তাঁরা প্রায়শই ব্যবহার করেন গুজরাটের নবসারি অঞ্চল থেকে আসা বিশেষ ইক্ষু-ভিনিগার, যা তাঁদের রান্নার এক সিগনেচার উপাদান।
ডিম বা 'ইডা'-র প্রতি অমোঘ টান: ডিম ছাড়া পার্সিদের দিন চলে না। ঢেঁড়স, টমেটো, এমনকি চিপসের ওপরও ডিম ভেঙে দিয়ে তৈরি হয় ‘ভিন্ডি পর ইডা’ বা ‘সালি পর ইডা’-র মতো অনবদ্য সব পদ।
পার্সিদের হেঁশেলের এমন কিছু পদ রয়েছে, যা কেবল খাবার নয়, বরং এক একটি ইতিহাস।
পার্সি খাবারের পোস্টার বয় হল ধানশাক। চার-পাঁচ রকম ডাল, কুমড়ো, বেগুন, মেথি পাতা এবং খাসির মাংস দিয়ে ধীর আঁচে রান্না করা এই পদটি ক্যারামেলাইজড ব্রাউন রাইসের সাথে পরিবেশন করা হয়। তবে এর পেছনের গল্পটি বেশ অন্যরকম।
ঐতিহ্যগতভাবে, পার্সি পরিবারে কারও মৃত্যু হলে প্রথম তিন দিন বাড়িতে মাংস রান্না হয় না। চতুর্থ দিন শোক পালনের পর প্রথম যে আমিষ পদটি রান্না হয়, তা হল ধানশাক। তবে কালক্রমে এটি পার্সিদের রবিবারের দুপুরের এক অবিচ্ছেদ্য এবং আয়েসি পদে পরিণত হয়েছে।
নওরোজ (পার্সি নববর্ষ) বা লগন (বিয়ে)-এর মতো উৎসব 'পাতরা নি মাচ্ছি' ছাড়া অসম্পূর্ণ। নারকেল, ধনেপাতা, পুদিনা, কাঁচালঙ্কা এবং জিরের এক বিশেষ সবুজ চাটনিতে ভেটকি বা পমফ্রেট মাছকে ম্যারিনেট করে কলাপাতায় মুড়িয়ে ভাপে তৈরি হয় এই পদ।
টমেটো, পেঁয়াজ ও পার্সি মশলার গ্রেভিতে ডুবিয়ে রাখা নরম তুলতুলে খাসির মাংসের কারি। পরিবেশনের ঠিক আগে এর উপর ছড়িয়ে দেওয়া হয় একরাশ 'সালি' বা মুচমুচে ঝুরি আলুভাজা, যা এই পদের টেক্সচারকে এক অন্য মাত্রা দেয়।
এটি আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় মাছের পদ, যেখানে সাদা রঙের একটি মিষ্টি ও টক গ্রেভিতে (ডিম ও ভিনিগারের মিশ্রণে তৈরি) মাছ রান্না করা হয়। সাধারণত হলুদ খিচুড়ির সাথে এটি পরিবেশন করা হয়।
উৎসবের ভোজে শেষ পাতে থাকে বেকড কাস্টার্ড। দুধ, ডিম, এলাচ, জায়ফল ও ড্রাই ফ্রুটসের এই যুগলবন্দি মুখে দিলে মিলিয়ে যায়। আর পুরো আহারের পর তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে এক বোতল 'পালনজি'-র রাস্পবেরি সোডা (Pallonji's Raspberry Soda) হলে তো কথাই নেই!
বিবর্তনের স্রোতে কলকাতা অনেক কিছু হারিয়েছে, অনেক কিছু বদলেছে। পার্সি সম্প্রদায়ের আকারও আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে এসেছে। কিন্তু এই গুটি কয়েক মানুষ আজও তাঁদের উৎসব, তাঁদের ধর্মশালা এবং তাঁদের হেঁশেলের মাধ্যমে শহরের বুকে এক অনন্য সুবাস টিকিয়ে রেখেছেন। এই খাবারগুলো শুধু রসনা তৃপ্তি করে না, বরং মনে করিয়ে দেয় সুদূর শিকড়ের কথা। ডিজিটাল যুগেও কলকাতার গ্যাস্ট্রোনমিক মানচিত্রে পার্সি খাবারের এই নস্টালজিয়া তাই আজও অমলিন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
