১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
রাজার পাহারাদার থেকে বাংলার মসনদে!

প্রতীকী ছবি - AI

রাজার পাহারাদার থেকে বাংলার মসনদে!

calender icon 2 ১২ই আগস্ট, ২০২৬

সুদূর কর্ণাটকের সেনাপতিরা কীভাবে দখল করেছিল বাংলার সিংহাসন?

ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম হল, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র চিরকালই স্থানান্তরিত হয়। ক্ষমতা কখন‌ওই এক জায়গায় আবদ্ধ থাকে না। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। এবং সেটা কাদের সঙ্গে কীভাবে হয়েছিল জানলে হয়ত অনেকেই বিস্মিত হয়ে যাবে।

পাল রাজবংশের প্রায় চারশো বছরের সুদীর্ঘ শাসনের শেষ লগ্নটি ছিল চরম রাজনৈতিক ডামাডোলে ভরা। আর ঠিক সেই সুযোগেই বাংলার বুকে এক অভাবনীয় ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছিল। যারা সেই সুদূর মহীশূর (আজকের কর্ণাটক) থেকে এসেছিলেন পাল রাজাদের রক্ষা করতে, তারাই একসময় পাল সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছিলেন!

সেই বহিরাগত সেনাপতিদের হাত ধরেই বাংলায় শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়- সেন রাজবংশের শাসন।

দাক্ষিণাত্য থেকে রাঢ় বাংলা: এক পরিযায়ী সেনাদলের আগমন

সেন রাজাদের আদি বাসস্থান ছিল সুদূর দাক্ষিণাত্যের মহীশূরে। ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁরা ছিলেন ‘ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয়’। অর্থাৎ, জাতিতে তাঁরা প্রাথমিকভাবে ব্রাহ্মণ হলেও, পরবর্তীকালে পেশা হিসেবে অস্ত্রধারণ বা ক্ষত্রিয় বৃত্তি গ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু কর্ণাটক থেকে তাঁরা বাংলায় এলেন কীভাবে?

ইতিহাস বলে, পাল রাজাদের সেনাবাহিনীতে একসময় বহিরাগত সৈন্যদের নিয়োগের চল শুরু হয়। বিশেষ করে কন্নড়, মালব ও খস অঞ্চলের ভাড়াটে সৈন্যরা তাদের সামরিক দক্ষতার জন্য পাল রাজাদের বিশেষ পছন্দের ছিল। একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, এরকমই এক কন্নড় সেনাদলের নেতা হিসেবে সামন্ত সেন বাংলায় আসেন এবং রাঢ় অঞ্চলে (বীরভূম-বর্ধমান এলাকা) নিজেদের একটি ছোট বসতি স্থাপন করেন। সামন্ত সেন ছিলেন মূলত একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক নেতা, যিনি পাল সাম্রাজ্যের অধীনস্থ একজন সামন্ত প্রভু হিসেবে নিজের অবস্থান মজবুত করেছিলেন।

আরও পড়ুন
ভ্রাম্যমান রাজধানী ছিল বাংলার এই রাজবংশের শক্তি
ডিম্বাস্ত্রের ভবিষ্যৎ বিপদ
সাবঅলটার্ন সংস্কৃতির নামে বাংলায় মগের মুলুক?

বিদ্রোহ, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সুযোগের সদ্ব্যবহার

যে কোনও সাম্রাজ্যের পতনের শুরুটা হয় তার অন্দরমহল থেকেই। একাদশ শতকের শেষভাগে এসে পাল সাম্রাজ্য চরম দুর্বল হয়ে পড়ে। একদিকে সিংহাসন নিয়ে রাজপরিবারের নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে বরেন্দ্র অঞ্চলে (উত্তরবঙ্গ) ভয়াবহ 'কৈবর্ত বিদ্রোহ'। দ্বিতীয় মহীপালের সময় স্থানীয় কৈবর্ত নেতা দিব্য-র নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ হয়, তা পাল সাম্রাজ্যের ভিত পুরোপুরি নাড়িয়ে দেয়।

এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগটাই নিয়েছিলেন সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেন। পাল রাজারা যখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত, তখন হেমন্ত সেন রাঢ় বাংলায় নিজের সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি নিঃশব্দে বাড়াতে থাকেন। তিনি পালদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজেকে প্রায় স্বাধীন এক আঞ্চলিক শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। 'পাহারাদার' বা ভাড়াটে সৈন্যের খোলস ছেড়ে সেন'রা তখন ক্ষমতার স্বাদ পেতে শুরু করেছে।

সামন্ত থেকে সম্রাট: বিজয় সেনের মাস্টারস্ট্রোক

হেমন্ত সেনের পর সেন বংশের হাল ধরেন তাঁর পুত্র বিজয় সেন (১০৯৭–১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ)। আর এখানেই ঘটে ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় মোড়। বিজয় সেন বুঝতে পেরেছিলেন, পাল সাম্রাজ্য তখন মৃত্যুশয্যায়। এই সুযোগে তিনি রাজনৈতিক কূটনীতি ও সামরিক আগ্রাসনের এক দুর্দান্ত কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি রাঢ়ের শূর বংশীয় রাজকন্যা বিলাশদেবীকে বিবাহ করে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের গ্রহণযোগ্যতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। এরপর তিনি সরাসরি দুর্বল পাল রাজা মদনপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।

মদনপালকে পরাজিত করে বিজয় সেন উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভূমি দখল করে নেন। শুধু তাই নয়, একে একে রাঢ়, গৌড় এবং পূর্ব বাংলার (বঙ্গ) বিস্তীর্ণ অঞ্চল তিনি নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।

যাঁদের পূর্বপুরুষরা একসময় পাল রাজাদের প্রাসাদের পাহারাদার বা নিছক বেতনভুক সেনাপতি হিসেবে বাংলায় এসেছিলেন, বিজয় সেনের দূরদর্শিতা ও পরাক্রমে তাঁরাই হয়ে উঠলেন গোটা বাংলার একচ্ছত্র অধিপতি।

ক্ষমতার পালাবদলের ঐতিহাসিক শিক্ষা

সেনদের এই উত্থান বাংলার ইতিহাসে কেবল একটি রাজবংশের পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পালাবদল। বহিরাগত হয়েও তাঁরা যেভাবে বাংলার রাজনীতিতে মিশে গিয়েছিলেন এবং সুযোগের সদ্ব্যবহার করে একটি আস্ত সাম্রাজ্য দখল করেছিলেন, তা প্রাচীন ভারতের সামরিক কূটনীতির এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত।

ইতিহাস এভাবেই আমাদের শেখায়, রাষ্ট্রক্ষমতায় কোনও শূন্যতা থাকে না। কেন্দ্রীয় শাসন যখনই দুর্বল হয়, প্রান্তিক বা অধীনস্থ শক্তি তখনই সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাল সাম্রাজ্যের পতন এবং সেন'দের উত্থান, ক্ষমতার এই অমোঘ চক্রেরই এক নিখুঁত ঐতিহাসিক দলিল।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য