হাত বা পায়ে হঠাৎ ঝিঁঝিঁ ধরা—অনেকেই বিষয়টিকে সাময়িক অসুবিধা বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই উপসর্গ চলতে থাকলে তা গুরুতর স্নায়ুরোগের পূর্বাভাসও হতে পারে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ‘টিংলিং’ বা ‘প্যারাস্থেসিয়া’।
সম্ভাব্য কারণগুলি
এই ঝিঁঝিঁ ধরা আসলে স্নায়ুর ওপর প্রভাব পড়ার ফল। আর এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত রক্তে শর্করার মাত্রা থাকলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়—ফলে হাত-পায়ে অসাড়তা বা ঝিঁঝিঁ অনুভূত হতে পারে। আবার দুর্ঘটনা বা আঘাতের ফলে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়লেও একই সমস্যা দেখা দেয়।
এছাড়া দীর্ঘকালীন মদ্যপান, ভিটামিন বি১২-র অভাব, এমনকি কিছু ভারী ধাতু বা রাসায়নিকের সংস্পর্শেও এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও হাত-পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরা অনুভূত হয় ।
হাতে ও পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা কোনও রোগের উপসর্গ হতে পারে। ফাইল চিত্র।
কী করবেন
এই উপসর্গকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। কারণ নির্ণয়ের জন্য ‘নার্ভ কন্ডাকশন স্টাডি’-র মতো পরীক্ষাও করতে হতে পারে।
চিকিৎসা নির্ভর করে মূল কারণের ওপর। ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। কোনও ওষুধের কারণে সমস্যা হলে তা বন্ধ বা পরিবর্তন করতে হয় চিকিৎসকের পরামর্শে। দুর্ঘটনাজনিত কারণে হলে সার্জনের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। আবার ভিটামিন বি১২-র অভাব থাকলে ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাও জরুরি।
চিকিৎসকদের কথায়, “ঝিঁঝিঁ ধরা যদি মাঝেমধ্যে হয়, তা হলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যা চললে সেটি শরীরের ‘ওয়ার্নিং সিগন্যাল’ হতে পারে।”
অতএব, হাত-পায়ে অস্বাভাবিক ঝিঁঝিঁ—ছোট উপসর্গ ভেবে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা করানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
মুর্শিদাবাদ, ২৫ এপ্রিল: ছোটগল্পের সংজ্ঞা লিখতে গিয়ে রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, শেষ হয়েও হইল না শেষ ! প্রথম দফা ভোট পর্বের হালটাও যেন তেমনই ৷ কড়া প্রহরায় সম্পন্ন হয়েছে ভোটের প্রথম পর্ব৷ কিন্তু জনতা জনার্দনের দেওয়া সেই ভোট যদি বেমক্কা চুরি হয়ে যায় ! এই আশঙ্কাই যেন গ্রাস করেছে রাজনৈতিক শিবিরগুলিকে।
যার নিটফল, কমিশনের কড়া নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রহরা—সব কিছু থাকলেও তাতে পুরোপুরি ভরসা রাখতে চাইছে না কেউই। তাই এবার স্ট্রংরুমের বাইরে শুরু হয়েছে ‘চোখে চোখ’ রেখে পাহারা! তাও একসঙ্গে তৃণমূল, সিপিএম ও কংগ্রেসের।
মুর্শিদাবাদের ডোমকল গার্লস কলেজে রাখা হয়েছে জলঙ্গি, ডোমকল ও রানিনগর—এই তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রের ইভিএম। প্রশাসনের তরফে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। বাইরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল, ভিতরে প্রশাসনিক নজরদারি—সব মিলিয়ে আঁটোসাঁটো ব্যবস্থা। কিন্তু তাতেই সন্তুষ্ট নন প্রার্থীদের একাংশ। তাঁদের আশঙ্কা, কোথাও কোনও ফাঁক থেকে গেলে বিপদ!
ফলে নিজেদের উদ্যোগেই স্ট্রংরুমের বাইরে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। শুধু একটি দল নয়—তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম—প্রায় সব পক্ষই এই নজরদারিতে শামিল। স্ট্রংরুমের চারপাশে একাধিক কোণে ক্যামেরা বসিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে কোনও দিকই ‘ব্লাইন্ড স্পট’ না থাকে। ২৪ ঘণ্টা সেই ফুটেজ পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি হয়েছে অস্থায়ী নজরদারি শিবিরও।
স্ট্রংরুম থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে তৈরি সেই শিবিরে সারি দিয়ে বসানো টিভি মনিটর। পাশে হার্ডডিস্ক, তারের জট, জেনারেটর—সব মিলিয়ে যেন এক ছোটখাটো কন্ট্রোল রুম। সেখানে পালা করে বসে থাকছেন দলীয় কর্মীরা। কেউ চোখ রাখছেন মনিটরে, কেউ আবার আশপাশে টহল দিচ্ছেন। কারা আসছেন-যাচ্ছেন, কোনও অচেনা মুখ ঘোরাঘুরি করছে কি না, হঠাৎ কোনও অস্বাভাবিক নড়াচড়া—সব কিছুই খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে।
রানিনগরের তৃণমূল প্রার্থী সৌমিক হোসেন বলেন, “ভোট মানুষের অধিকার। সেই ভোট যাতে নিরাপদে থাকে, তার জন্য যা করার দরকার, আমরা করছি। কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নই।” কংগ্রেস প্রার্থী জুলফিকার আলির কথায়, “কমিশনের উপর ভরসা আছে ঠিকই, কিন্তু নিজেদের চোখে নজরদারি থাকলে নিশ্চিন্ত থাকা যায়।” ডোমকলের সিপিএম প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানও জানান, তাঁরাও একই পথে হাঁটছেন—ক্যামেরা বসানোর পাশাপাশি কর্মী মোতায়েন করা হচ্ছে।
এখন স্ট্রংরুম চত্বরের চেহারাই আলাদা। প্রশাসনের নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে যেন আর এক ‘রাজনৈতিক বলয়’। দিনের বেলায় যেমন সতর্ক নজর, রাত বাড়লেও তাতে ঢিল নেই। চায়ের কাপ হাতে, চোখ কিন্তু স্ক্রিনে—এ যেন টানটান উত্তেজনার প্রহর গোনা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বাড়তি তৎপরতা শুধু ইভিএম নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগই নয়, বরং এ বার লড়াই কতটা স্নায়ুচাপে ভরা—তারই প্রতিফলন। শাসক-বিরোধী—সব পক্ষই বুঝে গিয়েছে, একটুও ঢিল দিলে খেসারত দিতে হতে পারে।
এখন দেখার, এই ‘চোখে চোখ’ পাহারা শেষ পর্যন্ত কাকে এগিয়ে রাখে। সমস্ত জল্পনার অবসান হবে ৪ মে, গণনার দিনেই।
কলকাতা: দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও আঁটসাঁট করতে তৎপর নির্বাচন কমিশন । সেই লক্ষ্যেই রাজ্যে নতুন করে ১১ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হল । প্রথম দফায় বিক্ষিপ্ত অশান্তির ঘটনাকে মাথায় রেখে দ্বিতীয় দফায় কোনও ঝুঁকি নিতে নারাজ কমিশন— স্পষ্ট বার্তা প্রশাসনের অন্দরে।
ইতিমধ্যেই এ বারের নির্বাচনের জন্য ৮৪ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল, যা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি। দ্বিতীয় দফার আগে সেই সংখ্যাই আরও বাড়িয়ে কার্যত নজির গড়ল কমিশন। সূত্রের খবর, স্পর্শকাতর ও অতি স্পর্শকাতর এলাকাগুলিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানেই বাড়তি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন পর্যবেক্ষকদের সকলেই ভিন্রাজ্যের অফিসার— নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। যদিও তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকছে রাজ্য পুলিশের উপরই।
গত ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ভোট মোটের উপর শান্তিপূর্ণ হলেও, একাধিক জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন অশান্তির অভিযোগ সামনে আসে। কোথাও বিরোধী দলের এজেন্টদের বুথে বসতে বাধা, কোথাও ইভিএম বিকল, আবার কোথাও ভোটারদের বুথে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই সব ঘটনাকেই গুরুত্ব দিয়ে দ্বিতীয় দফায় কড়া নজরদারির পথে হাঁটছে কমিশন।
প্রথম দফার ভোটদানের হার ছিল চোখে পড়ার মতো— ৯২.৮৮ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের দাবি, স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে এত বেশি ভোটদানের নজির বিরল। এই বিপুল অংশগ্রহণকে গণতন্ত্রের পক্ষে ইতিবাচক বলেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি দ্বিতীয় দফাতেও আরও বেশি সংখ্যক ভোটারকে বুথমুখী হওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
তবে ভোটের এই উচ্চ হারের পিছনে ভিন্ন মতও রয়েছে। একাংশের মতে, এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে আশঙ্কার জেরেই বহু ভোটার ভোট দিতে আগ্রহী হয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, ভোট না দিলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই কারণেই কর্মসূত্রে ভিন্রাজ্যে থাকা বহু মানুষও ভোট দিতে ফিরে এসেছেন রাজ্যে।
দীর্ঘদিন পর এ বার পশ্চিমবঙ্গে দুই দফায় নির্বাচন হচ্ছে। ভোট ঘোষণা থেকেই কমিশন স্পষ্ট করেছিল— দফা কম হলেও নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কোনও আপস হবে না। সেই মতো ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য পৃথক সাধারণ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ ও নির্বাচনী ব্যয় সংক্রান্ত পর্যবেক্ষকদের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
দ্বিতীয় দফার আগে পুলিশ পর্যবেক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি কমিশনের সেই কৌশলকেই আরও জোরালো করল। এখন সব নজর ২৯ এপ্রিল— বাকি ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণে কতটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা যায়, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ কমিশনের কাছে।
বিরাট কোহলির খেলা মাঝেমধ্যে দেখে অনেক ক্রিকেট প্রেমী হাহুতাশ করেন। তিনি টেস্ট, টি ২০ ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এমন যিনি দুরন্ত ফর্মে বিরাজ করেন, তাঁর প্রতিটি শটে যেন অমোঘ বার্তা, এটাই প্রমাণ করে যে, আমি বিরাট কোহলি। আমি নিজের ছন্দে বিরাজমান। আমাকে সরাবে কার সাধ্য। আইপিএলের ম্যাচেও কোহলির ব্যাটে পুরনো ছন্দ। গত গুজরাটের বিরুদ্ধে ম্যাচে কোহলির ব্যাট থেকে এসেছে ৪৪ বলে ৮১ রানের অনবদ্য ইনিংস। ইনিংসে রয়েছে ৮টি বাউন্ডারি এবং চারটি ছক্কা। খেলার শুরুতে একটি মাত্র সুযোগ দিয়েছিলেন। ওয়াশিংটন সুন্দর ক্যাচ মিস না করলে তখনই আউট হয়ে ফিরে যান বিরাট। কিন্তু কথায় আছে, বাঘ একবার ঘায়েল হলে সে আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কোহলিও তাই ওই সুযোগ পাওয়ার পরে বাকি ইনিংস খেলেছেন রাজকীয় ঢঙে।
বিরল নজির বিরাটের
একটা দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৩০০ টি ছক্কা মেরে রেকর্ড গড়লেন কোহলি। এর আগে ক্রিস গেইল ( ৩৫৭) এবং রোহিত শর্মা ( ৩০৯) আইপিএলে বেশি ছক্কা মারার অধিকারী হলেও একটা দলের হয়ে তিনশো ছক্কা মারার নজির কারও নেই। বিরাট আইপিএলে আগাগোড়া বেঙ্গালুরু দলের হয়ে খেলেছেন। তাই তিনি যে রেকর্ড গড়লেন সেটি কারও পক্ষে ভাঙা সম্ভব নয়।
কোহলি একক ব্যাটসম্যান হিসেবে টি ২০ ক্রিকেটে দশ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন গুজরাট ম্যাচেই। কোহলির পরে আছেন রোহিত শর্মা ( ৮৫৬৩) এবং শিখর ধাওয়ান ( ৭৬২৭)।
কোহলির লন্ডনের নিবাস
বিরাট কোহলি এই মুহূর্তে ভারতে বেশি থাকেন না। তিনি ক্রিকেটের মূল স্রোত থেকে অনেকটাই সরে গিয়ে পাকাপাকিভাবে চলে গিয়েছেন লন্ডনে। সেখানে নটিং হিলের সেন্ট জনস উড নামক স্থানে বিলাসবহুল বাংলো কিনেছেন। বাড়ির পাশে একেবারে সবুজের সমারোহ। তিনি তাঁর ছেলে ও মেয়েকে লন্ডনের স্কুলে ভর্তি করেছেন। স্ত্রী অনুষ্কা শর্মা অভিনেত্রী হিসেবে সফল হলেও এখন বেছে বেছে সিনেমা করেন।
কী করে এত সফল কোহলি লন্ডনে নিভৃতে কীভাবে নিজেকে ক্রিকেটার হিসেবে ফিট রাখেন, সেটি একেবারেই গোপনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তিনি গত এক বছর ধরে লন্ডনে রয়েছেন, অথচ কোনও পাপারাজ্জি কোহলির প্রস্তুতির ছবি ও ভিডিও ক্যামেরাবন্দি করতে পারেননি।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, কোহলির লন্ডনের বাড়ির ভিতরেই একটা আস্ত ক্রিকেট মাঠ রয়েছে তিনি সেখানে কাউন্টি খেলোয়াড়দের ডেকে প্র্যাকটিস সারেন। তিনি এই বিষয়ে খুব গোপনীয়তা বজায় রেখে চলছেন। তাই অনেকেই মনে করেন, কোহলি দূরে দেশের বাইরে থেকেও কীভাবে ম্যাচের জন্য এত ফিট। এমনিতেই কোহলি বরাবর ফিটনেস ফ্যানাটিক। তিনি জিমে মোট চার ঘণ্টার বেশি সময় দেন। তাই কোহলি আইপিএলে এসেও সমান সফল। তিনি আচরণ এবং খেলোয়াড় সুলভ মানসিকতায় বুঝিয়ে দেন তিনি কেন বাকিদের থেকে আলাদা।
ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের আবহে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শুরু হতে যাচ্ছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর আলোচনা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানে পা রাখার পরপরই তেহরান তাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ নিশ্চিত করেছেন যে, এই সফরে আমেরিকান প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের কোনো ধরনের সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে না। বরং দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা বা বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবেন পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
মার্কিন প্রতিনিধি দলের সফর ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের অবস্থান
তেহরানের এই অনড় অবস্থানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হোয়াইট হাউসও তাদের প্রতিনিধি দলের হয়ে ঘোষণা করেছে। আগামী ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, শনিবার সকালে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন। তাদের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হল চলমান যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার নতুন একটি পর্যায় শুরু করা। উল্লেখ্য যে, এই আলোচনার প্রথম পর্বে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স সরাসরি উপস্থিত থাকলেও এবার তিনি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে থাকছেন না। তবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে যে তিনি বর্তমানে “স্ট্যান্ডবাই” বা সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন, যাতে আলোচনার বিশেষ কোনো প্রয়োজনে তিনি দ্রুত সাড়া দিতে পারেন।
ইসলামাবাদে ত্রিমুখী কূটনীতি ও শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ
সার্বিকভাবে, ইসলামাবাদ এখন এক ত্রিমুখী কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যদিও সরাসরি কোনো সংলাপ হচ্ছে না, তবুও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই পরোক্ষ আলোচনা যুদ্ধবিরতি বা শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কোনো নাটকীয় মোড় নিয়ে আসে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব। সরাসরি আলোচনার অনীহা থাকলেও একই সময়ে একই শহরে দুই দেশের প্রতিনিধিদের অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পর্দার আড়ালে বড় কোনো সমীকরণের প্রস্তুতি চলছে।
কলকাতা: তিলোত্তমার ভোরবেলা। অলস পড়ে থাকা রাস্তা, হালকা চায়ের গন্ধ, মাঝেমধ্যে টুং টাং শব্দ, ধীরগতি দু’চাকায় ভর করা রিক্সা এগিয়ে চলেছে। হাতে টানা। ‘সওয়ার বাবুটি’ও দুলছেন তার গতির তালে তালে। শহরের চেনা দৃশ্য। তার বোধহয় বিদায় নেওয়ার সময় আসন্ন শহরের বুক থেকে।
শহরের শিরায় মিশে থাকা ইতিহাস
হাতে টানা রিক্সা শুধু একটি যান নয়, এটি কলকাতার আত্মার অংশ। উনিশ শতকের শেষভাগে এই রিক্সা শহরে আসে, আর অচিরেই হয়ে ওঠে নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। উত্তর কলকাতার ভাঙাচোরা গলি, বৃষ্টিতে ডোবা রাস্তা—সব জায়গাতেই ছিল তার অবাধ যাতায়াত।
কিন্তু এই ইতিহাসের উল্টো পিঠে রয়েছে ঘাম, দারিদ্র্য আর বেঁচে থাকার লড়াই। ভিনরাজ্য থেকে আসা অসংখ্য মানুষ তো বটেই, এই শহরের অনেকেও জীবিকার খোঁজে এই পেশায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। দিনের পর দিন মানুষ টেনে তাঁরা টিকিয়ে রেখেছেন নিজেদের পরিবার—এ এক নীরব সংগ্রামের কাহিনি। অন্য রাজ্য থেকে রোজগারের তাগিদে আসা সেই মানুষগুলোও একসময় হয়ে উঠলেন আমাদের সহনাগরিক।
হাত-টানা রিক্সাই যাঁদের জীবিকা। কলকাতা। নিজস্ব ছবি: দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস
মানবাধিকার, আধুনিকতা ও বিতর্ক
সময় পালটায়, পালটায় তার পছন্দ, নতুন আইডিয়া পুরনোকে ফেলে দিতে বলে। যা একসময় অপরিহার্য ছিল, একদিন বাতিল হয়ে যায়। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রযুক্তি আকাশ ছুঁয়েছে, সেখানে একজন মানুষ আর একজন মানুষকে টানছে, এ দৃশ্য আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। আধুনিক সময় মেনে নিতে পারে না এ দৃশ্য যন্ত্রযুগে দাঁড়িয়ে। স্বাভাবিকভাবে একদিন প্রশাসন এগিয়ে আসে এর সমাধানে।
২০০৬ সালে হাতে টানা রিক্সাকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—এই প্রথার অবসান। কিন্তু তারপর?
পেটের দায় বনাম নীতির লড়াই
প্রশাসনের নির্দেশ কাগজে লেখা থাকলেও, জীবনের খাতা কিন্তু অন্য হিসেব মেনে চলে। রিক্সা উঠে গেলে তাঁরা যাবেন কোথায়? নতুন কাজ কি এত সহজে জুটবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়েই কি বন্ধ করা যায় একটি জীবিকা? এখানেই তৈরি হয় সেই নিঃশব্দ দ্বন্দ্ব— একদিকে মানবিকতা, অন্যদিকে বেঁচে থাকার লড়াই! একদিকে সভ্যতার দাবি, অন্যদিকে পেটের টান!
‘যন্ত্রযুগ‘
আজকের কলকাতা বদলে গেছে। অ্যাপ ক্যাব, মেট্রো, ই-রিক্সা—সব মিলিয়ে শহর ছুটছে গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। এসেছে মোটর-চালিত পেডেল-রিক্সা। সেখানে হাতে টানা রিক্সা যেন সময়ের বাইরে পড়ে থাকা এক টুকরো ইতিহাস। আগের তুলনায় হাত টানা রিক্সার সংখ্যা কমেছে । অনেকেই পেশা বদলেছেন, কেউ হারিয়ে যাচ্ছেন শহরের ভিড়ে। তবু পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
বর্ষার দিনে, যখন রাস্তায় হাঁটু জল, তখন আবার দেখা যায় সেই মানুষটিকে—হাঁপাতে হাঁপাতে টেনে নিয়ে চলেছেন যাত্রীকে! যেন শহর তখন স্বীকার করে নেয়, সব আধুনিকতার পরেও, কিছু প্রয়োজন এখনও থেকে যায়!
সভ্যতার ‘কনফ্লিক্ট’
হাতে টানা রিক্সা কি শুধু লজ্জার প্রতীক? না কি এটি সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল? ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ এই রিক্সার চাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলকাতার ইতিহাস, আবার একই সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসমতা ও বঞ্চনার কাহিনিও।
শহরবাসীর মতে, সম্ভবত সময়ের নিয়মেই একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে হাতে টানা রিক্সা। শহর আরও আধুনিক হবে, আরও দ্রুত হবে। যে মানুষগুলো বয়ে নিয়ে যেতেন সওয়ার দিনভর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, সভ্যতার ‘কনফ্লিক্ট’-এর কবলে পড়ে তাঁরাও হারিয়ে যাবেন। হয়ত এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক জীবিকা থেকে অন্য জীবিকায় কাটবে তাঁদের বাকি জীবনের সংগ্রাম। আমরা জানতে পারব না সে কথা।
কিন্তু তখনও কোনও পুরনো ছবিতে, কোনও গল্পে, বা স্মৃতির ভাঁজে থেকে যাবে এক মানুষ—যে আরেক মানুষকে টেনে নিয়ে চলেছে! সে গল্প বয়ে যেতে থাকবে সময়ের হাত ধরে যুগ থেকে যুগান্তরে। গল্পে মিশে থাকবে রোজের যুদ্ধ, টিকে থাকা, দ্বন্দ্ব, হারিয়ে যাওয়া।
ব্যস্ততার এই সময়ে ঘুম যেন বিলাসিতা। নাইট শিফট, হাইব্রিড কাজ, তার সঙ্গে উদ্বেগ-অবসাদ ! সব মিলিয়ে নষ্ট হচ্ছে স্বাভাবিক ‘স্লিপ সাইকেল’। আর সেই সুযোগেই অনেকের কাছে সহজ সমাধান হয়ে উঠছে ঘুমের ওষুধ। কিন্তু চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা— এই অভ্যাসই ডেকে আনতে পারে দীর্ঘমেয়াদি বিপদ।
‘স্লিপ সাইকেল’
ঘুম নিজেই শরীরের সবচেয়ে বড় ওষুধ। সাধারণত ৯০ থেকে ১১০ মিনিটের কয়েকটি চক্রে সম্পূর্ণ হয় স্বাভাবিক ঘুম, যা শরীর ও মনের পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, শোওয়ার আগে মোবাইল ব্যবহার, বেশি কফি বা চা— এই সব অভ্যাস সেই ছন্দকে ভেঙে দিচ্ছে।
সমস্যা
সমস্যা শুরু হয়, যখন সামান্য অনিদ্রাতেই ওষুধের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ঘুমের ওষুধ খেলে শরীরে তৈরি হয় ‘ডিপেন্ডেন্সি’— অর্থাৎ একই প্রভাব পেতে বাড়াতে হয় ওষুধের মাত্রা। ধীরে ধীরে সেই ওষুধ ছাড়া ঘুম আসাই কঠিন হয়ে পড়ে।
এর প্রভাব শুধু ঘুমেই সীমাবদ্ধ নয়। ঘুমের ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কমতে পারে স্মৃতিশক্তি, বাড়তে পারে বিভ্রান্তি, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া। দিনের বেলায় ঘুমঘুম ভাব, মাথা ভার লাগা— এই সমস্যাগুলিও খুব সাধারণ। আরও বিপজ্জনক, হঠাৎ করে ওষুধ বন্ধ করলে ফের অনিদ্রা বাড়তে পারে।
কী করবেন?
বদল আনতে হবে জীবনযাত্রায়
শোওয়ার আগে স্ক্রিন টাইম কমানো
সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন এড়ানো
বিছানায় মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করা
এই অভ্যাসগুলোই ফিরিয়ে আনতে পারে স্বাভাবিক ঘুম। আর দীর্ঘদিনের সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রেসক্রিপশন মেনে সীমিত সময়ের জন্যই ঘুমের ওষুধ ব্যবহার করা উচিত— নইলে সাময়িক স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে এক গভীর নির্ভরতার ফাঁদ।
বিশ্বকাপের মঞ্চে একবার শচীন তেন্ডুলকার বাবাকে হারিয়ে কেনিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে দলকে জিতিয়েছিলেন। রঞ্জি ট্রফির ম্যাচে একবার বিরাট কোহলি তাঁর বাবাকে হারিয়েও দিল্লির হয়ে খেলে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন। এরকম বহু নজির আছে যেখানে বাবা কিংবা মাকে শেষ বিদায় জানিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন তারকা পুত্ররা। এই তো কিছুদিন আগেও রিঙ্কু সিং বাবাকে বিদায় জানিয়ে টি ২০ বিশ্বকাপের মঞ্চে মাঠে এসে গিয়েছিলেন। তিনি হয়তো সেই ম্যাচ খেলেননি, কিন্তু প্রিয় জনকে বিদায় জানিয়ে দলের জন্য আত্মত্যাগের এই নিদর্শনগুলোই প্রমাণ করে সবার ওপর নিজের কাজটাই বড়।
সতীর্থের মাকে দেখতে ধোনি
এবার তেমনি দেখা গেল আইপিএলের মাঠে। চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে খেলতে নেমেছিলেন বোলার মুকেশ চৌধুরী। যিনি মুম্বইয়ের টাটা ক্যান্সার হাসপাতালে মাকে হারিয়েও দলের জন্য থেকে অপরূপ এক দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। মুকেশ মহারাষ্ট্রের ক্রিকেটার, আর আইপিএল ম্যাচে তিনি এই নজির দেখিয়েছেন মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধেই। ম্যাচটি চেন্নাই জিতেছে। মুকেশ ৩১ রান দিয়ে এক উইকেট পেয়েছেন। তার চেয়েও বড় বিষয় হল, তিনি মায়ের শেষ কৃত্য সেরেই চেন্নাই শিবিরে চলে এসেছেন। তাঁকে দেখে দলের সতীর্থরাও বিস্মিত। এমনকী মাহিন্দ্র সিং ধোনি পর্যন্ত মুকেশের এই দলের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখে মুগ্ধ। তিনি সারাক্ষণ ছোট ভাইয়ের মতো মুকেশকে আগলে রেখেছেন। দলের অধিনায়ক ঋতুরাজ গায়কোয়াড জানিয়েছেন, মুকেশ বুঝতে পেরেছে দলে তাঁর প্রয়োজন রয়েছে। তাই মায়ের শেষ কাজ করেই ও আমাদের শিবিরে যোগ দিয়েছে।
মা ছিলেন মুকেশের প্রেরণা
এমন ঘটনায় সাধারণত যে কোনও খেলোয়াড় মুষড়ে পড়েন। সেটি মুকেশের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে। তিনি মা বলতে অজ্ঞান ছিলেন। মা প্রেম দেবী ছেলের ক্রিকেট খেলার প্রেরণা ছিলেন। মাকে হারিয়ে যে কোনও সন্তান দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে যায়। কিন্তু নিজের ফোকাস নড়তে দেননি এই পেসার।
চেন্নাই থেকেই শুরু মুকেশের চেন্নাই সুপার কিংস থেকেই আইপিএলে শুরু করেন। এই দলের হয়ে চার মরশুম কাটিয়ে দিলেন মুকেশ। ২০২২ সালে যোগ দিলেও ২০২৪ সালে এসে দলের হয়ে নিয়মিত হন। ২০২৫ সালে যদিও খানিক ছন্দপতন ঘটে। এবার দ্বিতীয় ম্যাচে তিনি আবারও সহজাত ছন্দে ফিরেছেন। কিন্তু এমন একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা মুকেশকে চেন্নাই শিবিরে কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দিল সন্দেহ নেই।
২০২১ বা ২০২০-এর সেই লকডাউনের দিনগুলোর কথা মনে আছে? দিল্লির গুরগাঁও থেকে মুম্বই বা বেঙ্গালুরু—শহুরে মধ্যবিত্তের ঘরে আবার ফিরে এসেছে সেই চেনা ছবি। সাতসকালে সবজি কাটা, অফিসের আগে তাড়াহুড়ো করে ঘর ঝাড় দেওয়া, আর রাত জেগে এঁটো বাসন মাজা। তবে এবার কোনো অতিমারি নয়, ঘরের লক্ষ্মীদের এই আকস্মিক ‘অন্তর্ধানের’ কারণ পশ্চিমবঙ্গ বা অন্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন।
দিল্লি-এনসিআর বা বেঙ্গালুরুর মতো শহরগুলো যাদের অদৃশ্য হাতের পরিশ্রমে সচল থাকে, সেই পরিযায়ী গৃহকর্মীদের এক বিশাল অংশ ভোট দিতে নিজেদের গ্রামে ফিরে গিয়েছেন। আর তার ফলেই কার্যত ধসে পড়েছে শহরের দৈনন্দিন ছন্দ। মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন দিশেহারা। ১০ মিনিটের পরিষেবায় ঘর পরিষ্কার বা রান্নার লোক দেওয়ার যে অ্যাপগুলো বাজারে রয়েছে, চাহিদার চাপে সেগুলোও এখন আর ‘ইনস্ট্যান্ট’ পরিষেবা দিতে পারছে না।
গুরগাঁওয়ের বাসিন্দা সুস্মিতা মারিকের পরিস্থিতিই ধরা যাক। সদ্য মা হওয়া সুস্মিতাকে একদিকে যেমন অফিসের কাজ সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনাও করতে হচ্ছে। তাঁর পরিচারিকা পশ্চিমবঙ্গের জওগ্রামের বাসিন্দা। ভোট দিতে যাওয়ার সময় তিনি বলে গিয়েছেন, “যেতেই হবে, নাহলে ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেবে।” সুস্মিতার আক্ষেপ, “মা সাহায্য করতে চান, কিন্তু এই বয়সে তাঁকে দিয়ে কাজ করাতে ইচ্ছা করে না। আবার অফিসের কাজ সামলে একা সবটা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন গৃহবধূদের অসহায়তার ভিডিও ভাইরাল। রান্নাবান্না, ঘর মোছা আর অফিসের কাজ—সব মিলিয়ে শরীর ও মন দুই-ই আর সায় দিচ্ছে না। মহামারির সময়ে তাও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর সুযোগ ছিল, কিন্তু এখন অফিস যাওয়া আর ঘরের কাজ সামলানো এক চরম অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপণন পেশার সাথে যুক্ত সুকুমার দাস জানাচ্ছেন, অফিসের কাজের চাপে বা ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করার জন্য ছুটি চাওয়াটাও এখন এক বড় বিড়ম্বনা।
মজার বিষয় হল, ভোট দিতে যাওয়ার পেছনে এই কর্মীদের মনে কাজ করছে এক গভীর আতঙ্ক ও প্রত্যাশা। কেউ বলছেন, “ভোট না দিলে নাকি নাগরিকত্ব থাকবে না।” আবার কারওর কপালে চিন্তার ভাঁজ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা নিয়ে—”ভোট না দিলে কি আর এই সরকারি সাহায্য পাওয়া যাবে?” সরকারি প্রকল্পের সুবিধা হারানো বা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার ভয় তাঁদের কয়েক হাজার কিলোমিটার উজিয়ে গ্রামে ফিরতে বাধ্য করছে।
শহরের মানুষ এখন গুগল ক্যালেন্ডারে কাজের সময় ভাগ করে বা ভোরের অ্যালার্ম কয়েক ঘণ্টা এগিয়ে দিয়ে কোনওমতে ঘর সামলাচ্ছেন। সবাই জানেন এই সমস্যা সাময়িক, ভোট মিটলেই আবার সব স্বাভাবিক হবে। কিন্তু এই কয়েকটা সপ্তাহ ভারতের নগরকেন্দ্রিক জীবনকে এক অমোঘ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল—যে কাজগুলোকে আমরা এতদিন ‘সামান্য’ বলে এড়িয়ে চলতাম, সেই কাজগুলো থেমে গেলেই যে আসলে থমকে যায় আস্ত একটা শহর।
দুর্গাপুর: গণতন্ত্রের উৎসব শেষ হতেই যেন আর এক ‘উৎসবের’ সূচনা! একদিন আগেই বৈশাখের তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে রেকর্ড ভোটদানের নজির গড়েছিল বাংলা। বুথের সামনে দীর্ঘ লাইন, মানুষের চোখে দায়িত্ববোধের ঝলক—সব মিলিয়ে ছিল এক অন্য ছবি।
কিন্তু ঠিক তার পরের দিন, শুক্রবার সকালে, দুর্গাপুরে দেখা গেল একই রকম লাইন… তবে গন্তব্য বদলে গেছে! ভোটকেন্দ্র নয়, এবার সেই ভিড় মদের দোকানের সামনে।
শহরের সিটি সেন্টার থেকে বেনাচিতি বাজার, লিংক রোড থেকে ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক—যেদিকে চোখ যায়, শুধু লাইন আর লাইন। তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৪০ ডিগ্রি, তবু কারও তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। কাঁকসার পানাগড়, অন্ডাল, উখরা—প্রায় গোটা শিল্পাঞ্চলেই একই ছবি। মাথায় গামছা, হাতে ব্যাগ, কারও হাতে বড় থলি—যেন আগেভাগেই প্রস্তুতি সেরে রেখেছিলেন ক্রেতারা!
দৃশ্য দেখে প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন—আবার কি ভোট? নাকি কোনও সরকারি পরিষেবা? কিন্তু কৌতূহলের পর্দা সরতেই সামনে এল আসল কারণ—পাঁচ দিন পর খুলেছে মদের দোকান!
নির্বাচনের আগে ১৯ এপ্রিল থেকে জারি হয়েছিল ‘ড্রাই ডে’। সেই নিষেধাজ্ঞা কাটতেই যেন বাঁধ ভাঙা স্রোত! সকাল হতেই দোকানের সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন সুরাপ্রেমীরা। কেউ কেউ আবার ভোর থেকেই লাইনে জায়গা পাকা করে ফেলেছেন।
এক দোকানকর্মীর কথায়, “উপরে থেকে নির্দেশ ছিল, তাই আজ খুলেছি। তবে ভিড় দেখে আবার বন্ধ করার নির্দেশও আসতে পারে। সকাল থেকেই যা ভিড়, সামাল দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে!”
শুধু দুর্গাপুরেই নয়, একই ছবি রাজ্যের নানা প্রান্তে—বালিগঞ্জ, বেহালা, বারুইপুর থেকে বাঁকুড়া—সব জায়গাতেই ‘লাইন-জ্বর’। ভোটের লাইনে যে ধৈর্য আর উৎসাহ দেখা গিয়েছিল, সেটাই যেন একদিনে রূপ বদলে দাঁড়িয়েছে মদের লাইনে।
প্রশাসন অবশ্য পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে। তবে এই ছবিই এখন বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—গণতন্ত্রের দায়িত্ব পালন আর ব্যক্তিগত চাহিদার টানে মানুষের এই সমান উন্মাদনা, সমাজের কোন বাস্তবতাকে তুলে ধরছে? ভোটের উত্তাপের পরেই ‘বোতলের উন্মাদনা’—রাজ্যজুড়ে এখন এটাই দিনের সবচেয়ে বড় চর্চা!