কেমন আছে কলকাতার নদীবন্দর? ছবি - Google, গ্রাফিক্স - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস
২৯শে মে, ২০২৬
কলকাতার জন্ম কোনও রাজপ্রাসাদকে ঘিরে নয়, জন্ম এক নদীকে ঘিরে। ভাগীরথী-হুগলি নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যের সেই উপনিবেশিক নগর, যার নাম পরে হয়ে ওঠে কলকাতা। এই শহরের ইতিহাসে নদী শুধু জলরেখা নয়, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং নগর-সভ্যতার প্রধান অক্ষ। আজও হাওড়া ব্রিজ (Howrah Bridge), প্রিন্সেপ ঘাট (Prinsep Ghat) কিংবা বাবুঘাটের দিকে তাকালে সেই নদীকেন্দ্রিক শহরের স্মৃতি ভেসে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হল— যে নদী কলকাতাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, আজ সেই নদী ও বন্দরকে কি কলকাতা বাঁচিয়ে রাখতে পারছে?
ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রধান নদীবন্দর। Syama Prasad Mookerjee Port-এর পূর্বসূরি কলকাতা পোর্টই ছিল উপমহাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার। গবেষকদের মতে, ভারতের একমাত্র বড় riverine port বা নদীবন্দর হিসেবে কলকাতার আলাদা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গৌরবের শরীরে জমেছে পলি, অব্যবস্থা ও রাজনৈতিক উদাসীনতা।

কলকাতার ঘাট-সংস্কৃতি একসময় ছিল শহুরে জীবনের কেন্দ্র। ভোরের স্নান, সন্ধ্যার আরতি, নৌকা-বাণিজ্য, বিসর্জন, সাহিত্যিক আড্ডা— সবই নদীকে ঘিরে। গবেষকরা হুগলি নদীতীরকে cultural landscape বা সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে স্থাপত্য ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক
খিদিরপুর ডক, গার্ডেনরিচ, আর্মেনিয়ান ঘাট, বাবুঘাট— প্রতিটি জায়গা বহন করে বহুস্তরীয় ইতিহাস। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জাহাজ যেমন এখানে নোঙর ফেলেছে, তেমনই স্বাধীনতা আন্দোলনের গোপন যোগাযোগও চলেছে এই নদীপথে। কলকাতার বহু বনেদি পরিবারের উত্থানও এই নদী-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।
কিন্তু স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে নদীর সঙ্গে শহরের সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে। নদী হয়ে ওঠে শহরের পেছনের উঠোন ! যেখানে ফেলা যায় বর্জ্য, নোংরা ও পরিকল্পনাহীন নির্মাণ।

কলকাতা বন্দরের সবচেয়ে বড় সংকট তার ভৌগোলিক অবস্থান। সমুদ্র থেকে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার ভিতরে অবস্থিত এই নদীবন্দরে বড় জাহাজ আনতে হলে নিয়মিত ড্রেজিং বা পলি অপসারণ জরুরি। কিন্তু বছর বছর বিপুল অর্থ খরচ করেও নদীর নাব্যতা কমছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় যেখানে ৯ মিটার ড্রাফট ছিল, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে ৭ মিটারের আশেপাশে নেমে এসেছে।
এর ফলে বড় আন্তর্জাতিক কার্গো জাহাজ কলকাতায় ঢুকতে চায় না। অনেক জাহাজকে হলদিয়ায় মাল নামিয়ে ছোট জাহাজে কলকাতায় পাঠাতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুই-ই বাড়ছে। একসময়ের বাণিজ্যিক রাজধানী আজ লজিস্টিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
বন্দরের সঙ্গে যুক্ত বহু পুরনো শিল্পাঞ্চলও আজ মৃতপ্রায়। খিদিরপুর ও গার্ডেনরিচের শ্রমজীবী সংস্কৃতি বদলে গেছে। ডকের আশেপাশে একসময় যে অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য ছিল, তা এখন অনেকটাই স্মৃতিনির্ভর।
শহরের পানীয় জল, নিকাশি ও জলবায়ুর ভারসাম্যের সঙ্গে জড়িয়ে হুগলি নদী। কিন্তু দূষণ ও নগরায়নের চাপে নদী ও জলাভূমি বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি, যাকে অনেকেই শহরের কিডনি বলেন, যা ক্রমশ দখল ও দূষণের শিকার। একইসঙ্গে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও নদীতীরবর্তী জলাশয়গুলির পরিবেশগত অবনতি নিয়েও আদালত পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
বর্ষায় নদীর জল ঘোলা হয়ে গেলে কলকাতার জল সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পলির পরিমাণ ও দূষণ বাড়ায় জল পরিশোধন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে নদীকে কেন্দ্র করে শহরের যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ছিল, তা ভেঙে যাচ্ছে দ্রুত।
কলকাতার নদীতীর এখন নতুন সংঘর্ষের জায়গা— ঐতিহ্য বনাম বাণিজ্য। একদিকে নদীর ধারে রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট এর স্বপ্ন, অন্যদিকে ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন। মিলেনিয়াম পার্ক থেকে প্রিন্সেপ ঘাট পর্যন্ত নদীতীরকে সাজানোর একাধিক প্রকল্প হয়েছে। আবার নতুন করে রিভার ক্রুজ টার্মিনাল তৈরির পরিকল্পনাও চলছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল— উন্নয়ন কি শুধুই কংক্রিটের? নদীর ধারে কাচের ক্যাফে, আলোকসজ্জা ও পর্যটন প্রকল্প তৈরি করলেই কি নদী বাঁচে? নাকি প্রয়োজন নদীর নিজস্ব প্রবাহ, ঘাটের ঐতিহ্য, জলাভূমির পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনর্জাগরণ?
বিশ্বের বহু শহর— লন্ডন, হামবুর্গ, সিঙ্গাপুর— তাদের পুরনো বন্দর এলাকাকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতাও পারে, যদি পরিকল্পনা হয় দীর্ঘমেয়াদি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমত, কলকাতা বন্দরের ভবিষ্যৎকে শুধুই কার্গো পরিবহণে সীমাবদ্ধ না রেখে হেরিটেজ পোর্ট ইকনমি হিসেবে ভাবতে হবে। পুরনো ডক, ওয়্যারহাউস ও নদীতীরবর্তী স্থাপত্যকে পর্যটন, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, হুগলি নদীকে পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। নদী ও খালের প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা ছাড়া জলাবদ্ধতা, দূষণ বা জলসংকটের সমাধান হবে না।
তৃতীয়ত, শহরের মানুষকে নদীর কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কলকাতার নাগরিক জীবনে নদী এখন প্রায় অদৃশ্য। অথচ এই শহরের আত্মা এখনও নদীতেই লুকিয়ে।
কলকাতার ইতিহাস বলছে, এই শহর নদীকে কেন্দ্র করে জন্মেছিল। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভবিষ্যৎও হয়তো নির্ভর করছে সেই নদীকেই নতুন করে আবিষ্কারের উপর। নইলে একদিন হয়তো হুগলির ধারে দাঁড়িয়ে শুধু ইতিহাসই দেখা যাবে, নদী নয়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।