সরকারী স্কুলের ছাত্র। প্রতীকী ছবি- Google
৬ই জুন, ২০২৬
রাজ্যের স্কুলশিক্ষা দফতর ফের একবার সরকারি, সরকার-পোষিত এবং সরকার সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষকদের বেসরকারি টিউশন বা গৃহশিক্ষকতা নিয়ে কড়া অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, নিয়ম ভেঙে কোনও শিক্ষক ব্যক্তিগত টিউশন করলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা স্কুল পরিদর্শকদেরও বিষয়টি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এমন নির্দেশ কি এই প্রথম? মোটেই নয়। গত এক দশকে একাধিকবার শিক্ষা দফতর, স্কুল সার্ভিস কমিশন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক মহল থেকে একই ধরনের নির্দেশ জারি হয়েছে। ২০১৮ সালেও সরকারি স্কুলশিক্ষকদের ব্যক্তিগত টিউশন বন্ধে কড়া নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়েও বলা হয়েছিল, অভিযোগ পেলে তদন্ত হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তার কতটা কার্যকর হয়েছিল, তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে।
শিক্ষা মহলের একাংশের মতে, সমস্যার মূল কারণ নির্দেশ জারি নয়, তার বাস্তবায়ন। শহর থেকে গ্রাম—অসংখ্য সরকারি স্কুলে বছরের পর বছর ধরে ছাত্রসংখ্যা কমেছে। বহু অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, স্কুলে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত টিউশনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, শিক্ষকরা স্কুলে পাঠদানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত কোচিংয়ের মাধ্যমেই বেশি সময় দিচ্ছেন—এমন অভিযোগও বারবার উঠেছে।
ফলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে সরকারি স্কুলে নাম নথিভুক্ত থাকলেও প্রকৃত শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে টিউশন সেন্টার। শিক্ষা দফতরের বিভিন্ন পরিসংখ্যানেও দেখা গিয়েছে, বহু সরকারি স্কুলে ছাত্রসংখ্যা ক্রমশ কমছে। কোথাও কোথাও একটি শ্রেণিতে হাতে গোনা কয়েকজন পড়ুয়া নিয়ে ক্লাস চলছে। বিপরীতে কোচিং সেন্টার এবং ব্যক্তিগত টিউশনের বাজার ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র টিউশন বন্ধের নির্দেশ দিলেই সরকারি স্কুলে ছাত্র ফিরবে না। তার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, আধুনিক পরিকাঠামো এবং জবাবদিহি ব্যবস্থা। কারণ অভিভাবকরা শেষ পর্যন্ত সন্তানের ভাল শিক্ষাই চান। যদি তারা মনে করেন স্কুলেই পর্যাপ্ত পড়াশোনা হচ্ছে, তাহলে অতিরিক্ত টিউশনের প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।
এখানেই উঠে আসছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই নতুন নির্দেশ কি সত্যিই কার্যকর হবে? নাকি আগের মতোই কিছুদিন আলোচনা চলার পর বিষয়টি আবার ধামাচাপা পড়ে যাবে?
শিক্ষক সংগঠনের একাংশ বলছে, নজরদারি বাড়ানো হলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। কিন্তু অন্যদের মতে, শুধুমাত্র ডিআই অফিসের নির্দেশ বা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের রিপোর্টের উপর নির্ভর করলে বাস্তব ছবি ধরা কঠিন। কারণ গৃহশিক্ষকতা সাধারণত স্কুলের বাইরে হয় এবং তা প্রমাণ করাও সহজ নয়।
তবে এই নির্দেশের একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। শিক্ষা দফতর অন্তত স্বীকার করছে যে সমস্যাটি বাস্তব এবং তা মোকাবিলা করার প্রয়োজন রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন অভিযোগের ভিত্তিতে আদৌ কোনও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয় কি না। কারণ অতীতে নির্দেশ ছিল, অভিযোগও ছিল, কিন্তু শাস্তির নজির ছিল খুবই সীমিত।
সরকারি স্কুলগুলির করিডর আজও বহু জায়গায় ফাঁকা। অনেক শ্রেণিকক্ষে ছাত্রসংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কম। তাই নতুন নির্দেশিকার প্রকৃত সাফল্য বিচার হবে কাগজে-কলমে নয়, স্কুলের বেঞ্চে। আগামী কয়েক মাসে যদি সরকারি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়ে, শ্রেণিকক্ষ আবার গমগম করে এবং অভিভাবকদের আস্থা ফিরে আসে, তবেই বলা যাবে এই নির্দেশ সত্যিই ফলপ্রসূ হয়েছে। অন্যথায়, এটি আরও একটি সরকারি নোটিশ হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে—যার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ, কিন্তু বাস্তব প্রভাব ছিল সীমিত।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।