

হাওড়া স্টেশনের সাথে জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস। প্রতীকী ছবি - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
২৫শে জুন, ২০২৬
আজ লক্ষ লক্ষ যাত্রীর ভিড়, ট্রেনের হুইসেল আর ব্যস্ততার কেন্দ্র। কিন্তু একসময় এই হাওড়া স্টেশনই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যুদ্ধযন্ত্রের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি।
কলকাতার পরিচয় বলতে অনেকের মনেই প্রথমে ভেসে ওঠে হাওড়া ব্রিজের ছবি। গঙ্গার বুকে ইস্পাতের সেই বিশাল কাঠামো যেন শহরের প্রতীক। প্রতিদিন কয়েক লক্ষ মানুষ এই সেতু পেরিয়ে যাতায়াত করেন। তার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে হাওড়া স্টেশন, ভারতের অন্যতম ব্যস্ততম রেলস্টেশন।
কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই স্টেশন এবং তার আশপাশের অঞ্চল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক কৌশলের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী ছিল। আজ যেখানে যাত্রীদের কোলাহল, সেখানে একসময় ছিল সৈন্যবাহিনীর পদধ্বনি, যুদ্ধসামগ্রীর স্তূপ এবং বিমান হামলার আতঙ্ক।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে যুদ্ধের আঁচ কলকাতায় তেমনভাবে পৌঁছয়নি। কিন্তু ১৯৪১ সালের শেষে জাপান যখন পার্ল হারবারে হামলা চালায় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত অগ্রসর হতে শুরু করে, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। ব্রিটিশ শাসকদের কাছে কলকাতা হয়ে ওঠে পূর্বাঞ্চলীয় যুদ্ধক্ষেত্রের প্রাণকেন্দ্র।
বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) জাপানের দখলে চলে যাওয়ার পর ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই সময় আসাম, নাগাল্যান্ড এবং উত্তর-পূর্ব সীমান্তে সৈন্য ও রসদ পাঠানোর প্রধান প্রবেশদ্বার ছিল হাওড়া স্টেশন।
হাজার হাজার ব্রিটিশ, ভারতীয়, অস্ট্রেলীয় এবং মার্কিন সেনা প্রতিদিন এই স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর জন্য অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্যসামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সামরিক যানবাহন রেলপথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হত। যুদ্ধকালীন বহু সরকারি নথিতে হাওড়াকে ‘ইস্টার্ন গেটওয়ে অব দ্য ওয়ার’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৪২ সালের পর জাপানি বাহিনী যখন ভারতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন কলকাতায় বিমান হামলার আশঙ্কা তীব্র হয়। হাওড়া স্টেশন ও হাওড়া ব্রিজকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কারণ এই দুই স্থাপনা ধ্বংস করতে পারলে পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ত।
১৯৪২ এবং ১৯৪৩ সালে জাপানি বিমান কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক বোমাবর্ষণ করে। যদিও হাওড়া স্টেশন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েনি, তবু আতঙ্কে বহু মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে পালিয়ে যান। রাত নামলেই ব্ল্যাকআউটের নির্দেশ জারি হত। হাওড়া ব্রিজ ও স্টেশনের আলো নিভিয়ে দেওয়া হত যাতে শত্রুপক্ষের বিমান সহজে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে না পারে।
ইতিহাসবিদদের মতে, যুদ্ধের সময় হাওড়া স্টেশন শুধুমাত্র একটি রেলস্টেশন ছিল না; এটি ছিল গোটা পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকেই উত্তর-পূর্ব ভারতের যুদ্ধফ্রন্টে পৌঁছত হাজার হাজার টন রসদ।
যুদ্ধ শেষ হয়েছে প্রায় আট দশক আগে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যও ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে। কিন্তু হাওড়া স্টেশনের পুরনো প্ল্যাটফর্ম, লাল ইটের ভবন আর গঙ্গার উপর দাঁড়িয়ে থাকা সেতুটি এখনও নীরবে সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে।
আজ ট্রেন ধরতে ছুটে চলা মানুষ হয়তো জানেন না, তাঁদের পায়ের নীচের এই মাটিতেই একদিন ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ যুদ্ধের পদধ্বনি শোনা গিয়েছিল। হাওড়া ব্রিজের ইস্পাত আর হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম তাই শুধু যাত্রাপথের অংশ নয়, তারা এক যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর স্মৃতিবাহী নীরব দলিলও।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
