

জঙ্গলে রাজরাসাদ। ইউরোপ ও ভারতের মেলবন্ধন। - ছবি Google.
১৬ই জুলাই, ২০২৬
আজকের ঝাড়গ্রামকে অনেকেই চিনে নেন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই জেলার নাম, পরিচয় এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে রাজপুত বংশোদ্ভূত ঝাড়গ্রামের রাজপরিবার। ইতিহাস বলছে, ষোড়শ শতকের শেষভাগ। মুঘল সম্রাট আকবর বাংলায় নিজের শাসন সুসংহত করতে সেনাপতি রাজা মান সিংহকে পাঠিয়েছিলেন। সেই অভিযানে তাঁর অন্যতম সহযোগী ছিলেন রাজপুত যোদ্ধা সর্বেশ্বর সিংহ।
লোককথা ও ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, জঙ্গলখণ্ড অঞ্চলের স্থানীয় শাসকদের পরাজিত করার পর সর্বেশ্বর সিংহ এই অঞ্চলের শাসনভার পান। পরে তিনি 'মল্লদেব' উপাধি গ্রহণ করেন। তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঝাড়গ্রাম রাজপরিবার। ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই জনপদের নাম রাখা হয় 'ঝাড়গ্রাম'— অর্থাৎ জঙ্গলের গ্রাম।
এরপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মল্লদেব বংশের রাজারা এই অঞ্চলের প্রশাসন, কৃষি, বনসম্পদ ও স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
প্রথমদিকে রাজপরিবারের বাসস্থান ছিল প্রতিরক্ষামূলক দুর্গ। চারদিকে জঙ্গল, মাঝে-মধ্যেই বিদ্রোহ এবং দস্যুদের আক্রমণের আশঙ্কা থাকায় দুর্গ নির্মাণই ছিল নিরাপদ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে পরিস্থিতি। বিংশ শতকের গোড়ায় রাজা নরসিংহ মল্লদেব সিদ্ধান্ত নেন, নতুন এক রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করা হবে, যা শুধু বাসস্থান নয়, রাজকীয় ঐতিহ্যের প্রতীকও হবে।
১৯২২ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। প্রায় নয় বছরের পরিশ্রমের পর ১৯৩১ সালে সম্পূর্ণ হয় বর্তমান ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি।

ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির স্থাপত্য পশ্চিমবঙ্গের অন্য রাজবাড়িগুলির থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানে ইউরোপীয় প্রাসাদের নকশার সঙ্গে ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে।
ইন্দো-সারাসেনিক ধাঁচে নির্মিত এই প্রাসাদে রয়েছে সুউচ্চ গম্বুজ, দীর্ঘ বারান্দা, বিশাল স্তম্ভ, খিলান, রাজকীয় প্রবেশদ্বার এবং সুবিশাল বাগান। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ব্রিটিশ আমলের কোনও গভর্নরের প্রাসাদ, আবার কাছ থেকে দেখলে ভারতীয় রাজকীয় স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ব্রিটিশ আমলে বদলে যায় রাজাদের ভূমিকা
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস 'পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট' চালু করার পর বাংলার বহু রাজপরিবারের মতো ঝাড়গ্রামের রাজাদের ক্ষমতারও পরিবর্তন ঘটে।
তাঁরা আর স্বাধীন শাসক রইলেন না। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে জমিদার হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন। সামরিক ও বিচারব্যবস্থার ক্ষমতা চলে গেল ব্রিটিশ প্রশাসনের হাতে। তবে রাজপরিবার দীর্ঘদিন স্থানীয় শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাস্তা নির্মাণ, জলাধার খনন এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে জমিদারি প্রথার অবসান ঘটে। স্বাধীন ভারতের নতুন প্রশাসনিক কাঠামোয় রাজাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
তবে ইতিহাস হারিয়ে যায়নি। রাজবাড়ির একাংশ এখনও রাজপরিবারের উত্তরসূরিদের অধীনে রয়েছে। অন্য অংশকে হেরিটেজ পর্যটনের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। বহু পর্যটক আজ সেখানে রাজকীয় পরিবেশে থাকার অভিজ্ঞতা নিতে যান।

আজ ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য নয়, জঙ্গলমহলের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।
রাজবাড়ির পাশাপাশি পর্যটকদের টানে চিল্কিগড় রাজবাড়ি, কনকদুর্গা মন্দির, কাঁকড়াঝোরের জঙ্গল, হাতিবাড়ি বনাঞ্চল, ঝাড়গ্রাম ডিয়ার পার্ক ও জুলজিক্যাল পার্ক। ফলে ইতিহাস, প্রকৃতি এবং রাজকীয় ঐতিহ্য— সবকিছুর স্বাদ একসঙ্গে মেলে এই অঞ্চলে।
সময়ের সঙ্গে রাজত্ব শেষ হয়েছে, জমিদারি হারিয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতাও মুছে গিয়েছে। কিন্তু জঙ্গলের বুকের সেই রাজপ্রাসাদ আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। তার নীরব করিডর, বিশাল গম্বুজ আর পুরনো দেওয়াল যেন আজও শোনায় জঙ্গলমহলের রাজাদের উত্থান, গৌরব আর পতনের গল্প।
ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি তাই শুধু একটি পর্যটনস্থল নয়— এটি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল, যেখানে জঙ্গলের নিস্তব্ধতার মধ্যেও আজও প্রতিধ্বনিত হয় এক হারিয়ে যাওয়া রাজসাম্রাজ্যের পদধ্বনি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
