

রথের বৃষ্টি। প্রতীকী ছবি - Google.
১৬ই জুলাই, ২০২৬
রথের দিন সকালে আকাশে কালো মেঘ জমে থাকতে দেখে অনেকেই আজও বলে ওঠেন, 'দেখেছ? রথের বৃষ্টি এসেছে।' আবার বিকেলের দিকে রথের মেলায় গিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম জিলিপি না খেলে যেন উৎসবটাই পূর্ণ হয় না। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, রথযাত্রার সঙ্গে বৃষ্টির এই যোগ কোথা থেকে এল? আর জগন্নাথদেবের রথের সঙ্গে জিলিপির সম্পর্কই বা কী? উত্তর খুঁজতে গেলে একসঙ্গে খুলে যায় পুরাণ, আবহাওয়া-বিজ্ঞান, খাদ্যসংস্কৃতি এবং বাংলার লোকজ জীবনের বহু পুরনো দরজা।
আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা। হিন্দুধর্মে বিশ্বাস করা হয়, এই দিন জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা নীলাচল ছেড়ে মাসির বাড়ি গুন্ডিচা মন্দিরে যান। পুরীতে লক্ষ লক্ষ ভক্তের ঢল নামে। বাংলায়ও মাহেশ, গুপ্তিপাড়া, হুগলি, কলকাতা-সহ অসংখ্য জায়গায় রথের মেলা বসে। অধুনা তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দিঘা ৷ কিন্তু ধর্মীয় আচার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও বড় হয়ে ওঠে উৎসবকে ঘিরে মানুষের আবেগ।
বাংলার লোকসংস্কৃতিতে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা, 'রথের দিন বৃষ্টি হবেই।' অনেক প্রবীণ মানুষ এখনও বলেন, "রথের দিন বৃষ্টি না হলে বছরটাই যেন ঠিকমতো শুরু হল না।"
পুরাণে কোথাও স্পষ্ট করে লেখা নেই যে রথযাত্রার দিন বৃষ্টি হবেই। তবে ওড়িশা এবং বাংলার বৈষ্ণব লোককথায় একটি বিশ্বাস প্রচলিত। বলা হয়, জগন্নাথদেব যখন রথে চেপে মাসির বাড়ি রওনা দেন, তখন দেবরাজ ইন্দ্র নিজেই বর্ষণ করে তাঁর যাত্রাকে শুভ করেন। কেউ বলেন, এটি দেবতার আশীর্বাদের প্রতীক; কেউ বলেন, প্রকৃতি নিজেই ঈশ্বরকে অভিষেক করে।
এই বিশ্বাসের কোনও শাস্ত্রীয় ভিত্তি না থাকলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তা লোকজ সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
যেমন রথ মানেই বৃষ্টি, তেমনই রথ মানেই জিলিপি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জগন্নাথদেবের নিত্যভোগে বা পুরীর মহাপ্রসাদে জিলিপির বিশেষ স্থান নেই। তা হলে বাংলায় রথের সঙ্গে এই মিষ্টির এত নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হল কীভাবে?
ইতিহাসবিদদের মতে, উত্তর লুকিয়ে রয়েছে রথের মেলার অর্থনীতিতে। একসময় গ্রামবাংলায় রথের মেলা ছিল বছরের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক উৎসব। দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন। এমন একটি মিষ্টির প্রয়োজন ছিল, যা দ্রুত তৈরি করা যায়, অনেকক্ষণ ভালো থাকে, কম খরচে বেশি মানুষের কাছে বিক্রি করা যায় এবং গরম গরম খেতে সুস্বাদু লাগে। জিলিপি সেই সব শর্তই পূরণ করেছিল।
কড়াইভর্তি ফুটন্ত তেলে পাক দিয়ে ভেজে সঙ্গে সঙ্গে চিনির রসে ডুবিয়ে বিক্রি, এই সহজ পদ্ধতির কারণেই রথের মেলায় সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে জিলিপি। ধীরে ধীরে উৎসব আর এই মিষ্টি একে অপরের সমার্থক হয়ে যায়।

খাদ্য ইতিহাস বলছে, জিলিপির পূর্বপুরুষের নাম ছিল 'জালাবিয়া' (Zalabiya) বা 'জুলবিয়া' (Zulbiya)। মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্যে বহু শতাব্দী আগে এই মিষ্টি তৈরি হত। আরব বণিক ও পরে তুর্কি-মুঘল শাসকদের হাত ধরে এটি ভারতীয় উপমহাদেশে আসে।
মধ্যযুগে উত্তর ভারত পেরিয়ে বাংলায় পৌঁছনোর পর স্থানীয় রন্ধনশৈলীর সঙ্গে মিশে যায় জিলিপি। চিনির রস, খাঁটি ঘি বা সর্ষের তেলে ভাজার স্বাদ এবং মেলার সংস্কৃতি, সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে বাংলার নিজস্ব উৎসবের মিষ্টি।
শপিং মল বা অনলাইন কেনাকাটার যুগে বিষয়টি কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু একসময় রথের মেলাই ছিল গ্রামের মানুষের সবচেয়ে বড় বাজার। নতুন হাঁড়ি-পাতিল, বাঁশের সামগ্রী, কাঠের খেলনা, কাঁচের চুড়ি, নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, বাঁশি, মাটির পুতুল— সবই মিলত এই মেলায়। সন্ধ্যা নামলে ভিড় জমত জিলিপির দোকানে। কড়াই থেকে সদ্য ওঠা গরম জিলিপির গন্ধে ম-ম করত চারপাশ।
সময়ের সঙ্গে রথযাত্রার অনেক চেহারা বদলেছে। কিন্তু দুটি জিনিস আজও বদলায়নি৷ আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা আর মেলার গরম জিলিপির প্রতি দুর্বলতা।
হয়তো এ কারণেই রথ বাঙালির কাছে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি বর্ষার আগমনী সুর, শৈশবের স্মৃতি, মেলার আনন্দ, পারিবারিক মিলন এবং লোকঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। তাই আজও আষাঢ়ের আকাশে মেঘ জমলেই মনে পড়ে, "রথের বৃষ্টি এসেছে", আর মেলার মোড়ে জিলিপির গন্ধ পেলেই বোঝা যায়, উৎসব সত্যিই শুরু হয়ে গেছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
