

ভগৎ সিং-এর বাংলা যোগ। গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন, The Fourth Axis.
৪ঠা আগস্ট, ২০২৬
ভগৎ সিং-এর ভগৎ সিং হয়ে ওঠার নেপথ্যে বড় ভূমিকা আছে গ্রাম বাংলার! ইংরেজ পুলিশ অফিসার সন্ডার্সকে হত্যা ও পরবর্তীতে জাতীয় পরিষদে বোমা বর্ষণ, ভগৎ সিংয়ের এই দুই সাড়া জাগানো বৈপ্লবিক কাজের মধ্যে সেতু বেঁধেছিল বর্ধমানের এক গ্রাম!
পাঞ্জাবের সেই দুর্দম কিন্তু তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত ও মানব দরদী তরুণের কলকাতা যোগের কথা অনেকেই জানেন, আবার হয়ত জানেনও না। তবে কলকাতার পর্ব পেরিয়ে তিনি গ্রাম বাংলার আরও অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিলেন। সেখানেই ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক ক্রান্তিকালে আত্মগোপন করে বেশ কিছুদিন ছিলেন ভগত সিং। এই ঘটনা ইতিহাসে কিছুটা হলেও উপেক্ষিত থেকে গিয়েছে।
লাহোর কলেজের পাঠ চুকিয়ে কলকাতায় ড্রাইভিং শিখতে এসেছিলেন ভগৎ সিং। সেটা ১৯২৪ সালের ঘটনা। শহরের গোপাল মোটর ড্রাইভিং স্কুলে তিনি ড্রাইভিং শিখেছিলেন। তারপর বছরখানেক কলকাতায় বাস ড্রাইভার হিসাবে কাজও করেছিলেন! হ্যাঁ, এই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে চরম আত্মত্যাগের প্রতীক ভগৎ সিং একসময় এই কলকাতার বুকেই বাস ড্রাইভারি করেছিলেন।
তারই মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তৎপরতা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায় ভগৎ সিংয়ের। সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯২৮ সালে দিল্লিতে প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন। এই সংগঠনের মধ্য দিয়ে ভগৎ সিং'রা প্রথম ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বরাজ (অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্বাধীনতা) এবং সমাজতন্ত্রকে মুক্তির পথ হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। এই সংগঠনের রাজনৈতিক এবং সামরিক শাখা খোলা হয়েছিল।
ভগত সিং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিপ্লবী পথে বিশ্বাসী হলেও তিনি কখনওই ব্যক্তি হত্যার পূজারী ছিলেন না। তাই ১৯২৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর লাহোরের অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপার সন্ডারস-কে তিনি ও রাজগুরু গুলি করে হত্যা করার পর তাঁদের সংগঠন পরেরদিন লাহোরের সর্বত্র পোস্টার মেরেছিল। যাতে লেখা ছিল- 'মানুষের রক্তপাত করেছি বলে আমরা দুঃখিত। কিন্তু বিপ্লবের বেদী রক্তে ধৌত করার প্রয়োজন ঘটে। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি বিপ্লব ঘটানো, যা মানুষ কর্তৃক মানুষকে সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি দেবে।’
এরপরই আত্মগোপন করার জন্য কলকাতায় চলে আসেন ভগত সিং। বাংলার বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা ভগৎ সিংয়ের সহকারি বটুকেশ্বর দত্তের জন্মভিটে ছিল বর্ধমানের খণ্ডঘোষের উয়ারি গ্রামে। ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে আত্মগোপন করার জন্য ওই গ্রামে গিয়েই প্রথমে বটুকেশ্বর দত্তের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টা ব্রিটিশদের পুরোপুরি নজর এড়িয়ে যায়নি। তারা ভগৎ সিংয়ের গতিবিধি আঁচ করে গোয়েন্দা তৎপরতা ওই এলাকায় বাড়িয়ে দেয়। বুঝতে পেরেই বটুকেশ্বর দত্ত নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গ্রামের সম্ভ্রান্ত ঘোষ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এই পরিবারটি স্বাধীনতার সংগ্রামীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে ওই ঘোষ বাড়িতে একটি গুপ্ত কক্ষ ছিল, যেটি বাইরে থেকে বোঝার কোনও উপায় ছিল না। কারণ একটি কাঠের শোকেস দিয়ে সেই গুপ্ত দরজা আড়াল করা থাকত। সেই গুপ্ত কক্ষেই প্রায় ১৫ দিন আত্মগোপন করেছিলেন ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত।
জানা যায়, ঐ গুপ্ত কক্ষে থাকাকালীনই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে ভগৎ সিংয়ের চিন্তাভাবনা আরও পরিণত রূপ পায়। কিন্তু তারই মধ্যে জাতীয় পরিষদে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা সংগ্রাম দমনের উদ্দেশ্যে 'পাবলিক সেফটি বিল' পাস করানোর উদ্যোগ গ্রহণ করলে সেই খবর এসে পৌঁছয় তাঁদের কাছে। এই বিলের মাধ্যমে বিনা বিচারে যে কোনও ভারতীয়কে দিনের পর দিন আটকে রাখার বন্দোবস্ত করছিল ব্রিটিশরা। ভগত সিং বুঝতে পারেন এই বিল পাস হওয়া ঠেকানোর সরাসরি ক্ষমতা না থাকলেও এমন একটি প্রতিবাদ করতে হবে যা গোটা দেশের আমজনতার নজর কেড়ে নেবে। যাতে মানুষ বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এই কালা কানুনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
আর তাই তাঁরা খণ্ডঘোষের উয়ারি গ্রামের ঘোষ বাড়ির গোপন আশ্রয় ছেড়ে ছদ্মবেশে দিল্লি রওনা হন। তারপর জাতীয় পরিষদে বোমা নিক্ষেপ এবং স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করার ঘটনা কমবেশি সকলেরই জানা।
এই প্রসঙ্গে মাথায় রাখতে হবে, ভগৎ সিংরা চাইলে সেদিন জাতীয় পরিষদে বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে অতি উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ কর্তাকে হত্যা করতেই পারতেন। কিন্তু সেটা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, ব্রিটিশদের সর্বোচ্চ স্তরে পাবলিক সেফটি বিলের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিবাদ প্রবলভাবে পৌঁছে দেওয়া। আর তাই বোমাটি জাতীয় পরিষদের একটি ফাঁকা জায়গা দেখে তাঁরা নিক্ষেপ করেছিলেন। ফলে মাত্র পাঁচ-ছয় জনের বেশি কেউ আহত হননি। আর যারা আহত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে মাত্র একজনকেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দরকার পড়েছিল।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
