

রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম (RLS)। প্রতীকী ছবি - The Fourth Axis.
৭ই আগস্ট, ২০২৬
রাতে পা নাড়ানোর অদম্য ইচ্ছে? কখনও ঝিঁঝিঁ ধরা, কখনও টান লাগা, আবার কখনও মনে হয় যেন পায়ের ভিতর কিছু হামাগুড়ি দিচ্ছে। শুয়ে থাকলেই বাড়তে থাকে অস্বস্তি, আর পা নাড়ালেই মিলছে সাময়িক স্বস্তি। অনেকেই এটিকে সাধারণ ক্লান্তি বা পেশির সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ এটি হতে পারে রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম (Restless Legs Syndrome বা RLS), একটি স্নায়বিক ও ঘুম-সম্পর্কিত রোগ, যা দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম এমন একটি সমস্যা, যাতে বিশ্রামের সময়, বিশেষ করে সন্ধ্যা বা রাতে, পায়ে অস্বস্তিকর অনুভূতি হয় এবং পা নাড়ানোর প্রবল ইচ্ছে জাগে। হাঁটাহাঁটি বা পা নাড়ালে সাময়িক আরাম মিললেও কিছুক্ষণ পর আবার একই সমস্যা ফিরে আসে। অনেকের ক্ষেত্রে এর জেরে রাতের ঘুম নষ্ট হয়, ফলে দিনের বেলায় ক্লান্তি, বিরক্তি ও কাজে মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়।
সব ক্ষেত্রে এর নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। অনেক সময় এটি বংশগত হতে পারে। আবার নানা শারীরিক সমস্যার কারণেও RLS দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম আয়রনের ঘাটতি, যা সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলির একটি। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস, পারকিনসন রোগ, হাত-পায়ের স্নায়ুর সমস্যা (Peripheral Neuropathy), ভিটামিন B12 বা ফোলেটের ঘাটতি, থাইরয়েডের কিছু সমস্যা এবং গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কিছু ওষুধ, বিশেষ করে নির্দিষ্ট ধরনের অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ও অ্যান্টিসাইকোটিকও উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত চা-কফি, অ্যালকোহল পান এবং ধূমপানের অভ্যাসও RLS-কে আরও তীব্র করতে পারে।
এই রোগে সাধারণত পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরা, টান লাগা, জ্বালাপোড়া বা চুলকানির মতো অনুভূতি হয়। অনেকেই জানান, মনে হয় যেন পায়ের ভিতর কিছু নড়াচড়া করছে বা হামাগুড়ি দিচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে বা শুয়ে থাকলে সমস্যা বাড়ে, কিন্তু হাঁটাহাঁটি বা পা নাড়ালে কিছুটা কমে। উপসর্গ সাধারণত সন্ধ্যা ও রাতেই বেশি হয়। ঘুমের ব্যাঘাতের কারণে দিনের বেলায় ক্লান্তি, বিরক্তি, কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ কমে যাওয়াও এই রোগের অন্যতম লক্ষণ। কিছু ক্ষেত্রে হাত বা শরীরের অন্য অংশেও একই ধরনের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনও একক পরীক্ষা নেই। প্রথমে রোগীর উপসর্গ, কখন সমস্যা বাড়ে বা কমে, পারিবারিক ইতিহাস এবং শারীরিক ও স্নায়বিক পরীক্ষা করা জরুরি। প্রয়োজনে CBC, Serum Ferritin, Serum Iron, TIBC, Vitamin B12, Folate, Kidney Function Test, Blood Sugar এবং Thyroid Function Test করানোর পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। যদি অন্য কোনও ঘুমের সমস্যা, যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়ার সন্দেহ থাকে, তবে Sleep Study (Polysomnography)-ও করা হতে পারে।
এই রোগের চিকিৎসায় প্রথম গুরুত্ব দেওয়া হয় জীবনযাত্রার পরিবর্তনে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থাকা, শোবার আগে পা স্ট্রেচিং, পায়ে ম্যাসাজ এবং গরম বা ঠান্ডা সেঁক উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি ক্যাফেইন, অ্যালকোহল ও ধূমপান কমানো বা বন্ধ করা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হয়।
যদি শরীরে আয়রনের ঘাটতি ধরা পড়ে, বিশেষ করে Serum Ferritin কম থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা প্রয়োজনে শিরায় আয়রন দেওয়া হতে পারে। উপসর্গ মাঝারি বা গুরুতর হলে Gabapentin, Pregabalin বা Gabapentin Enacarbil-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে Pramipexole, Ropinirole বা Rotigotine-এর মতো ডোপামিন অ্যাগোনিস্টও দেওয়া হয়, তবে দীর্ঘদিন ব্যবহারে কিছু রোগীর উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে বলে বর্তমানে চিকিৎসকেরা বেছে বেছে এই ওষুধ ব্যবহার করেন।
রাতে পা নাড়ানোর প্রবণতা বা অস্বস্তিকে 'সাধারণ সমস্যা' ভেবে অবহেলা না করে দীর্ঘদিন উপসর্গ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতায় জন্ম। উত্তর কলকাতার হোলি চাইল্ড ইনস্টিটিউট, বিডন স্ট্রীট স্কুলে প্রাথমিক পাঠ। এরপর ডাক্তারির পড়াশোনায় প্রবেশ। যাদবপুরে কে. পি. সি মেডিক্যাল কলেজ থেকে MBBS, তারপর পি. জি হাসপাতাল থেকে MD শেষ হতে হতে পেরিয়েছে অনেক গুলো বছর। লেখার ইচ্ছে ছোটবেলা থেকে। ভ্রমণ ভালোবাসেন। পেশা আর লেখা দুটোই উজ্জীবিত রাখে তাঁকে।
