

কোন পথে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ? ছবি - AI
পাকিস্তানের মানচিত্রে আয়তনে সবচেয়ে বড়, অথচ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা, তামা আর মূল্যবান খনিজ সম্পদে ভরপুর একটি অঞ্চল, অথচ সেখানকার আদি বাসিন্দাদের দিন কাটে অনাহারে, অন্ধকারে। হ্যাঁ, বালুচিস্তানের কথা বলছি। দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও সরকারের চরম বঞ্চনা, গুমখুন এবং অকথ্য নির্যাতনের শিকার বালুচরা।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা মূলত পাঞ্জাব ও সিন্ধ প্রদেশের নেতাদের হাতে মুষ্টিবদ্ধ। অথচ সবচেয়ে বড় প্রদেশ বালুচিস্তানের ভূমিপুত্ররা এই শাসকদের শোষণে নিজেদের ভিটেমাটিতেই কার্যত তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। আর এই সীমাহীন শোষণের বিরুদ্ধেই গর্জে উঠে প্রতি বছর ১১ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে বালুচরা। তবে এবারের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। বালুচ লিবারেশন আর্মি (BLA) সহ স্বাধীনতাপন্থী শক্তিরা এবার এই দিনটি অত্যন্ত বৃহৎ আকারে পালনের ডাক দিয়েছে। মুক্তিকামী বালুচদের এই প্রবল হুঙ্কারে আক্ষরিক অর্থেই থরহরি কম্প শুরু হয়েছে ইসলামাবাদের বুকে।
বালুচদের এই ক্ষোভ কেবল আজকের নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে এক রক্তাক্ত ঐতিহাসিক বঞ্চনার দলিল। বালুচরা অভিযোগ করে, তারা কখনওই স্বেচ্ছায় পাকিস্তানের অংশ হয়নি। বাস্তবে অখণ্ড ভারতের অংশও ছিল না বালুচিস্তান। তাই ভারত ভাগের সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তি মেনে ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট (অর্থাৎ ভারত ভাগের ঠিক তিন দিন আগে) পৃথক স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল বালুচিস্তান (তৎকালীন কালাত প্রদেশ)। আন্তর্জাতিক আইন মেনে তৎকালীন শাসক বা কালাতের খান দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভাও গঠন করেছিলেন।
এমনকী, মহম্মদ আলি জিন্নাও শুরুতে বালুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই মেনে নেওয়ার কথা বলেছিলেন।
কিন্তু সোনা, তামা ও প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এই বিশাল ভূখণ্ডের ওপর নজর পড়ে পাকিস্তানি সেনার। ফলস্বরূপ, সদ্যোজাত পাকিস্তান বিশ্বাসঘাতকতা করে। ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ গায়ের জোরে স্বাধীন বালুচিস্তানকে দখল করে নেয় তারা। কালাতের শাসককে কার্যত বন্দুকের নলের মুখে ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়েছিল। বালুচদের স্বাধীন সত্ত্বাকে বুটের তলায় পিষে মারার সেই শুরু। বালুচিস্তানে মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি এরপর থেকে পাকিস্তানের শাসকদের কাছে ডাল-ভাতের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে মুখ বাঁচাতে পাকিস্তানপন্থীরা প্রায়শই বালুচিস্তান দখলকে স্বাধীন ভারতের হায়দ্রাবাদ অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের কু-যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ইতিহাস-বিকৃত একটি নোংরামো।
প্রথমত, হায়দ্রাবাদ ছিল অখণ্ড ভারতের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি দেশীয় রাজ্য, যা চারদিক থেকে ভারত রাষ্ট্র দ্বারা বেষ্টিত। ভৌগলিকভাবেই দেশের ঠিক মধ্যিখানে পাকিস্তান-মনোভাবাপন্ন একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বাস্তবে অসম্ভব ও জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক। অন্যদিকে, বালুচিস্তান কোনোভাবেই পাকিস্তান দ্বারা বেষ্টিত ভূখণ্ড নয়; বরং এর বিশাল সীমান্ত মধ্য এশিয়া, ইরান, আফগানিস্তান এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত। বালুচিস্তানের ভূ-কৌশলগত অবস্থান সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি দেশের মতোই।
দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, স্বাধীন হায়দ্রাবাদের নিজাম ভারতে যোগ দিতে না চাইলেও সেখানকার সাধারণ মানুষের প্রায় সকলেই ভারতের অংশ হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু বালুচিস্তানের চিত্রটা সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানকার সাধারণ বালুচরা একজোট হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, একজনও পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দেননি। পুরোটাই হয়েছে সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে।
বর্তমান বালুচিস্তানের অবস্থা অনেকটা আফ্রিকার দেশ কঙ্গোর মতোই করুণ। পশ্চিমী দুনিয়া যেমন কঙ্গোর সম্পদ লুট করে তাকে পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র দেশ করে রেখেছে, ইসলামাবাদও ঠিক একইভাবে বালুচিস্তানের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ লুট করে পাক পাঞ্জাবের পেট ভরাতে ব্যস্ত। উদাহরণস্বরূপ 'সুই গ্যাস ফিল্ড'-এর কথা বলা যায়। বালুচিস্তানের সুই থেকে যে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলিত হয়, তা দিয়ে গোটা পাকিস্তানের কলকারখানা চলে, অথচ বালুচিস্তানের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে সেই গ্যাস পৌঁছায় না!
এর সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে চিন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (CPEC) এবং গদর (Gwadar) বন্দর প্রকল্প। উন্নয়নের মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে বেজিং ও ইসলামাবাদ হাত মিলিয়ে এখানকার সম্পদ পাচার করছে। গদর বন্দরে চিনা ট্রলারগুলো দেদার মাছ লুট করছে, আর স্থানীয় বালুচ মৎস্যজীবীরা পেটের দায়ে ধুঁকছে। বালুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে ইসলামাবাদের শাসকরা কার্যত ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের পথই অনুসরণ করে চলেছে।
এই অবর্ণনীয় শোষণের বিরুদ্ধে যারাই মুখ খোলে, তাদেরই তুলে নিয়ে যায় পাক রেঞ্জার্স ও গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। বালুচিস্তানে গুমখুন হয়ে যাওয়ার ঘটনা দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে। 'কিল অ্যান্ড ডাম্প' অর্থাৎ হত্যা করে লাশ গুম করে দেওয়ার বীভৎস নীতি নিয়েছে পাক সেনা। হাজার হাজার বালুচ যুবক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী আজও নিখোঁজ।
তবে অত্যাচার যতই বাড়ছে, প্রতিরোধও ততই জোরালো হচ্ছে। একদিকে ডঃ মাহরাং বালোচের মতো তরুণীরা হাজার হাজার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে অহিংস গণ-আন্দোলন ও লং মার্চ করে গোটা বিশ্বকে বালুচদের ওপর হওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, বালুচ লিবারেশন আর্মির 'মাজিদ ব্রিগেড'-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাক সেনা ও চিনা ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর লাগাতার হামলা চালিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে বালুচিস্তান আর চুপ করে মার খাবে না।
এবারের ১১ আগস্ট তাই শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, এটি শোষক ইসলামাবাদের প্রতি স্বাধীনতাপ্রিয় বালুচদের এক জোরালো হুঁশিয়ারি। নিজেদের মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে তারা যে আর এক ইঞ্চিও জমি ছাড়বে না, বরং প্রয়োজনে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পথ আরও প্রশস্ত করবে, তা বালুচ লিবারেশন আর্মি সহ স্বাধীনতাপন্থী সংগঠনগুলোর এই বৃহৎ উদযাপনের ডাকের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। বালুচদের এই নবজাগরণ এবং মুক্তিকামী গর্জনে রাতের ঘুম উড়েছে রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদের।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
