

প্রতীকী ছবি - AI
১১ই আগস্ট, ২০২৬
অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়ে বঙ্গভূমির বুকের দীর্ঘ প্রায় ১০০ বছরে 'মাৎস্যন্যায়'-এর অবসান ঘটিয়ে বাংলার সিংহাসনে বসেছিলেন জনৈক গোপাল। এর মধ্য দিয়েই সূচনা হয়েছিল পাল সাম্রাজ্যের। পাল বংশের শাসনকাল বাংলার ইতিহাসের এক সুদীর্ঘ ও গৌরবময় অধ্যায়। বাংলার এই ভূমিপুত্রের শুরু করা সাম্রাজ্য গৌরবের সঙ্গে প্রায় চার শতাব্দী ধরে টিকে ছিল।
সামরিক শক্তি, কূটনীতি, শিল্প ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পাল রাজারা বাংলাকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। পাল রাজাদের সুদীর্ঘ শাসনকালের ইতিহাসের দিকে তাকালে, এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নজরে আসে। পালেদের রাজধানীর ধারণা ও প্রশাসনিক কেন্দ্র পরিচালনার ধরন আর পাঁচটা সাম্রাজ্যের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল।
সাধারণত কোনও বিশাল সাম্রাজ্যের কথা ভাবলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একটি নির্দিষ্ট, স্থায়ী এবং বিশাল দুর্ভেদ্য রাজধানী শহরের দৃশ্য। যেমন মৌর্যদের পাটলিপুত্র বা মুঘলদের আগ্রা ও দিল্লি। কিন্তু পাল সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে এমন কোনও একক ও চিরস্থায়ী রাজধানীর অস্তিত্বই ছিল না।
পাল রাজারা শাসনকার্যের প্রয়োজনে সময়ে সময়ে তাঁদের রাজধানী বা প্রশাসনিক কেন্দ্র পরিবর্তন করতেন। তাঁদের তাম্রশাসন ও লিপিগুলো থেকে একাধিক শহরের নাম পাওয়া যায়, যেখান থেকে তাঁরা সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল-
পাল সাম্রাজ্যের প্রথম দিকে, বিশেষ করে ধর্মপাল ও দেবপালের সময়ে, পাটলিপুত্র (বর্তমান পাটনা) ছিল পালেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র।
দেবপালের তাম্রশাসনে মুদগিরি-কে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা আছে। মুদগিরি হল আজকের বিহারের মুঙ্গের। গঙ্গা তীরবর্তী এই শহরটি সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
পাল রাজবংশের শেষ শক্তিশালী রাজা রামপাল নিজের নামে 'রামাবতী' নামক একটি নতুন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। বরেন্দ্রভূমি (বর্তমান উত্তরবঙ্গ) পুনরুদ্ধারের পর এটিই হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র। আজকের মালদহ জেলায় ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে এই জায়গাটি গড়ে উঠেছিল।
পাল যুগের শেষ পর্যায়ে এবং পরবর্তীতে সেন যুগে এটি প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মালদহ জেলাতেই এটি অবস্থিত ছিল।
পাল রাজাদের রাজধানী পরিচালনার সবচেয়ে বিস্ময়কর ও ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যটি হল 'জয়স্কন্ধাবার' বা ভ্রাম্যমাণ সামরিক শিবির।
পাল রাজারা কোনও নির্দিষ্ট পাথুরে প্রাসাদে বসে শাসন করার চেয়ে, বিশাল নৌবহর নিয়ে গঙ্গা ও অন্যান্য বড় নদীপথে ঘুরে ঘুরে শাসনকার্য পরিচালনা করতে বেশি পছন্দ করতেন। এই বিশাল নৌ-শিবিরগুলোকেই বলা হত জয়স্কন্ধাবার।
নদীমাতৃক বাংলার ভৌগোলিক কাঠামোর সঙ্গে এই ব্যবস্থা ছিল পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে রাজারা খুব সহজেই বিদ্রোহ দমন, রাজস্ব আদায় এবং সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পারতেন। এক কথায়, পাল রাজাদের রাজধানী ছিল নদীর স্রোতের মতোই গতিশীল; গঙ্গার বুকে ভাসমান নৌবহরই ছিল তাঁদের প্রশাসনিক শক্তির আসল কেন্দ্র।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
