

নেতাজি। ছবি - Google, গ্রাফিক্স - The Fourth Axis.
৬ই আগস্ট, ২০২৬
সুভাষকে নিশানা করে আসলে বঙ্গভঙ্গের ষড়যন্ত্র? নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে কুৎসিত, কুরুচিকর যে আক্রমণ সম্প্রতিক সময়ে রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজ করেছেন তার নজির ভূ-ভারতে আর একটিও আছে কিনা সন্দেহ। কিন্তু এর পরবর্তী ঘটনাক্রম অনেক বড় বিপদের দিকে ইঙ্গিত করছে।
বাঙালির কাছে সুভাষচন্দ্র বসুর নামটা আবেগের। কিন্তু দেশের এই কৃতি সর্বত্যাগী সন্তানের আবেদন, গুরুত্ব শুধুমাত্র বাঙালির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। সুভাষ প্রকৃত অর্থেই দেশনায়ক, দেশনেতা। এই দেশের প্রায় সমস্ত জাতির মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রামের আত্মত্যাগের লড়াইয়ের অন্যতম মূল কাণ্ডারী মনে করেন নেতাজিকে। মহাত্মা গান্ধির জনপ্রিয়তার সঙ্গে যদি কারোর জনপ্রিয়তার তুলনা আসতে পারে তবে তিনি নেতাজি। এই দেশের একটা বড় অংশের মানুষ একমাত্র সুভাষচন্দ্র বসুকেই স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রধান কাণ্ডারী মনে করেন। এটা আবেগের বিষয়।
সুভাষচন্দ্র বসুর কংগ্রেসের সভাপতি হওয়া, গান্ধিজীর বিরোধিতার কারণে নির্বাচিত হয়েও সেই সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া, ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন, কলকাতার মেয়র হওয়া, আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তুলে প্রবল শক্তিশালী ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে নেমে পড়া- ইতিহাসের এই প্রতিটি মহা-গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিষয়ে আমরা জানি। হতে পারে তার ব্যাখ্যা এক একজনের কাছে এক এক রকম। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সুভাষকে গুরুত্ব দিয়েও তাঁর বিরোধিতা করার অভাব কোনদিনই ছিল না। আজও অনেক ঐতিহাসিক, এই দেশের অনেক সাধারণ নাগরিক মনে করেন সুভাষচন্দ্র বসুকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার কৌশল তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব যদি না নিতেন, তাহলে মুসলিম লিগ এভাবে দেশ বিভাজন করতে পারত না।
কী হলে কী হত এ আলোচনায় ঢোকার ইচ্ছে আমাদের নেই। কিন্তু এটা ঘটনা ভারতের সুদীর্ঘ ঘোষ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত ও সুগঠিত সশস্ত্র সংগ্রাম সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বেই সংঘটিত হয়েছিল। যে মানুষটি আইএএস অফিসার হয়ে এক বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে পারতেন, যার পরিবারের সেই অর্থে ঐশ্বর্যের ঘাটতি ছিল না সেই তিনি দেশের স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ-সুখ ত্যাগ করে বিপদের অগ্নিকুণ্ডে স্বেচ্ছায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিনি জানতেন, হয়ত এই অগ্নিকুণ্ডে পুড়ে খাক হয়ে যাবেন। কিন্তু তাঁর এই পদক্ষেপই ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ে অগ্নি স্পর্শের কাজ করবে।
কিন্তু সেই সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের বিতর্কিত মন্তব্য অনেককেই চমকে দিয়েছে। তবে সবচেয়ে অবাক করেছে অনন্ত মহারাজের মন্তব্যের পর তার অনুগামী রাজবংশীদের একাংশ যে ন্যাক্কারজনক ভঙ্গিতে সুভাষচন্দ্র বসুর সম্মানহানি করছে। সুভাষচন্দ্র বসুর মাথা উপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোচ রাজা! AI দিয়ে এমন সব নোংরা ছবি তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভরিয়ে দিচ্ছে এরা।
এই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যম তো বটেই, এমনকি সার্বিকভাবেই ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হচ্ছে বাংলার জনমন। বাঙালির বৃহৎ অংশ সুভাষচন্দ্র বসুর এই অপমান, অবমাননা মেনে নিতে পারছে না। আর রাজবংশীদের একাংশ তারপরও পরিকল্পিতভাবে এই কুকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
গোটা ঘটনাক্রম থেকে একটা বিষয়ে প্রবলভাবে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে- নেতাজি ভাবাবেগে পরিকল্পিত আঘাত করাটাই এর মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ বৃহত্তর বাঙালি ভাবাবেগের সচেতন বিরোধিতা বা তাকে উত্তেজিত করে তোলার চেষ্টা চলছে। পাল্টা নেতাজি প্রেমীদের একাংশ কোচবিহার রাজ পরিবার, কোচবিহারের প্রাক্তন রাজাদের অপমানিত করে একই রকম AI দিয়ে ছবি তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়ছে।
এরফলে মূলত উত্তরবঙ্গে, বিশেষত যে জেলাগুলোয় রাজবংশী সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বেশি- সেই কোচবিহার, জলপাইগুড়ির মতো জেলায় উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। শুভবুদ্ধি সম্পন্নদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, প্রশাসন যদি অবিলম্বে বিষয়টি নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ না করে তবে যে কোনও মুহূর্তে বাঙালি-রাজবংশী সমীকরণে ভয়াবহ অবনতি দেখা দিতে পারে। অনেকের আশঙ্কা এর ফলে জাতিগত সম্প্রীতির অবশিষ্টটুকু নষ্ট হয়ে সংঘর্ষের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
নেতাজি প্রেমী শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মূল স্রোতের বাঙালিদের একটি অংশের অভিমত, আসলে উত্তরবঙ্গের বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে উস্কে দেওয়ার জন্য একহীন রাজনৈতিক চক্রান্ত চলছে। বাঙালি ভাবাবেগে চরম আঘাত করে পরিকল্পিতভাবেই এক বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষ জাতিগত সংঘর্ষ ঘটানোর দিকে বিষয়টি নিয়ে যেতে চাইছে। সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির 'অত্যাচার' থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা বলে রাজবংশীদের পৃথক রাজ্যের দাবি আরও জোরদার করে তোলা সম্ভব হবে।
এই সমীকরণের দিকেই বিষয়টি ভবিষ্যতে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ সেই শুরুর কথাতেই আবার ফিরে যাওয়া যাক- আবারও বিভাজন, বঙ্গভঙ্গের এক হীন চক্রান্তের সম্মুখীন হয়েছে এই ভূমি।
তবে এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল- সমগ্র রাজবংশী সমাজ কিন্তু সুভাষচন্দ্র বসুর এই অপমানকে সমর্থন করছে না। রাজবংশীদের একটা বড় অংশ তাঁদের স্বঘোষিত মসিহা অনন্ত মহারাজ ও তাঁর অনুগামীদের এই নোংরামীর বিরুদ্ধে রীতিমতো পথে নেমেছে। শেষ পর্যন্ত সর্বত্র শুভবুদ্ধির জয় হবে এই আশা থাকুক।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
