

আলু মাকালা। প্রতীকী ছবি - AI
পুরনো কলকাতার অলিগলিতে আজও কান পাতলে শোনা যায় এক অন্য শহরের গল্প। যে শহর আজকের দেখা কলকাতা নয়, বরং আক্ষরিক অর্থেই সে ছিল কসমোপলিটান। ব্রিটিশ, পর্তুগিজ, পার্সি, আর্মেনিয়ানদের পাশাপাশি এই শহরের সংস্কৃতির ক্যানভাসে এক উজ্জ্বল তুলির টান হয়ে থেকে গিয়েছে বাগদাদি ইহুদি সম্প্রদায়।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্যবসা-বাণিজ্যের হাত ধরে এই শহরে এসে পৌঁছেছিল বাগদাদি ইহুদী সম্প্রদায়। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল এক সমৃদ্ধ রন্ধনশৈলী। আজ কলকাতা শহরে ইহুদিদের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজনে এসে ঠেকলেও, তাঁদের ফুড কালচার কলকাতার গ্যাস্ট্রোনমিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে থেকে যাবে। কলকাতার ইহুদিদের এই খাদ্য আখ্যানের এক অবিসংবাদিত ‘নায়ক’ হল একটি অত্যন্ত সাধারণ অথচ জাদুকরী পদ— আলু মাকালা (Aloo Makala)।
কলকাতার ইহুদি (এখানে বারবার কলকাতার ইহুদি সম্প্রদায় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে, কারণ ইজরায়েলে বসবাসরত ইহুদি সম্প্রদায়ের রন্ধনশৈলী আর কলকাতার ইহুদি সম্প্রদায়ের রন্ধনশৈলী প্রায় পুরোটাই আলাদা) রন্ধনশৈলীর ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘কোশার’ (Kosher) নামক অত্যন্ত কড়া একটি ধর্মীয় অনুশাসন বিধি। ইহুদিদের কোশার নিয়মের অন্যতম প্রধান শর্ত হল- মাংস এবং দুগ্ধজাত খাবার কখনও একসঙ্গে রান্না করা বা খাওয়া যাবে না।
এদিকে শুক্রবার রাতের বিশেষ প্রার্থনা বা ‘সাব্বাথ’ (Sabbath) মিলে বাগদাদি ইহুদিদের ডাইনিং টেবিলে রোস্ট চিকেনের উপস্থিতি ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক। কিন্তু কলকাতায় আসার পর তাঁরা এক সমস্যার সম্মুখীন হন। ইউরোপীয় কায়দায় রোস্ট চিকেনের সঙ্গে মাখন বা চিজ দেওয়া ম্যাশড পটেটো (Mashed Potato) পরিবেশন করা ধর্মীয়ভাবে ছিল নিষিদ্ধ। মাখন বা চিজ দুগ্ধজাত পণ্য।
এই ধর্মীয় কড়াকড়ি আর রসনার চাহিদার এক অভূতপূর্ব আপস থেকেই কলকাতার বুকে জন্ম নেয় ‘আলু মাকালা’।
মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের ইহুদিরা রান্নার মাধ্যম হিসেবে জলপাইয়ের তেল বা চিকেন ফ্যাটের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তারই বিকল্প হিসেবে কলকাতার ইহুদিরা বেছে নিয়েছিলেন স্থানীয় সাদা তেল। এদিকে বাধ্যতামূলক সাইড ডিশ হিসেবে আলু মাকালার প্রস্তুতি এক চূড়ান্ত ধৈর্যের পরীক্ষা ছিল। আস্ত, মাঝারি আকারের আলুর খোসা ছাড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে ডুবো তেলে (Deep fry) অত্যন্ত ধীর আঁচে ভাজা হয় এই পদ। এই দীর্ঘক্ষণ ভাজার ফলে আলুর বাইরের আবরণ হয়ে ওঠে কাঁচের মতো সোনালি ও মুচমুচে, আর ভেতরটা হয়ে যায় মাখনের মতো নরম— অথচ, আশ্চর্যের বিষয় হল, এতে এক ফোঁটাও মাখন থাকে না!
সাব্বাথ রাতের ডিনারে রোস্ট চিকেনের পাশে এই ‘মাখনবিহীন’ আলু মাকালা হয়ে ওঠে কলকাতার ইহুদিদের সিগনেচার ডিশ। পৃথিবীর অন্য কোনও প্রান্তের ইহুদি মেনুতে এই পদের অস্তিত্ব নেই, এটি সম্পূর্ণভাবেই কলকাতার নিজস্ব উদ্ভাবন।
আলু মাকালার মতো পদগুলোর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে কলকাতার আরও একটি অনন্য ইতিহাস, যা বিশ্ব রাজনীতির নিরিখে এক বিরল দৃষ্টান্ত। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ইহুদি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বৈরিতার কথা সর্বজনবিদিত হলেও, কলকাতার ইহুদি পরিবারগুলোতে কোশার রান্নার মতো সংবেদনশীল দায়িত্ব সামলাতেন মূলত মুসলিম বাবুর্চিরা!
যতই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকুক না কেন আসলে ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যে অনেক নিয়ম কানুনই এক। ইসলাম ধর্মে যে ‘হালাল’ নিয়ম রয়েছে তা ইহুদি ধর্মেও মেনে চলা বাধ্যতামূলক। এবং মুসলিমদের মত ইহুদিরাও শুয়োরের মাংস খায় না। তাই কলকাতার মুসলিম বাবুর্চিরা ইহুদিদের খাদ্যাভ্যাসের বিধিনিষেধগুলো খুব সহজেই আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন।
বংশপরম্পরায় এই মুসলিম কারিগরেরাই ইহুদি পরিবারের হেঁশেলে পরম বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করেছেন। আজও নিউ মার্কেটের বিখ্যাত ‘নাহুম অ্যান্ড সন্স’ বেকারিতে গেলে দেখা যাবে, মুসলিম কারিগররাই নিজেদের হাতে সযত্নে বানিয়ে চলেছেন ইহুদিদের ঐতিহ্যবাহী ‘চাল্লা ব্রেড’ (Challah), চিজ সামোসা বা ক্রিসমাসের বিখ্যাত প্লাম কেক।
আলু মাকালার বাইরেও কলকাতার ইহুদি ফুড কালচার এক অদ্ভুত ফিউশনের গল্প বলে। বাগদাদি ইহুদিরা নিজেদের খাবারের মধ্যপ্রাচ্যীয় সত্ত্বা বজায় রেখেই তাতে অনায়াসে মিশিয়ে দিয়েছিলেন হলুদ, ধনে, আদা এবং গরম মশলার মতো স্থানীয় বাঙালি মশলা।
পটোলের দোলমার অনুপ্রেরণা: বাঙালির অত্যন্ত আপন এবং সাবেকি পদ ‘পটোলের দোলমা’-র সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইহুদিদের ‘মাহাশা’ (Mahasha)। ইহুদিরা আঙুর পাতা বা অন্য সবজির ভেতরে মাংসের পুর দিয়ে এই মাহাশা তৈরি করতেন। এই রন্ধনশৈলীই বাংলার মাটিতে এসে স্থানীয় সবজি ‘পটল’-এর সঙ্গে মিশে গিয়ে এক নতুন রূপ লাভ করে।
ফিশ চিতানি: ইহুদিরা গঙ্গার মিষ্টি জলের মাছ, বিশেষ করে রুই এবং ভেটকির প্রেমে পড়েন। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি ঐতিহ্যবাহী টমেটো-ভিত্তিক খাবার ‘হ্রাইমে’-কে (Hraime) সম্পূর্ণ বাঙালি কায়দায় রুই বা ভেটকি দিয়ে তৈরি করতে শুরু করেন। টক-মিষ্টি-ঝাল স্বাদের এই পদটিই পরিচিত হয় ‘ফিশ চিতানি’ নামে।
প্যানট্রাস: অনেকটা স্প্রিং রোলের মতো দেখতে এই পদটিতে ময়দার আবরণের ভেতরে মুরগির মাংসের পুর দিয়ে ভাজা হয়। এটি পরিবেশন করা হয় স্থানীয় চাটনি বা সসের সঙ্গে, যা ছিল বিকেলের চায়ের আড্ডায় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও ইহুদি সংস্কৃতির এক দারুণ মেলবন্ধন।
কলকাতায় আজ হয়তো সেই জমজমাট ইহুদি পাড়াগুলো নেই। এজরা স্ট্রিট, সিনাগগ স্ট্রিটের নামগুলোতে কেবল একটা ধূসর নস্টালজিয়ার ছাপ লেগে আছে। কিন্তু আলু মাকালার সেই মুচমুচে স্বাদ, নাহুমের কাঁচের শো-কেসে সাজানো চিজ সামোসা বা পটোলের দোলমার ভেতরে থাকা পুর যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, খাবার কোনও দেশ-সীমান্তের বিভাজন মানে না। কলকাতার বুকে ইহুদিদের এই রন্ধনশৈলী কেবল একটি সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাস নয়, এটি সংস্কৃতির আত্তিকরণ এবং একতার এক সুস্বাদু ঐতিহাসিক দলিল।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
