১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
কলকাতার নিজস্ব পদ বলে আদৌ কিছু আছে?

কলকাতার স্ট্রিট ফুড। ছবি - AI

কলকাতার নিজস্ব পদ বলে আদৌ কিছু আছে?

খাদ্য রসিক বাঙালির কাছে এ এক বিড়ম্বনার আত্ম-অনুসন্ধান। শহর কলকাতার নিজস্ব খাবার বা পদ বলে কি সত্যিই কিছু আছে?

বাঙালি আর খাদ্যপ্রেম হল সমার্থক শব্দ। আর সেই বাঙালির রাজধানী কলকাতার ফুডস্কেপ বা খাদ্যচিত্র নিয়ে যদি কাঁটাছেঁড়া করা হয়, তবে এই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে আসবেই- কলকাতার নিজস্ব বা ‘অথেন্টিক’ খাবার বলে কি সত্যিই কিছু আছে? নাকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীর নানা দেশ ও প্রান্তর থেকে যে অভিবাসী, শাসক ও বণিকরা এখানে এসেছেন তাদের সঙ্গে আসা খাবারগুলোকেই নিজের মতো করে কিছুটা আদল বদল করে কলকাতা আপন করে নিয়েছে?

ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব এবং রন্ধনশৈলীর গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কলকাতার রন্ধনশৈলী আদতে একটি চমৎকার 'মেল্টিং পট' বা সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের চূড়ান্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর শুরুটা মোটেও ইংরেজদের হাত ধরে নয়, বরং সেই মধ্যযুগের গোড়া থেকে।

কোন পথে কেমন করে এই মেলবন্ধন ঘটেছে, তার কিছু নমুনা চেখে দেখা যাক।

পাঠান ও মুঘল প্রভাব: কালিয়া, কোর্মা থেকে মাছের ঝোল

ইংরেজরা আসার বহু আগে, সেই ত্রয়োদশ শতক থেকেই বাংলায় তুর্কি, আফগান এবং পরে মুঘলদের শাসন ও সেই সূত্রে যাতায়াত শুরু হয়। তাদের হাত ধরেই বাংলার হেঁশেলে প্রথম প্রবেশ করে পেঁয়াজ, রসুন, আদা। এবং তখন থেকেই বাঙালির রান্নাঘরের শুরু হয় এর ব্যবহার।
মুঘল ও পাঠানদের মাংসের 'কালিয়া' বা 'কোর্মা' বাঙালির হাতে পড়ে ধীরে ধীরে বাংলার নিজস্ব রূপ পায়। বাঙালি হিন্দুরা একসময় পেঁয়াজ-রসুনকে ব্রাত্য করে রাখলেও, পরবর্তীতে সেই মুঘল রন্ধনশৈলীকে আপন করে নিয়ে জন্ম দেয় বাঙালির সিগনেচার ডিশ ‘মাছের কালিয়া’ বা ‘ছানার ডালনা’ (যা মূলত মুঘল কোফতা-র বাঙালি নিরামিষ সংস্করণ)।

ইসলামিক রন্ধনশৈলীর যে রূপটি বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয়, সেই বিরিয়ানি কলকাতায় আসে ১৮৫৬ সালে। অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ নির্বাসিত হয়ে মেটিয়াবুরুজে আসেন। ইংরেজদের দেওয়া সামান্য মাসোহারায় নবাবকে চলতে হতো। ফলে নবাবের কোষাগারে টান পড়ায় মাংসের বিকল্প হিসেবে আওয়াধি বিরিয়ানিতে আলুর প্রবেশ ঘটে। সেই বিরিয়ানিই আজ মশলার তীব্রতা কমিয়ে, সুগন্ধি আর আলুর যুগলবন্দিতে নিজস্ব স্টাইলে পৃথিবী বিখ্যাত কলকাতা বিরিয়ানি নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

রাজপুত, মারাঠা ও মাড়োয়ারি প্রভাব: ঘিয়ে ভাজা স্বাদ ও বড়বাজার

ষোড়শ শতকে মুঘল সেনাপতি মানসিংহের মতো রাজপুতদের বাংলায় আগমন, অষ্টাদশ শতকে মারাঠা (বর্গি) আক্রমণ এবং তার পাশাপাশি রাজস্থান-গুজরাত থেকে আসা মাড়োয়ারি ও জৈন বণিকদের বড়বাজারে বসতি স্থাপন- এই এতোকিছু ঘটনা কলকাতার স্ট্রিট ফুড কালচারকে ভিন্নরূপে গড়ে তুলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ‘সামবুসাক’ বা উত্তর ভারতের ‘সামোসা’ কলকাতায় এসে হয়ে গিয়েছে ‘শিঙাড়া’। মাংস বা পেঁয়াজের বদলে রাজপুত ও মাড়োয়ারি নিরামিষ প্রভাবে এতে প্রবেশ করে পাঁচফোড়ন দেওয়া আলু, বাদাম ও ফুলকপি।

ডাল কচুরি, হিংয়ের কচুরি, জিলিপি এবং বেসনের নানা স্ন্যাকস (যেমন ভুজিয়া ও গাঁঠিয়া) মূলত পশ্চিম ও মধ্য ভারতের অবদান। কিন্তু আজ রবিবার সকালে কলকাতার মোড়ে মোড়ে ছোলার ডাল বা আলুর তরকারি দিয়ে যে কচুরির প্রাতরাশ হয়, তা এই অবাঙালি বণিক সংস্কৃতিরই সম্পূর্ণ এক ‘ক্যালকাটা অ্যাডাপ্টেশন’।

আরও পড়ুন
মদের বোতল ১ লিটার না হয়ে ৭৫০ কেন হয়?
ব্যান্ডেল চিজ: পর্তুগিজ ঐতিহ্যের এক বাঙালি স্বাদ
কলকাতার বিরিয়ানি কোথায় আলাদা?

পর্তুগিজদের 'ছানা' এবং বাংলার মিষ্টি বিপ্লব

বাংলার রসগোল্লা বা সন্দেশ নিয়ে আমাদের গর্বের অন্ত নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এই মিষ্টিগুলোর প্রধান উপাদান ‘ছানা’ তৈরির কৌশলটি আমাদের শিখিয়েছিল পর্তুগিজরা। দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরির প্রথা প্রাচীন ভারতে খুব একটা প্রচলিত ছিল না, কারণ দুধ নষ্ট করাকে সেই সময় অশুভ মানা হত। পর্তুগিজদের কাছ থেকে ছানা কাটার কৌশল শিখে বাংলার ময়রারা তাকে এক অনন্য শিল্পে পরিণত করলেন। তবে ছানা কাটাটা পর্তুগিজদের হাত ধরে এলেও তা দিয়ে মিষ্টি তৈরি, অর্থাৎ আমাদের প্রিয় রসগোল্লা-সন্দেশ এগুলো একেবারে বাঙালির বা কলকাতার নিজস্ব।

ব্রিটিশদের 'চপ-কাটলেট' আমাদের সান্ধ্য ভোজনের সংস্কৃতি

আজকের কলকাতার অলিগলিতে যে ফিশ ফ্রাই, ফিশ কবিরাজি, চপ বা ডেভিল বিক্রি হয়, তার জন্মস্থান কিন্তু সাহেবদের রান্নাঘর। ইউরোপীয় 'ক্রোকেট' (Croquette) বা 'কাটলেট' (Cutlet)-কে ভারতীয় মশলায় জারিত করে, বিস্কুটের গুঁড়ো মাখিয়ে যে রূপ দেওয়া হয়েছিল, তা পুরোপুরি কলকাতার সৃষ্টি। 'কবিরাজি' কাটলেট তো আসলে ব্রিটিশদের 'কভারেজ' (Coverage) কাটলেটেরই অপভ্রংশ! অর্থাৎ নিজস্বতায় কলকাতার পুরো আপন, কিন্তু নেপথ্য অবদান….

টেরিটি বাজার থেকে ট্যাংরা: কলকাতার নিজস্ব ‘চায়নিজ’

আঠারো শতকের শেষে কাজের খোঁজে আসা চিনা শ্রমিকরা টেরিটি বাজার ও পরে ট্যাংরায় বসতি স্থাপন করেন। নিজেদের প্রথাগত রান্নার সঙ্গে স্থানীয় কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ ও মশলার মিশ্রণ ঘটিয়ে তাঁরা জন্ম দেন এক নতুন ঘরানার, যা 'ইন্দো-চাইনিজ' বা 'কলকাতা চাইনিজ' নামে বিখ্যাত। এখানে প্রচলিত চিলি চিকেন বা হাক্কা চাউমিনের বর্তমান রূপটি একান্তভাবেই কলকাতার।

তবে কি কলকাতার নিজের বলতে কিছুই নেই?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে কলকাতার উদ্ভাবনী দক্ষতা ও আত্মস্থ করার ক্ষমতার দিকে।

কাঠি রোল:

১৯৩০-এর দশকে কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন ‘নিজামস’-এ প্রথম জন্ম নেয় কাঠি রোল। সাহেবদের তাড়াহুড়োর মধ্যে কাবাব খাওয়ার সুবিধার্থে পরোটার ভেতর কাবাব পেঁচিয়ে দেওয়ার যে চল শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্ববন্দিত।

স্ট্রিট ফুডের বৈচিত্র্য:

ফুচকা বা ঝালমুড়ির মতো খাবারগুলো ভারতের অন্যত্র থাকলেও, কলকাতার তেঁতুল জল, গন্ধরাজ লেবু আর কাসুন্দির যে নিজস্ব অনুপান, তা একে সম্পূর্ণ আলাদা একটি পরিচিতি দিয়েছে।

এমন উদাহরণ ও নজির ভুরি ভুরি আছে। আসলে কলকাতার নিজস্বতা হল তার ‘অ্যাডাপ্টেশন’ বা আত্মস্থ করার ক্ষমতা। বিশ্বের খুব কম শহরই পেরেছে ভিনদেশি খাবারকে এতটা নিখুঁতভাবে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে-মিশিয়ে নিতে। আফগানদের কালিয়া থেকে ওয়াজিদ আলি শাহ'র বিরিয়ানি, মাড়োয়ারিদের কচুরি থেকে ট্যাংরার চাউমিন- এগুলো শুধু মাইগ্রেটেড খাবার নয়, এগুলো এক একটি বিবর্তনের গল্প। সারা পৃথিবীর স্বাদ কলকাতায় এসে অভিবাসী হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গঙ্গার জল আর এই শহরের নিজস্ব হাওয়ায় মিশে তারা আজ এমন এক স্বকীয়তা লাভ করেছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। তাই কলকাতার খাবার মূলত মাইগ্রেটেড হয়েও, তার আত্মা একান্তভাবেই কলকাতার নিজস্ব।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য